Last Updated on [modified_date_only] by Shroddha Bhattacharyya
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: সুকৃতি ভট্টাচার্য: রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের (KMC Controversy) পর এবার চরম প্রশাসনিক সংঘাতের সাক্ষী হলো কলকাতা পুরসভা। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর কলকাতার ইতিহাসে এই প্রথম ঘটল এমন নজিরবিহীন ঘটনা। শুক্রবার পুরসভার মাসিক অধিবেশন ঘিরে ধুন্ধুমার পরিস্থিতি তৈরি হলো পুরভবনে। মূল অধিবেশন কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগে তীব্র উত্তেজনা ছড়াল। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ‘কাউন্সিলর্স ক্লাব রুম’-এর চেয়ার-টেবিল সরিয়ে, সেখানেই বিকল্প অধিবেশন সারলেন চেয়ারপার্সন মালা রায় এবং মেয়র ফিরহাদ হাকিম।
নতুন পুর সচিবকে ঘেরাও: তুমুল বাগবিতণ্ডা (KMC Controversy)
এদিন উত্তেজনার সূত্রপাত হয় নতুন পুর সচিব (KMC Controversy) কিশোর কুমার বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ, পুরসভার চেয়ারপার্সন মালা রায় ডাকা সত্ত্বেও তাঁর ঘরে যাচ্ছিলেন না নতুন পুর সচিব। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন তৃণমূলের কাউন্সিলররা। তৃণমূল কংগ্রেসের দুই মেয়র পারিষদ বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় ও মিতালী বন্দ্যোপাধ্যায় সহ একাধিক কাউন্সিলর সরাসরি গিয়ে চড়াও হন সেক্রেটারির ঘরে।
পুরসচিবের ঘরে দীর্ঘক্ষণ হই-হট্টগোল (KMC Controversy)
নতুন পুর সচিবকে ঘেরাও করে শুরু হয় তুমুল বিক্ষোভ (KMC Controversy) ও বাগবিতণ্ডা। সচিবের দাবি ছিল, “আমি এখনও সরকারিভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করিনি।” পাল্টা ক্ষুব্ধ কাউন্সিলররা প্রশ্ন তোলেন, “দায়িত্ব যদি না-ই নিয়ে থাকেন, তাহলে আপনি কেন সচিবের ঘরে বসে রয়েছেন? কিভাবে অ্যান্টি চেম্বার ব্যবহার করছেন?” এই নিয়ে পুরসচিবের ঘরে দীর্ঘক্ষণ হই-হট্টগোল চলে।
অধিবেশন কক্ষে তালা! চেয়ারপার্সনের কড়া চিঠি (KMC Controversy)
এদিকে শুক্রবার পুরসভার পূর্বনির্ধারিত মাসিক অধিবেশন থাকলেও (KMC Controversy) দেখা যায় মূল অধিবেশন কক্ষটি তালাবন্ধ। কক্ষটি খুলে দেওয়ার জন্য চেয়ারপার্সন মালা রায় নিজে অনুরোধ পাঠালেও নতুন সেক্রেটারি চাবি দিতে অস্বীকার করেন এবং জানান যে তিনি এখনও দায়িত্ব নেননি।
এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে নতুন সচিবকে কড়া চিঠি দেন চেয়ারপার্সন মালা রায়। চিঠিতে তিনি মনে করিয়ে দেন:
১৯৮০ সালের পুর আইন অনুযায়ী, মাসিক অধিবেশন বাতিল, স্থগিত বা আয়োজন করার একমাত্র অধিকার রয়েছে পুরসভার চেয়ারপার্সনের।
চেয়ারপার্সনের অনুমোদন ছাড়া কার নির্দেশে অধিবেশন কক্ষে তালা মারা হলো, সেই কৈফিয়ত দাবি করেন তিনি।
পুরসভার এই বোর্ডের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে, যা একটি সম্পূর্ণ সাংবিধানিক বডি। তাই নিয়ম বহির্ভূতভাবে অধিবেশন কক্ষ বন্ধ রাখা বেআইনি।
ইতিহাসে প্রথম: ক্লাব রুমই হলো বিকল্প অধিবেশন কক্ষ
অধিবেশন কক্ষ বন্ধ থাকায় দমে যাননি তৃণমূল কাউন্সিলররা। মালা রায় ও ফিরহাদ হাকিমের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক তৃণমূল কাউন্সিলর পুরসভায় হাজির হন। তাঁরা নিজেরাই ‘কাউন্সিলর্স ক্লাব রুম’-এর চেয়ার-টেবিল সরিয়ে জায়গাটিকে অধিবেশনের বিকল্প মঞ্চ হিসেবে গড়ে তোলেন। কলকাতার ইতিহাসে এই প্রথম মূল কক্ষ ছেড়ে ক্লাব রুমে পুরসভার মাসিক অধিবেশন বসল।
শুরুতে মাইক না থাকায় খালি গলাতেই বক্তব্য রাখেন ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ। পরে একটি মাইকের ব্যবস্থা করা হলে বক্তব্য রাখেন মেয়র ফিরহাদ হাকিম।
চেয়ারপার্সন মালা রায় বলেন:
“আমি তালা খুলে দেওয়ার কথা বলে পাঠিয়েছিলাম। আমরা প্রত্যেকেই এখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। কিন্তু তাও তালা খোলা হয়নি। তাই আমরা এখানেই (ক্লাব রুমে) অধিবেশন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

