Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: আজকের সময়ে যখন অধিকাংশ মানুষ নিজের জীবন ও সাফল্য নিয়েই ব্যস্ত, তখন কিছু মানুষ আছেন যাঁরা নীরবে (Prativa Ganguli), নিরলসভাবে সমাজের জন্য কাজ করে চলেছেন। সেই গুটিকয় মানুষের মধ্যেই একজন প্রতিভা গাঙ্গুলি, একাধারে শিক্ষিকা, লেখিকা এবং সমাজসেবী। সংসার, পেশা ও সামাজিক দায়িত্ব এই তিনের ভারসাম্য রক্ষা করে কীভাবে বৃহত্তর সমাজের জন্য কাজ করা যায়, তাঁর জীবন তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

আত্মনির্ভরতার পথে প্রথম পদক্ষেপ (Prativa Ganguli)
প্রতিভা গাঙ্গুলির সমাজসেবার যাত্রা কোনও পরিকল্পিত এনজিও-প্রকল্পের ফল নয়, বরং জীবনের বাস্তব পরিস্থিতি থেকেই তার সূচনা। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পরই বাবার অবসর গ্রহণ, মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা এই বাস্তবতা তাঁকে খুব অল্প বয়সেই আত্মনির্ভর হতে শিখিয়েছিল। সেই সময় থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশন পড়ানো শুরু করেন তিনি। শুধু উপার্জন নয়, ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাই ধীরে ধীরে তাঁকে সমাজসেবার দিকে নিয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলির কাছ থেকে তিনি ন্যূনতম পারিশ্রমিক নিতেন বা কখনও নিতেনই না। এই ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধই পরবর্তীকালে বৃহত্তর সামাজিক কাজে রূপ নেয়।
পরিবার ও সহযাত্রার গুরুত্ব (Prativa Ganguli)
বিয়ের পরও এই পথচলা থেমে যায়নি। বরং সংসার সামলে, সন্তান মানুষ করে সমাজসেবার কাজ চালিয়ে যাওয়া অনেকের কাছেই অসম্ভব মনে হলেও প্রতিভা গাঙ্গুলি দেখিয়েছেন পারিবারিক সহযোগিতা থাকলে তা সম্ভব। তাঁর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সমর্থন এই কাজে বড় ভূমিকা পালন করেছে। তবে এই সহযোগিতার পেছনে রয়েছে তাঁর নিজের দায়িত্ববোধও। সংসারের কাজকে অবহেলা না করে, বরং আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করার মধ্য দিয়েই তিনি পরিবারকে পাশে পেয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, পরিবার ও সমাজ এই দুইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব নয়, বরং সমন্বয়ই এগিয়ে চলার পথ।

আদিবাসী গ্রামের আলোর পাঠশালা (Prativa Ganguli)
২০২০ সালে বোলপুর সংলগ্ন একটি আদিবাসী গ্রামে কাজ শুরু করেন প্রতিভা গাঙ্গুলি। সেই গ্রামেই গড়ে ওঠে ‘মুন মাছি মুন গঠনের পাঠশালা’ একটি ছোট্ট কিন্তু স্বপ্নে ভরা শিক্ষাকেন্দ্র। এখানে বর্তমানে প্রায় পঞ্চাশজন শিশু পড়াশোনার পাশাপাশি গান, নাচ, আঁকা, আত্মরক্ষা ও সাংস্কৃতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। এই পাঠশালার মূল লক্ষ্য শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, বরং মনন গঠন। প্রতিভা গাঙ্গুলির বিশ্বাস শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষায় পাশ করা নয়, জীবনকে বোঝা, সমাজকে জানা এবং মানুষ হয়ে ওঠা। সেই লক্ষ্যেই পাঠশালার পাঠক্রম গড়ে উঠেছে। এই পাঠশালার সাফল্যের প্রমাণ মিলেছে ছাত্রছাত্রীদের অগ্রগতিতেই কেউ সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর, কেউ বিশ্বভারতীতে পড়াশোনা করছে, আবার কেউ কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন স্বপ্নের পথে হাঁটছে।
রোগ নয়, রোগীকে ভালোবাসার শিক্ষা (Prativa Ganguli)
গ্রামটিতে কাজ করতে গিয়ে টিবি আক্রান্ত বহু মানুষের সংস্পর্শে আসতে হয়েছে। প্রথমদিকে ভয় থাকলেও সচেতনতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল তাঁদের পথচলার মূল শক্তি। প্রতিভা গাঙ্গুলির মতে, রোগ নয় রোগীকে ভালোবাসলেই সুস্থতার পথ সহজ হয়। সচেতনতা, দায়িত্ব ও সহানুভূতির মাধ্যমে তাঁরা এই কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

