Last Updated on [modified_date_only] by Debu Das
ট্রাইব টিভি বাংলা ডিজিটাল : ভারত একটি উপকূলীয় শক্তি, যার প্রায় ৭,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসীমা এবং ১,২০০-এরও বেশি দ্বীপ রয়েছে(Indian Navy Special Force)। এই বিপুল জলসীমা রক্ষার দায়িত্ব ভারতীয় নৌসেনার উপর বর্তায়। নৌবাহিনীর নিয়মিত যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন বা বিমান বাহিনীর পাশাপাশি নীরব অথচ শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে তাদের বিশেষ বাহিনী বা স্পেশাল ফোর্স। এরা মূলত গোপন অভিযান, সন্ত্রাস দমন, জলদস্যু দমন এবং কৌশলগত মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজ আমরা ভারতীয় নৌসেনার প্রধান স্পেশাল ফোর্স ও তাদের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করব।
১. মেরকোস (MARCOS) – নৌবাহিনীর ‘মেরিন কমান্ডো’ (Indian Navy Special Force)
গঠন ও ইতিহাস:
মেরকোস বা MARCOS (Marine Commandos) হল ভারতীয় নৌসেনার সবচেয়ে পরিচিত বিশেষ বাহিনী(Indian Navy Special Force)। ১৯৮৭ সালে এ বাহিনী গঠন করা হয়। মার্কিন নেভি সিলস এবং ব্রিটিশ এসএএস-এর মতো বিশ্বের শীর্ষ বাহিনীকে অনুসরণ করে MARCOS গড়ে তোলা হয়।
প্রশিক্ষণ:
- প্রশিক্ষণের প্রাথমিক ধাপ প্রায় ২ বছর ধরে চলে।
- প্রথমে কঠোর শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা নেওয়া হয়, যেখানে প্রায় ৮০–৯০% প্রার্থী বাদ পড়ে।
- এরপর সাঁতার, ডাইভিং, প্যারাশুট জাম্প, অগ্নেয়াস্ত্র চালনা, মাউন্টেন কমব্যাট এবং ডেজার্ট অপারেশনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
- সমুদ্রতল এবং পানির নিচে বিস্ফোরক বসানো, গোপন জাহাজে প্রবেশ, ও রাতের অভিযানের প্রশিক্ষণও অন্তর্ভুক্ত।
অস্ত্র ও প্রযুক্তি:
MARCOS কমান্ডোরা আধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, সাইলেন্সারযুক্ত অস্ত্র, নাইট-ভিশন গগলস, আন্ডারওয়াটার ব্রিদিং সিস্টেম এবং ছোট সাবমেরিন ব্যবহার করে।
অভিযান:
- কাশ্মীরে জঙ্গি দমন অভিযানে নিয়মিত MARCOS ব্যবহৃত হয়।
- ২০০৮ সালের ২৬/১১ মুম্বাই হামলার সময় তারা প্রথম সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করে।
- সোমালিয়ার জলদস্যু দমন অভিযানে MARCOS গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
২. NCOs – নেভাল কমান্ডো অপারেশনাল ডাইভার (Indian Navy Special Force)
নৌসেনার (Indian Navy) ডাইভিং উইং থেকে এই ফোর্সের উৎপত্তি। এরা মূলত আন্ডারওয়াটার মিশন, বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ এবং বিশেষ ডাইভিং অপারেশনে ব্যবহৃত হয়(Indian Navy Special Force)।
কাজের ক্ষেত্র:
- মাইন অপসারণ
- পানির নিচে ভাঙা জাহাজ মেরামত
- সাবমেরিনের সাথে যৌথ অভিযান
- হাবর ও পোর্টে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
NCOs-রা MARCOS-এর মতো আক্রমণাত্মক নয়, তবে নৌবাহিনীর কৌশলগত অভিযানে অপরিহার্য।
৩. স্পেশাল নৌ ইউনিট (SNU)
এটি মূলত উপকূলীয় নিরাপত্তার জন্য বিশেষভাবে তৈরি। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পর এ বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়ে। স্পেশাল নৌ ইউনিট স্থানীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী এবং পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে।
কার্যক্রম:
- উপকূলবর্তী এলাকায় টহল
- সন্দেহজনক নৌযান বা জাহাজে অভিযান
- সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ অভিযান
- বন্দর ও শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ

৪. ডাইভার বেসড কমান্ডো ফোর্স
নৌবাহিনীর আরেকটি বিশেষ ইউনিট হল ডাইভার বেসড কমান্ডো। তারা মূলত পানির নিচে গুপ্তচরবৃত্তি এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালানোর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
দক্ষতা:
- পানির নিচে বিস্ফোরক বসানো
- সাবমেরিনে প্রবেশ
- আন্ডারওয়াটার নজরদারি সিস্টেম ধ্বংস করা
- শত্রু বন্দর বা হাবরে গোপন অভিযান
৫. ভবিষ্যতের স্পেশাল ফোর্স ও প্রযুক্তি
ভারতীয় নৌবাহিনী বর্তমানে MARCOS-কে আরও উন্নত করার জন্য কাজ করছে। তাদের জন্য আধুনিক অস্ত্র, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, আন্ডারওয়াটার ড্রোন, মানববিহীন সাবমেরিন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর নজরদারি সিস্টেম যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন : Israel Hamas Conflict : গাজায় ইজরায়েলি বিমান হানায় নিহত হলেন হামাসের শীর্ষ কমান্ডার হাজেম নঈম
কৌশলগত গুরুত্ব
ভারতের অবস্থান ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে। এই অঞ্চলে চীনের বাড়তে থাকা প্রভাব এবং সমুদ্রপথে সন্ত্রাসবাদ ও জলদস্যুতা ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। MARCOS এবং অন্যান্য স্পেশাল ফোর্সের কারণে ভারত নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে এগিয়ে:
- সন্ত্রাস দমন অভিযান: সমুদ্রপথে ঢুকে আসা জঙ্গিদের থামানো।
- আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: মার্কিন নেভি সিলস বা ফরাসি নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়া।
- জলদস্যু দমন: সোমালিয়া উপকূল বা মালাক্কা প্রণালিতে জলদস্যু দমন অভিযান।
- উপকূল নিরাপত্তা: বন্দর, তেল শোধনাগার, শিল্পাঞ্চল রক্ষা।
- স্ট্র্যাটেজিক ডিটারেন্স: শত্রু রাষ্ট্রের বন্দর বা নৌঘাঁটিতে প্রয়োজনে গোপন অভিযান চালানোর সক্ষমতা।
ভারতের নৌবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সগুলির সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে:
- সর্বাধুনিক সরঞ্জামের অভাব
- দ্রুত মোতায়েনের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো সীমিত
- উপকূলীয় রাজ্যগুলির সঙ্গে সমন্বয় জটিলতা
- দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণে বড় আর্থিক ব্যয়
ভারতীয় নৌসেনার স্পেশাল ফোর্স বা MARCOS, NCOs এবং অন্যান্য ইউনিট ভারতের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা এবং কৌশলগত ক্ষমতার মূল স্তম্ভ। এরা অদৃশ্য যোদ্ধা, যাদের কাজ সমুদ্রপথে ভারতের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আধুনিক অস্ত্র, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এ বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।ভবিষ্যতে ভারতীয় নৌসেনার এই বিশেষ বাহিনী শুধু সমুদ্রপথ রক্ষা নয়, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মূল হাতিয়ার হয়ে উঠবে।


