Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: আবার বৃষ্টি নামবে। ভিজে ওঠে শহর, ভিজে ওঠে স্মৃতি। মানুষ ভাবে, সবকিছু থেকেই বুঝি সেরে ওঠা যায় ভালোবাসা, না-পাওয়া, অপমান, একাকীত্ব। কিন্তু সত্যিই কি যায়? বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে? সমাজের চিরকালীন উপেক্ষা, অবহেলা, ব্যবহার আর নিঃসঙ্গতার ক্ষত কি কখনও সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়? আধুনিক বাংলা সিনেমা বারবার এই প্রশ্নগুলোকেই সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। তাই আজকের বাংলা সিনেমা যখন নারীকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, তখন তা নিছক কোনো ‘ট্রেন্ড’ নয়; বরং সময়ের নির্মম বাস্তবতার শিল্পিত দলিল (Rituparno Ghosh)।
নারীকেন্দ্রিক আখ্যানের প্রয়োজন কেন? (Rituparno Ghosh)
আধুনিক বাংলা সিনেমায় নারীদের কেন্দ্র করে গল্প বলার প্রবণতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সামাজিক ইতিহাস। ৯০-এর দশক পেরিয়ে এসেও আজও নারী নিরাপদ নয়। ধর্ষণ, গার্হস্থ্য হিংসা, সামাজিক অবদমন—সবকিছু মিলিয়ে নারীর জীবন এখনও ভয়ংকরভাবে বিপন্ন। অথচ প্রতি বছর আমরা মাতৃরূপে নারীকে পূজা করি। দুর্গাপুজোর সময় রাস্তায় রাস্তায় ধ্বনিত হয় দেবী বন্দনা। কিন্তু সেই সমাজই বাস্তবের মেয়েদের সম্মান দিতে বারবার ব্যর্থ হয়।
এই ভয়াবহ দ্বিচারিতাই বাংলা সিনেমাকে নারীদের দিকে ফিরিয়ে এনেছে। কারণ আধুনিকতার গল্প বলতে গেলে, সমাজের ভিতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারকে সামনে আনতেই হয়। আর সেই অন্ধকারের সবচেয়ে বড় শিকার বহু ক্ষেত্রেই নারী। বাংলা সিনেমা তাই কেবল নারীকে ‘নায়িকা’ হিসেবে ব্যবহার করেনি; বরং তাকে সমাজের এক গভীর সংকটের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে।

‘মেঘে ঢাকা তারা’ থেকে ‘দেবী’ (Rituparno Ghosh)
বাংলা সিনেমায় নারীর বিপন্নতার যে শক্তিশালী ভাষা আমরা আজ দেখি, তার বীজ রোপিত হয়েছিল আরও বহু আগে। ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ কিংবা সত্যজিৎ রায়ের ‘দেবী’ এই ছবিগুলো শুধু নারীর ব্যক্তিগত যন্ত্রণার গল্প নয়, বরং সমাজের নির্মমতার দলিল।
নীতার চিৎকার “দাদা, আমি বাঁচতে চাই” আসলে গোটা সমাজের চেপে রাখা নারীকণ্ঠের আর্তনাদ। আবার ‘দেবী’-তে দয়াময়ী হয়ে ওঠেন পুরুষতান্ত্রিক কুসংস্কারের শিকার। নারী সেখানে মানুষ নয়, প্রতীক। পূজিত হওয়া আর মানুষ হিসেবে বাঁচার মধ্যে যে ভয়ংকর ফারাক, বাংলা সিনেমা বহু আগেই তা বুঝে ফেলেছিল। এই যাত্রাই পরবর্তীকালে আরও আধুনিক ভাষায় ফিরে আসে ২০০০-এর দশকের বাংলা ছবিতে।
নতুন সহস্রাব্দে নারীর নতুন ভাষা (Rituparno Ghosh)
২০০০ সালের পর বাংলা সিনেমায় নারীর গল্প বলার ভঙ্গি বদলাতে শুরু করে। গল্পের গঠন, চরিত্রের নির্মাণ, ক্যামেরার ভাষা সবকিছুতেই আসে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু বিষয়গতভাবে একটি জায়গা অপরিবর্তিত থাকে: নারীর গভীর একাকীত্ব ও বিপন্নতা। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘বাড়িওয়ালি’ এবং বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘উত্তরা’। এই ছবিগুলো নারীকে শুধুমাত্র সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ করে দেখেনি; বরং তার ভেতরের নিঃসঙ্গতা, দমবন্ধ করা অস্তিত্ব এবং অপ্রকাশিত আকাঙ্ক্ষাগুলোকেও সামনে এনেছে।

‘বাড়িওয়ালি’: এক নিঃসঙ্গ নারীর নীরব চিৎকার (Rituparno Ghosh)
ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘বাড়িওয়ালি’ আধুনিক বাংলা সিনেমার এক অসামান্য দলিল। ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বনলতা এক প্রায় পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ির মালকিন। বিশাল বাড়ি, পুরোনো আসবাব, ধুলো জমে থাকা স্মৃতি সবকিছুর মাঝখানে তিনি যেন এক জীবন্ত ভূত। বনলতার জীবন নিঃসঙ্গ। তাঁর সঙ্গী বলতে বৃদ্ধ চাকর আর মাইনে করা ঝি মালতী। কোনো বন্ধু নেই, প্রেম নেই, সংসার নেই। অথচ তাঁরও ইচ্ছে আছে, ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে, নিজের মতো করে বাঁচার স্বপ্ন আছে। ঋতুপর্ণ এখানেই অসাধারণ। তিনি দেখান, একাকী নারীদেরও হৃদয় থাকে। সমাজ সাধারণত ধরে নেয়, বয়স পেরিয়ে গেলে বা ‘সুন্দরী’ না হলে নারীদের আর কোনো আকাঙ্ক্ষা থাকে না। কিন্তু বনলতা সেই ধারণাকে ভেঙে দেন।