মেয়েদের স্বাবলম্বনের লড়াই (Prativa Ganguli)
শিশুদের পাশাপাশি নারীদের জীবনও প্রতিভা গাঙ্গুলির কাজের কেন্দ্রবিন্দু। ডিভোর্সি, বিধবা, সিঙ্গল মাদার সমাজের চোখে প্রায় অদৃশ্য এই নারীদের জন্য তিনি তৈরি করেছেন সহায়তার এক শক্তিশালী পরিসর। প্রশাসনিক সহায়তা, পরিচয়পত্র সংশোধন, ঋণের আবেদন, কলেজে ভর্তি থেকে শুরু করে সংকটময় মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানো সব ক্ষেত্রেই তাঁর উদ্যোগ অনবদ্য। আন্তর্জাতিক শাড়ি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত মেলা ছিল এই প্রচেষ্টার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। যাঁদের নিজস্ব দোকান বা স্থায়ী ব্যবসার জায়গা নেই, তাঁদের জন্য একটি সম্মানজনক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
স্বপ্নের বাড়ি, স্বপ্নের আশ্রয় (Prativa Ganguli)
নিজের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করে একটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন প্রতিভা গাঙ্গুলি। এই বাড়ি শুধুই তাঁর ব্যক্তিগত আশ্রয় নয় এটি হয়ে উঠেছে নারীদের প্রশিক্ষণ, সচেতনতা শিবির, রক্তদান কর্মসূচি এবং ভবিষ্যতে সাপ্তাহিক বাজারের কেন্দ্র। এখানেই অনেক মহিলা নিজেদের পণ্য বিক্রির সুযোগ পাবেন, আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে পাবেন। ভালো কাজ করতে গিয়ে বাধা এসেছে বারবার। উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কটুকথা শুনতে হয়েছে প্রতিদিন। কিন্তু প্রতিভা গাঙ্গুলি বিশ্বাস করেন কাজই সব প্রশ্নের উত্তর। সততা, নিষ্ঠা ও ধারাবাহিকতাই তাঁর একমাত্র অস্ত্র।

আরও পড়ুন: Kolkata Book Fair: বাইরে বসে স্রষ্টারা! শিল্পী ছাড়া আদৌ সম্পূর্ণ হয় বইমেলা?
প্রাপ্তি ও প্রেরণা
এই দীর্ঘ পথচলার প্রাপ্তি কোনও আর্থিক লাভ নয় বরং মানুষের বিশ্বাস, ভালোবাসা ও সম্মান। তাঁর মতে, অর্থ চাইলেই পাওয়া যায়, কিন্তু বিশ্বাস অর্জন করতে হয় কাজের মাধ্যমে। আজকের মেয়েদের উদ্দেশে প্রতিভা গাঙ্গুলির বার্তা স্পষ্ট স্বপ্নকে বড় করতে হবে, লক্ষ্যকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং ধৈর্য হারানো চলবে না। আজ যারা কটুকথা বলছে, কাল তারাই তালি দেবে। সেই তালি পেতে সময় লাগবে, কিন্তু পথচলা থামানো যাবে না।



