Last Updated on [modified_date_only] by Shroddha Bhattacharyya
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল: আপনি ভাবতে থাকুন আর ওই দিকে চাঁদ দখল করে নিল চীন (China), গত দশকে চীনের দ্রুত প্রযুক্তিগত উত্থান বিশ্বের বৈজ্ঞানিক মহলে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এক সময় যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশ গবেষণায় আধিপত্য বিস্তার করত, সেখানে এখন নতুন ‘এশিয়ান জায়ান্ট’ চীন নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে, চীনের সাম্প্রতিক উদ্ভাবন—চন্দ্রপৃষ্ঠের ধুলো বা রেগোলিথকে শক্ত ইটে রূপান্তরিত করার প্রযুক্তি—মানব সভ্যতার ভবিষ্যতের জন্য এক মহৎ পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
কেন চাঁদের ধুলো দিয়ে ইট বানানো (China)
মহাকাশে স্থাপনা নির্মাণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্মাণ সামগ্রী পরিবহন (China)। পৃথিবী থেকে মাত্র ১ কেজি সামগ্রী মহাকাশে পৌঁছে দিতে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়। সেক্ষেত্রে, যদি স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে নির্মাণ সামগ্রী তৈরি করা যায়, তবে খরচ এবং ঝুঁকি উভয়ই বহুগুণে কমে যাবে। চাঁদের পৃষ্ঠে ছড়িয়ে থাকা সূক্ষ্ম ধুলো বা রেগোলিথ সেই সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে।
চীনা বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ যন্ত্র তৈরি করেছেন, যা চাঁদের ধুলো সংগ্রহ করে অতি-উচ্চ তাপে উত্তপ্ত করবে। সূর্যের আলোকে প্রায় ৩,০০০ গুণ বাড়িয়ে ধুলোকে ১,৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় ধুলো একত্রিত হয়ে তৈরি হবে শক্ত ও টেকসই ইট। পৃথিবীতে যেমন মাটির কাদা গরম চুল্লিতে সেঁকে ইট তৈরি করা হয়, এই প্রযুক্তিও ঠিক তেমনই, তবে আরও জটিল ও পরিশীলিত।
প্রথম পরীক্ষা এবং চ্যালেঞ্জ (China)
প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে আগ্নেয়গিরির ছাই ব্যবহার করে এই প্রক্রিয়া পরীক্ষা করেন। কিন্তু বাস্তবে চাঁদের ধুলো ব্যবহার করা অনেক বেশি কঠিন, কারণ—
- চন্দ্রপৃষ্ঠের ধুলোর গঠন সর্বত্র একরকম নয়।
- সেখানে প্রচণ্ড তেজস্ক্রিয় বিকিরণ রয়েছে।
- তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা (দিনে +127°C, রাতে -173°C)।
- মাইক্রোমেটিওরাইটের ক্রমাগত আঘাত।
এই জটিল অবস্থার মধ্যেও চীনের তিয়ানঝৌ-৮ মিশন বিপুল পরিমাণ ‘চন্দ্র ইট’ মহাকাশে নিয়ে গেছে। এগুলি বর্তমানে তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনে সংরক্ষিত আছে, যেখানে তিন বছর ধরে বিকিরণ ও তাপমাত্রার প্রভাবে কতটা টেকসই থাকে তা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাবে।
চীনের মহাকাশ মিশনের পরিকল্পনা (China)
- চ্যাং-ই-৫ (২০২০): চাঁদ থেকে মাটির নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনে। এর ভিত্তিতেই ইট তৈরির প্রযুক্তি উন্নয়ন শুরু হয়।
- চ্যাং-ই-৭ (২০২৬): চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পানির খোঁজ করবে। ভবিষ্যতের উপনিবেশ টিকিয়ে রাখার জন্য পানি অপরিহার্য।
- চ্যাং-ই-৮ (২০২৮): রেগোলিথ ইট তৈরির প্রযুক্তি সরাসরি চাঁদে পরীক্ষা করা হবে। একইসঙ্গে গবেষণা ঘাঁটির ভিত্তি স্থাপনের কাজ শুরু হবে।
- ২০৩০: মানববাহী অভিযানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
- ২০৩৫: স্থায়ী গবেষণা ঘাঁটি এবং প্রথম উপনিবেশ স্থাপনের পরিকল্পনা।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা (China)
উল্লেখযোগ্যভাবে, চীন ও রাশিয়া যৌথভাবে চাঁদে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এই কেন্দ্র থেকে উৎপন্ন শক্তি প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক চন্দ্র গবেষণা কেন্দ্র (ILRS)-কে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ প্রকল্প ২০৩৬ সালের মধ্যে সম্পন্ন হলে চাঁদের প্রথম টেকসই বসতি গড়ে উঠবে।

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব (China)
চীনের এই উদ্যোগ কেবল প্রযুক্তিগত নয়, ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র তার Artemis Program-এর মাধ্যমে ২০২৫ সালের মধ্যেই চাঁদে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আবার ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা, ভারত ও জাপানও চন্দ্র অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। ফলে আগামী এক দশকের মধ্যেই চাঁদ হতে চলেছে নতুন এক ‘স্পেস রেস’-এর কেন্দ্রবিন্দু।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন: চাঁদে বসতি ও উপনিবেশ
রেগোলিথ ইট কেবল একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়; এটি ভবিষ্যতের মহাকাশ নগরীর প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর। চাঁদে ঘাঁটি স্থাপন করা গেলে—
- মহাকাশ পর্যটন ও গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলবে।
- মঙ্গল গ্রহ ও আরও দূরবর্তী গ্রহে যাওয়ার জন্য চাঁদকে লঞ্চপ্যাড হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
- পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও সম্পদ সংকট মোকাবিলায় নতুন সমাধানের দিশা মিলতে পারে।
আরও পড়ুন: Heavy Rain in Mumbai: ভারী বৃষ্টিতে জলমগ্ন মুম্বই, বন্ধ রেল পরিষেবা!
সব মিলিয়ে, চীনের “চন্দ্র ইট প্রকল্প” শুধু একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, বরং মানবজাতির ইতিহাসে মহাকাশে স্থায়ী বসতি গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পথে প্রথম বড় পদক্ষেপ।