কমিশনারের বিরুদ্ধে মুলতুবি প্রস্তাব ও ‘গণতন্ত্র হত্যার’ অভিযোগ
এই বিকল্প অধিবেশনে পুরসভার কমিশনারের বিরুদ্ধে একটি মুলতুবি প্রস্তাব পেশ করা হয় এবং তৃণমূল কাউন্সিলররা হাত তুলে তা সমর্থন করেন। তৃণমূলের অভিযোগ, পুরসভার কমিশনার ১৯৮০ সালের পুর আইনের বাইরে গিয়ে কাজ করছেন এবং আইন অমান্য করছেন।
বিকল্প অধিবেশনে সুর চড়িয়ে ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ বলেন:
“গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। সংবিধানকে পেছন থেকে হত্যা করা হচ্ছে, গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরা হচ্ছে এবং নতুন নির্বাচিত সরকার সেই কাজ করছে।”
ক্ষোভ উগরে দিয়ে মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেন:
“হাউস খোলা এবং বন্ধ করা চেয়ারপার্সনের কাজ। আজ যা হলো, তা অত্যন্ত দুঃখের ও অপমানের। নির্বাচিত সদস্যদের না মানলে তো সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি হবে। রাজ্যে বর্ষা এলে বা কলকাতায় কোনো বিপর্যয় হলে তার দায়িত্ব কে নেবে? গণতন্ত্রের উপরে কেউ নেই।”

তৃণমূল মুখপাত্র তথা কাউন্সিলর অরূপ চক্রবর্তী সরাসরি নবগঠিত সরকারকে তোপ দেগে বলেন, “হতে পারে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু পুরসভা এখনও বৈধ। ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এর মেয়াদ রয়েছে। মানুষের পরিষেবা নিয়ে আলোচনার অধিবেশন বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা আগে কখনও হয়নি।”
আরও পড়ুন: TMC Councillor Arrest: গ্রেফতার তৃণমূল নেতা, উদ্ধার আগ্নেয়াস্ত্র!
প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক উত্তাপ
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে এবং একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। তবে কলকাতা পুরসভা এখনও তৃণমূল কংগ্রেসের দখলেই রয়েছে এবং আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এই বোর্ডের মেয়াদ রয়েছে। তৃণমূলের স্পষ্ট অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবেই বিজেপি পরিচালিত নতুন সরকার পুরসভার কাজে ব্যাঘাত ঘটানোর চেষ্টা করছে।

পুরভবনের ভেতরের এই তুমুল নাটকীয়তা, বিক্ষোভ এবং বিকল্প অধিবেশন শেষে নিয়ম মেনে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে এদিনের মতো সভা শেষ হয়। তবে এই নজিরবিহীন সংঘাতের জল আগামীদিনে কতদূর গড়ায়, এবং এই বিষয়ে বিজেপির তরফ থেকে কী প্রতিক্রিয়া আসে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।


