Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: পলাশ নস্কর: হালিশহরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়িতে ডিম ছোড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজ্য রাজনীতি (Dilip Ghosh)। ঘটনাটিকে ঘিরে যখন রাজনৈতিক সৌজন্য, প্রতিবাদ ও বিরোধিতার ভাষা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক, ঠিক তখনই একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে অতীতের রাজনৈতিক সংঘর্ষ, তৃণমূলের নেতাদের পুরনো মন্তব্য, ‘ডিম-ইট’ সংস্কৃতি এবং অভয়া-কাণ্ডের বিচার নিয়ে সরকারের ভূমিকা সব মিলিয়ে তাঁর মন্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
হালিশহরের ঘটনা নিয়ে দিলীপের ‘দ্বিমুখী’ অবস্থান (Dilip Ghosh)
হালিশহরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়িতে ডিম ছোড়ার ঘটনাকে সরাসরি সমর্থন না করলেও, একই সঙ্গে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের নৈতিকতার প্রশ্ন তোলেন দিলীপ ঘোষ। তাঁর দাবি, অতীতে তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘ডাকাত রানি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। সেই সময় তাঁকে দলীয় স্তরে শাস্তির বদলে বরং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল বলেই দাবি করেন দিলীপ।
তাঁর যুক্তি, একজন রাজনৈতিক নেতা এমন ভাষা ব্যবহার করে পরে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেলে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, হালিশহরের ঘটনাকে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অতীতের ঘটনাপ্রবাহের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখছেন।
‘ডিম নয়, ইটই প্রাপ্য ছিল’, বিতর্কিত মন্তব্য (Dilip Ghosh)
দিলীপ ঘোষের বক্তব্যের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশগুলির একটি ছিল ‘ডিম’ ও ‘ইট’ প্রসঙ্গ। নিজের রাজনৈতিক জীবনে হামলার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, তাঁর গাড়ি একাধিকবার ভাঙচুর করা হয়েছে এবং তিনিও শারীরিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ চাইলে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারেন। এমনকি তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, ডিমের পরিবর্তে ইট ছোড়া হলে তিনি সেটিকে সমর্থন করতেন। এই মন্তব্য নিয়েই স্বাভাবিকভাবেই নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ রাজনৈতিক প্রতিবাদের অধিকার এবং হিংসাত্মক আক্রমণের মধ্যে সীমারেখা কোথায় থাকবে—এই প্রশ্নই ফের সামনে এসেছে।
অতীতের রাজনৈতিক হিংসার প্রসঙ্গ (Dilip Ghosh)
বর্তমান বিতর্কের সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতাকেও জুড়ে দেন দিলীপ ঘোষ। ডায়মন্ড হারবারে তাঁর দলের নেতাদের উপর হামলা, তাঁদের তুলে নিয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন অন্যত্র আত্মগোপন করে থাকার অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, অতীতে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের উপর যখন হামলার অভিযোগ উঠেছিল, তখন অনেকেই নীরব ছিলেন। আজ তাঁরাই যখন রাজনৈতিক সৌজন্য ও মানবতার কথা বলছেন, সেই দ্বিচারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। দিলীপের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে ‘আমরা সহ্য করেছি’ এই রাজনৈতিক বয়ান। তাঁর দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধী রাজনীতি করতে গিয়ে বিজেপি কর্মীদের নানা ধরনের অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য নিয়েও প্রকাশ্যে ভিন্ন সুর (Dilip Ghosh)