স্টিরিওটাইপ ভাঙার সাহস (Rituparno Ghosh)
এই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি হল এর স্টিরিওটাইপ ভাঙা। দীর্ঘদিন ধরে সিনেমায় নায়িকা মানেই ছিল তথাকথিত সুন্দরী নারী। ঋতুপর্ণ সেই ধারণাকে সরাসরি আঘাত করেন। বনলতার চরিত্রে কিরণ খেরকে নেওয়া ছিল এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। তিনি চিরাচরিত অর্থে ‘গ্ল্যামারাস’ নন। অথচ তাঁর অভিনয়ে বনলতার নিঃসঙ্গতা, লজ্জা, আশা, অপমান সবকিছু এমনভাবে ফুটে ওঠে যে দর্শক ভিতর থেকে নাড়িয়ে যায়। একজন অবাঙালি অভিনেত্রীকে এত নিখুঁতভাবে এক বাঙালি বাড়িওয়ালির চরিত্রে দাঁড় করানোও ঋতুপর্ণের অসাধারণ নির্মাণশক্তির প্রমাণ।
প্রেম নয়, ব্যবহারের গল্প (Rituparno Ghosh)
‘বাড়িওয়ালি’-তে বনলতার জীবনে একজন পুরুষ আসে। দর্শক মনে করতে শুরু করে, হয়তো এবার তাঁর জীবনে ভালোবাসা আসবে। কিন্তু ঋতুপর্ণ নিষ্ঠুর বাস্তবটাই দেখান। সেই সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত প্রেমে পৌঁছায় না; বরং বনলতা ব্যবহৃত হন। এখানেই ছবিটি ভয়ংকরভাবে বাস্তব। সমাজে বহু নারী আছেন, যাঁদের আবেগ, ভালোবাসা, আত্মসম্মান সবকিছুই পুরুষতান্ত্রিক সুবিধাবাদের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। বনলতা যেন তাঁদেরই প্রতিনিধি। ঋতুপর্ণ কোনো কৃত্রিম মুক্তি দেন না। তিনি জানিয়ে দেন, সমাজের কাঠামো এমনভাবে তৈরি যে বাংলার বহু মেয়ের পরিত্রাণ যেন কখনওই সম্ভব নয়।

‘উত্তরা’: শরীর, ধর্ম ও সহিংসতা (Rituparno Ghosh)
একই সময় বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘উত্তরা’ অন্য এক ভাষায় নারীর সংকটকে তুলে ধরে। এখানে নারী শুধুমাত্র ব্যক্তি নয়; বরং ধর্মীয় উন্মাদনা, যৌন দমন এবং সহিংসতার মাঝখানে আটকে থাকা এক অস্তিত্ব। এই ছবিতে নারীকে ঘিরে যে ভয় এবং অস্থিরতা তৈরি হয়, তা আধুনিক সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। নারী যেন সবসময় আক্রমণের মুখে—শরীরেও, মনেও।
আধুনিক বাংলা সিনেমা কেন বারবার নারীর কাছে ফিরে যায়?
কারণ নারীকে বাদ দিয়ে আধুনিক সমাজের সংকটকে বোঝা সম্ভব নয়। নারীর অভিজ্ঞতা আসলে সমাজের গভীরতম অসুখগুলোর প্রতিফলন। তাই আধুনিক বাংলা সিনেমা যখন নারীর গল্প বলে, তখন তা কেবল নারী নিয়ে গল্প বলে না; বরং পুরো সমাজের ভাঙন, একাকীত্ব এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কথাই বলে। এই সিনেমাগুলো আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ এগুলো আমাদের আয়না দেখায়।

আরও পড়ুন: Anik Dutta: খ্যাতির আড়ালে নিঃসঙ্গতাই শেষ করে দিল পরিচালক অনীক দত্তকে?
অন্ধকারের ভিতরে আলো খোঁজা
সময়ের সঙ্গে গল্প বলার ভাষা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, দর্শকের রুচি বদলেছে। কিন্তু নারীর বিপন্নতা এখনও একই রয়ে গেছে। তাই আধুনিক বাংলা সিনেমা বারবার নারীদের দিকে ফিরে যায়। কারণ তাঁদের জীবনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমাজের সবচেয়ে বড় সত্যগুলো। ‘বাড়িওয়ালি’-র বনলতা, ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র নীতা, ‘দেবী’-র দয়াময়ী কিংবা ‘উত্তরা’-র নারীরা—তাঁরা প্রত্যেকেই আমাদের সময়ের সাক্ষী। তাঁদের চিৎকার, তাঁদের নীরবতা, তাঁদের অপূর্ণতা—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় বাংলা সিনেমার সবচেয়ে মানবিক ভাষা।



