Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: কলকাতায় বড়দিন মানেই পার্ক স্ট্রিট (Kolkata Christmas)। ডিসেম্বর এলেই এই রাস্তা আর পাঁচটা দিনের মতো থাকে না আলো, মানুষের ভিড়, গান আর উৎসবের আবহে বদলে যায় তার চরিত্র। বড়দিন উপলক্ষে পার্ক স্ট্রিট শুধু একটি রাস্তা নয়, বরং কলকাতার উৎসবচেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে।

কলকাতার ইতিহাসে বড়দিন (Kolkata Christmas)
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে বোঝা যায়, কলকাতার সঙ্গে বড়দিনের সম্পর্ক নতুন নয়। নরেন্দ্রকৃষ্ণ সান্যালের “কলকাতার ইতিবৃত্ত” এবং প্রবোধকুমার সেনের লেখায় পাওয়া যায়, শহরের জন্মলগ্ন থেকেই ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রভাব এখানে গভীরভাবে প্রোথিত। ১৬৮৬ সালে জব চার্নক সুতানুটিতে আশ্রয় নেন। তখন সুতানুটি ছিল জঙ্গলঘেরা, নদীসংলগ্ন এক নির্জন জনপদ। ঐতিহাসিকদের একাংশের মতে, সেই সময়ই কলকাতায় প্রথম বড়দিন উদযাপিত হয়। এই সূত্রেই বলা যায়, কলকাতার ইতিহাসের সঙ্গে বড়দিন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

সুতানুটি থেকে পার্ক স্ট্রিট (Kolkata Christmas)
সাড়ে তিনশো বছরের ইতিহাসে সুতানুটি আর পার্ক স্ট্রিট যেন সময়ের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি চিহ্ন। সুতানুটি যেখানে শহরের জন্মভূমি, পার্ক স্ট্রিট সেখানে আধুনিক কলকাতার উৎসবের মুখ। পার্ক স্ট্রিটের পুরনো নাম ছিল Burial Ground Road। আঠারো শতকে এটি ছিল স্যার এলিজা ইম্পে-র ডিয়ার পার্ক, পরে ব্রিটিশদের কবরস্থান। ধীরে ধীরে এই এলাকা ইউরোপীয়দের বসবাস, চার্চ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
ঔপনিবেশিক যুগে বড়দিনের রূপ (Kolkata Christmas)
ব্রিটিশ শাসনামলে বড়দিন ছিল মূলত ইংরেজ সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। চার্চে প্রার্থনা, ক্লাবে নাচ-গান এবং বাড়িতে বিশেষ ভোজ এই ছিল বড়দিনের চেনা ছবি। বিশ শতকের চল্লিশের দশক থেকে পার্ক স্ট্রিট ধীরে ধীরে শহরের সামাজিক জীবনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় পাওয়া যায়, এই সময় থেকেই বড়দিন শহরের বৃহত্তর সমাজের উৎসবে রূপ নেয়।

নাইটলাইফ ও বড়দিনের জৌলুস (Kolkata Christmas)
ষাট ও সত্তরের দশকে পার্ক স্ট্রিট ছিল কলকাতার নাইটলাইফের কেন্দ্র। বড়দিনের রাতে রেস্তোরাঁ, বার ও ক্লাবগুলিতে বিশেষ অনুষ্ঠান হতো। লাইভ মিউজিক, ক্যান্ডেললিট ডিনার আর নাচে-গানে এই রাত হয়ে উঠত বছরের অন্যতম স্মরণীয় সময়।
ফ্লুরি’স, মোকাম্বো ও কেকের ঐতিহ্য (Kolkata Christmas)
কলকাতার বড়দিন মানেই কেক, আর সেই কেক-সংস্কৃতির কেন্দ্র পার্ক স্ট্রিট। চিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়ের “কলকাতার খাদ্যসংস্কৃতি” গ্রন্থে উল্লেখ আছে, ঔপনিবেশিক আমলেই কেক ও পুডিং শহরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ফ্লুরি’স বড়দিনের কেকের জন্য আজও কিংবদন্তি। প্রণবকুমার দত্তের “কলকাতার ক্যাফে কালচার” গ্রন্থে ফ্লুরি’স-এর বিশেষ উল্লেখ রয়েছে। মোকাম্বো, ট্রিনকাস বা আধুনিক অক্সফোর্ড বুকস্টোর ক্যাফে সব মিলিয়ে পার্ক স্ট্রিটই কলকাতার “কেক ট্রেইল”-এর প্রাণ।

আরও পড়ুন: Mamata on SIR: মুখ্যমন্ত্রীর নিজের কেন্দ্রেই এত নাম বাদ পড়ল
সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল ও আধ্যাত্মিক বড়দিন
পার্ক স্ট্রিট এলাকার বড়দিনের আর এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল। মধ্যরাতের প্রার্থনায় অংশ নিতে বহু মানুষ ভিড় করেন। ক্যারোল গান, মোমবাতির আলো আর প্রার্থনার পরিবেশ বড়দিনের মূল বার্তা শান্তি ও ভালোবাসা মনে করিয়ে দেয়। আজকের দিনে পার্ক স্ট্রিটের বড়দিন মানেই চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা। থিমড লাইটিং শুরু হয় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে জওহরলাল নেহরু রোড পর্যন্ত, যা সম্প্রসারিত হয়ে মল্লিক বাজার ক্রসিং ও ক্যাথেড্রাল রোড ধরে সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই আলো শুধু সাজসজ্জা নয়, বরং ঐতিহ্যের আধুনিক রূপ।