হালিশহরের ঘটনা নিয়ে বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্য অন্যায় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। তবে একই দলের আর এক নেতা দিলীপ ঘোষের বক্তব্যে দেখা গেল তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থান। দিলীপ অবশ্য শমীকের বক্তব্যকে সরাসরি খারিজ করেননি। তাঁর দাবি, শমীক দলীয় নীতির কথা বলেছেন এবং সেই জায়গা থেকে তাঁর বক্তব্য সঠিক। কিন্তু নিজের অবস্থানকেও তিনি সঠিক বলে দাবি করেছেন। এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে বিজেপির অভ্যন্তরে একই ঘটনার মূল্যায়ন নিয়ে মতের পার্থক্যের ছবিও সামনে এসেছে। রাজনৈতিক প্রতিবাদের পদ্ধতি নিয়ে দলের ভিতরেও যে আলোচনা রয়েছে, দিলীপের মন্তব্যে তার ইঙ্গিত মিলেছে।
‘১০ বছর কাঁটার উপর হেঁটেছি’ (Dilip Ghosh)
নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কথা তুলে ধরে দিলীপ ঘোষ বলেন, তিনি প্রায় এক দশক ধরে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তাঁকে ও তাঁর কর্মীদের একাধিকবার আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। এই প্রসঙ্গেই তিনি রাজনৈতিক মানবতা ও সৌজন্যের প্রশ্নে তীব্র আক্রমণ শানান। তাঁর বক্তব্য, যাঁরা অতীতে বিজেপির উপর হওয়া হামলার প্রতিবাদ করেননি, তাঁদের কাছ থেকে এখন মানবতা বা সৌজন্যের পাঠ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে পাল্টা প্রশ্নও উঠতে পারে, রাজনৈতিক হিংসার পুরনো ইতিহাস কি বর্তমান সময়ে নতুন করে হিংসাকে বৈধতা দেওয়ার যুক্তি হতে পারে?
অভয়া-কাণ্ডের বিচার নিয়ে আরও বিস্ফোরক দাবি
অভয়া-কাণ্ডের দু’বছর পূর্তি উপলক্ষে বিরোধীদের ‘ন্যায়বিচার এখনও মেলেনি’ এই অভিযোগেরও জবাব দেন দিলীপ ঘোষ। তিনি দাবি করেন, নতুন সরকার ইতিমধ্যেই ‘এনকাউন্টার’ শুরু করেছে এবং প্রয়োজন হলে আরও এনকাউন্টার করা হবে। এই মন্তব্যও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ এবং বিতর্কিত। কারণ কোনও অপরাধের বিচার প্রতিষ্ঠিত আইন, তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত এই প্রশ্ন ফের সামনে আসতে পারে তাঁর বক্তব্যের পর। দিলীপ ঘোষ অবশ্য তাঁর বক্তব্যে সরকারের পদক্ষেপকে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার উদাহরণ হিসেবেই তুলে ধরেছেন।
‘১৫ মাস সময় দিন’ (Dilip Ghosh)
অভয়া-কাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষের বক্তব্যের শেষাংশে উঠে আসে সময়ের প্রসঙ্গ। তাঁর যুক্তি, বহু বছরের পুরনো পারিবারিক বিবাদও সহজে মেটে না। সেখানে এত বড় একটি অপরাধের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া খুব অল্প সময়ে শেষ হয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, মানুষ তাঁদের ১৫ বছর সময় দিয়েছে; তাঁদের সরকারকে অন্তত ১৫ মাস সময় দেওয়া উচিত। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি সময় দেওয়ার আবেদন জানান এবং দ্রুত ফলাফলের দাবিকে কিছুটা সময়ের জন্য অপেক্ষা করার বার্তা দেন।
আরও পড়ুন: Bengali Film: মাটির ঘোড়ায় কি সত্যিই প্রাণ দিতে পারবে বিশু? আসছে কৃষ্ণেন্দু ষান্নিগ্রাহীর নতুন ছবি!
রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়ার সম্ভাবনা
হালিশহরের ঘটনা থেকে শুরু করে ডিম ছোড়া, অতীতের রাজনৈতিক হিংসা, শমীক ভট্টাচার্যের মন্তব্য এবং অভয়া-কাণ্ড একাধিক ইস্যুকে একই বক্তব্যে টেনে এনে দিলীপ ঘোষ কার্যত রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কের উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে যেমন রয়েছে বিরোধী রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতার দাবি, তেমনই রয়েছে হিংসাত্মক প্রতিবাদ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য। ফলে আগামী দিনে তৃণমূলের পাল্টা প্রতিক্রিয়া যেমন আসতে পারে, তেমনই বিজেপির অন্দরেও এই বক্তব্য নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।



