Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: আজকের দিনে গঙ্গার নীচ দিয়ে মেট্রো ট্রেন ছুটে চলা অনেকের কাছেই বিস্ময়ের বিষয় (Kolkata Metro)। কিন্তু এই ধারণা একেবারে নতুন নয়। প্রায় একশো বছরেরও বেশি আগে, ব্রিটিশ আমলেই গঙ্গার নীচে সুড়ঙ্গ তৈরি করে ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেই স্বপ্ন দেখেছিলেন ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারস্যার হার্লি ডালরিম্পল-হে। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত হলেও জন্মেছিলেন বাংলার বীরভূম জেলায়। তাঁর চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনাই ভবিষ্যতের মেট্রো প্রকল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভিত্তি হয়ে ওঠে।

কলকাতায় পাতালরেলের সূচনা (Kolkata Metro)
ভারতে প্রথম পাতালরেল চালু হয়েছিল কলকাতা শহরে। ১৯৮৪ সালের ২৪ অক্টোবর ইতিহাস সৃষ্টি করে কলকাতা মেট্রো। সেদিন প্রথম ট্রেন ছুটেছিল এসপ্ল্যানেড মেট্রো স্টেশন থেকে নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত। তার কয়েক মাস আগে, জুন মাসে পরীক্ষামূলক ট্রায়াল রান হয়েছিল। সেই সময় সাধারণ বাঙালির কাছে মেট্রোর নাম ছিল “পাতালরেল”। মাটির গভীর নীচে তৈরি সুড়ঙ্গপথ দিয়ে দ্রুতগতিতে ট্রেন ছুটে যাওয়ার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। কলকাতার নাগরিক জীবনে এটি ছিল এক যুগান্তকারী প্রযুক্তিগত পরিবর্তন।
গঙ্গার নীচ দিয়ে মেট্রোর প্রাথমিক ভাবনা (Kolkata Metro)
১৯২১ সালে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার স্যার হার্লে ডালরিম্পল-হে প্রথম গঙ্গার নীচ দিয়ে টিউব রেল চালানোর ধারণা দেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল গঙ্গার দুই তীরের শহর কলকাতা এবং হাওড়া কে আরও দ্রুত ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্ত করা। সেই সময় লন্ডনে টেমস নদী-এর নীচ দিয়ে টানেল তৈরি করে ট্রেন চলাচল শুরু হয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশরা ইতিমধ্যেই নদীর নীচে সুড়ঙ্গ নির্মাণ প্রযুক্তি আয়ত্ত করেছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই স্যার হার্লে গঙ্গার নীচে একটি টিউব রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। তিনি প্রায় ১০.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাতালপথের নকশা তৈরি করেন, যেখানে মোট ১০টি স্টেশন থাকার কথা ছিল। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কলকাতা ও হাওড়া শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটতে পারত।

প্রকল্প বন্ধ হওয়ার কারণ (Kolkata Metro)
পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু করার আগে গঙ্গার নীচের মাটি পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, হুগলি নদীর তলদেশে প্রচুর পলিমাটি এবং নরম কাদামাটি রয়েছে। এই ধরনের মাটিতে টানেল তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল। পরে নিজের বই কলকাতা টিউব রেলওয়ে এ স্যার হার্লে উল্লেখ করেছিলেন যে, লন্ডনের থেমস নদীর নীচে টানেল তৈরির তুলনায় হুগলি নদীর নীচে টানেল নির্মাণে প্রায় ছয় গুণ বেশি খরচ পড়ত। এত বিপুল অর্থের জোগান সেই সময় পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ১৯২৮ সালে তিনি এই মেট্রো প্রকল্প স্থগিত করে দেন।
গঙ্গার নীচে প্রথম টানেল নির্মাণ (Kolkata Metro)
মেট্রো প্রকল্প বন্ধ হলেও গঙ্গার নীচে সুড়ঙ্গ তৈরির ধারণা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। কিছুদিন পরেই CESC Limited (সিটি ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি) নতুন একটি প্রস্তাব দেয়। কলকাতা ও হাওড়ার মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য মোটা বৈদ্যুতিক কেবল নদীর নীচ দিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। সেই উদ্দেশ্যেই গঙ্গার তলদেশে একটি টানেল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্যার হার্লে এই প্রকল্পে সম্মতি দেন এবং সুড়ঙ্গ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৩১ সালে সেই টানেলের কাজ সম্পূর্ণ হয়। যদিও এটি মেট্রো ট্রেনের জন্য তৈরি হয়নি, তবু এটিই ছিল গঙ্গার নীচ দিয়ে কলকাতার প্রথম টানেল, যা দুই যমজ শহরকে প্রযুক্তিগতভাবে যুক্ত করেছিল।

আধুনিক যুগে স্বপ্নের বাস্তবায়ন
সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে এবং বহু দশক পরে সেই পুরনো স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পেয়েছে। বর্তমানে Kolkata Metro-এর ইস্ট–ওয়েস্ট করিডর গঙ্গার নীচ দিয়ে চলাচল করছে। হাওড়া ময়দান মেট্রো স্টেশন থেকে এসপ্ল্যানেড মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত এই মেট্রো রুট গঙ্গার তলদেশের সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় এক শতাব্দী আগে স্যার হার্লে ডালরিম্পল-হে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা অবশেষে বাস্তব হয়ে উঠেছে।



