Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: সময়টা স্বাধীনতার প্রায় ৮-৯ বছর আগে (Fatakesto Kali Puja 2025)। কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথের ধারে বাবার পানের গুমটির পাশে দাঁড়িয়ে এক কিশোরের চোখে তখন এক অদ্ভুত স্বপ্ন। চারপাশে ঠনঠনিয়ার কালীপুজোর আলো ঝলমল করছে, কিন্তু তার দাঁড়িয়ে থাকা কোণটায় পৌঁছোয় না সে আলো। সেই ছেলেটা একদিন মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল একদিন এমন পুজো করব, যেটা দেখে পুরো কলকাতা তাকিয়ে থাকবে। সেই ছেলেই বড় হয়ে ওঠে উত্তর কলকাতার নামী ও কুখ্যাত ‘ফাটাকেষ্ট’ আসল নাম কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত।
গুণ্ডারাজের রাজপথে (Fatakesto Kali Puja 2025)
১৯৫০ সালের শেষের দিক। মনোহর আইচের শরীরচর্চা কেন্দ্রে নাম লেখালেন কৃষ্ণচন্দ্র। প্রতিদিনের নিয়ম ডাম্বল ভাঁজা, পালোয়ানি, তারপর পাঁঠার গুরদা সেদ্ধ, কাঁচা ডিম, দুধে মিশিয়ে ঢকঢক করে গিলে ফেলা। চেহারায় তখন এমন রূপরস শক্তি আর দাপটে ভরা। তবে শক্তির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছিল কুখ্যাতিও। পাড়ার আর এক মস্তান নকুলের সঙ্গে ‘ছুরির ডুয়েল’-এ আহত হলেন কৃষ্ণ, কিন্তু হার মানলেন না। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন হাসপাতাল থেকে। এরপর থেকেই গোটা উত্তর কলকাতায় তিনি পরিচিত হলেন নতুন নামে ‘ফাটাকেষ্ট’।

মির্জাপুর স্ট্রিটে গণ্ডার বনাম ফাটাকেষ্ট (Fatakesto Kali Puja 2025)
সত্তরের দশকে শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ডে চলছিল ক্ষমতার লড়াই। মির্জাপুর স্ট্রিটের এক ছোটখাটো গুণ্ডা ‘গণ্ডার’ বোমা ছুড়ে মারে ফাটাকেষ্টর দিকে। কিন্তু ভাগ্যদেবী সেদিন যেন কেষ্টরই ছিল। বোমা ফাটেনি! উলটে সেই বোমাই হাতে তুলে নিয়ে ফাটাকেষ্ট ছুড়ে দেন গণ্ডারের দিকে। এই ঘটনাই শহরে কিংবদন্তি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ‘ফাটাকেষ্ট’ নাম তখন ভয় আর সম্মানের একসঙ্গে প্রতীক।
কালীপুজোর আলোয় এক অপরাজেয় ব্র্যান্ড (Fatakesto Kali Puja 2025)
১৯৫৫ সালে কলেজ স্ট্রিটের লাগোয়া গুরুপ্রসাদ চৌধুরী লেনে শুরু হল ফাটাকেষ্টর কালীপুজো।
বন্ধুদের সঙ্গে মনোমালিন্যের পর পুজো সরিয়ে আনলেন সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে। সেই ছোট্ট পুজোই হয়ে উঠল উত্তর কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত উৎসবগুলির একটি। পুলিশ-প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে পুজো চলে এল রাস্তায় আর তারপরই শুরু হল ‘ফাটাকেষ্ট নবযুবক সঙ্ঘ’-এর রাজত্ব।
তারকাদের মেলা সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে (Fatakesto Kali Puja 2025)
সত্তরের দশকে ফাটাকেষ্টর পুজোর দাপট ছিল শীর্ষে। রাজেশ খান্না, অমিতাভ বচ্চন, বিনোদ খান্না, আশা ভোঁসলে, মালা সিনহা কে আসেননি সেই পুজো মঞ্চে! ১৯৭৩ সালের কালীপুজোয়, সদ্য ‘নমকহারাম’-এর জোয়ারে ভাসছে অমিতাভ। ফাটাকেষ্টর এক ডাকে হাজির হয়ে ছোট্ট মঞ্চে ছুড়ে দিলেন ডায়লগ। কলকাতা তখন মুগ্ধ। অমিতাভ পরে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ পাঠিয়েছিলেন হিরে বসানো এক নাকছাবি, যা চুরি হয়ে গেলেও, ফাটাকেষ্টর দলবল সেটি উদ্ধার করে আনে আবার।
যোগীগুরু ওঙ্কারনাথের দর্শন (Fatakesto Kali Puja 2025)
একবার কালীপুজোর রাতে শহর সাক্ষী হয়েছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনার। কালীপুজোর সময় যোগীগুরু ওঙ্কারনাথ কাশী থেকে এসেছিলেন কলকাতায়। মায়ের দর্শনের ইচ্ছা প্রকাশ করতেই খবর পৌঁছয় ফাটাকেষ্টর কানে। দোর্দণ্ডপ্রতাপ সেই মানুষটি নিজেই কাঁধে করে গুরুদেবকে নিয়ে যান পুজোমণ্ডপে। মায়ের আরাধনায় তখন দীপান্বিতা রাত আলো, ধূপ, আর শ্রদ্ধার মিশেলে এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য।
আরও পড়ুন: Malaika Arora: মালাইকার পাশে ফিকে রশ্মিকা, ‘পয়জন’ এর এফেক্ট!
আলো ও অন্ধকারের প্রতীক
ফাটাকেষ্টর জীবন যেন এক চরম বৈপরীত্য, একদিকে দাপুটে গুণ্ডা, অন্যদিকে একনিষ্ঠ কালীভক্ত। যে নিজের হাতে অস্ত্র তুলতে দ্বিধা করত না, সে-ই আবার মাতৃমূর্তির সামনে মাথা নত করত নিঃস্বার্থ ভক্তির আবেগে। কলকাতার সেই কালীপুজোর ইতিহাস আজও বেঁচে আছে সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের গলিতে, যেখানে প্রতিটি দীপের আলো যেন বলে, “অন্ধকারেরও তো এক আলোকজন্ম হয়।”



