Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁরা কেবল সিনেমা নির্মাণ করেননি (Ritwik Ghatak); গড়ে তুলেছেন এক বোধ, এক চিন্তাধারা, এক শিল্পদর্শন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্নিময়, সবচেয়ে প্রশ্নমুখর নাম ঋত্বিক ঘটক। যিনি নিজেই একবার বলেছিলেন “না মশাই, সিনেমার প্রেমে আমি পড়িনি।” তবু আজ, তাঁর জন্মশতবর্ষে এলেই, মানুষ সবচেয়ে বেশি মনে রাখে তাঁর সিনেমা যে সিনেমা একদিন তিনি নিজেই লাথি মেরে ছেড়ে যেতে চেয়েছিলেন।
এক তরুণ নাট্যকারের আবির্ভাব (Ritwik Ghatak)
ঋত্বিক ঘটকের নাট্যজীবনের শুরু ১৯৫০ সালে, তাঁর প্রথম নাটক ‘জ্বালা’ দিয়ে। তখন তিনি সাংবাদিক, ‘ইন্ডিয়ান ওয়ে’ পত্রিকার বাংলার সংবাদদাতা। কলকাতায় একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনার প্রতিবেদন থেকেই জন্ম নেয় নাটকটি। ঋত্বিক লিখেছিলেন, “সে সময় আমি একত্রিশটা সুইসাইড দেখে ‘সুইসাইড ওয়েভ ইন ক্যালকাটা’ লিখে পাঠালাম… এই ‘জ্বালা’ নাটকে তার থেকে সিলেক্ট করা ছ’টা চরিত্র ইচ ওয়ান ইজ এ ট্রু ক্যারেক্টার।” এই নাটকই তাঁকে নিয়ে আসে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের ৪৬ ধর্মতলা স্ট্রিটের আড্ডায়। সেখানেই দেখা হয় মৃণাল সেন, সুনীল দত্ত, শম্ভু মিত্রদের সঙ্গে যেখান থেকে শুরু হয় এক দামাল সাংস্কৃতিক যাত্রা।
হারানো নাটক, হারানো পাণ্ডুলিপি (Ritwik Ghatak)
‘জ্বালা’-র পর ঋত্বিক লিখলেন আরও চারটি মৌলিক নাটক ‘দলিল’, ‘সাঁকো’, ‘সেই মেয়ে’, ‘জ্বলন্ত’। অনুবাদ করলেন ব্রেখটের ‘গ্যালিলিও চরিত’ ও ‘খড়ির গণ্ডি’। কিন্তু তাঁর অনেক কাজই হারিয়ে গেছে ‘অফিসার’, ‘ইস্পাত’, এমনকি ‘খড়ির গণ্ডি’-র শেষ দুটি দৃশ্যও উধাও। তাঁর স্ত্রী সুরমা ঘটক জানাতেন, সেই হারানো পাণ্ডুলিপি একদিন কাগজের স্তূপে ছিল, যা পরে আর কেউ খুঁজে পায়নি।
থিয়েটার থেকে সিনেমা (Ritwik Ghatak)
অনেকেই ঋত্বিককে শুধু চলচ্চিত্রকার হিসেবে চেনেন, কিন্তু তাঁর আত্মা ছিল থিয়েটারে। কৈশোরে অভিনয় করেছিলেন ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে চাণক্যর ভূমিকায়। দেশভাগের পর গণনাট্য সংঘে যোগ দিয়ে অভিনয় করলেন ‘নবান্ন’-এ রাজীব চরিত্রে, পরে নিজেই পরিচালনা করলেন রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’। ১৯৫৪ সালে দেশভাগ ও দাঙ্গা নিয়ে লিখলেন ‘সাঁকো’ যা থেকে শুরু হয় তাঁর নাট্যদল ‘গ্রুপ থিয়েটার’। এখান থেকেই পরবর্তীতে বাংলা নাটকের ‘গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন’-এর বীজ রোপিত হয়।
চলচ্চিত্রে ঋত্বিকের অন্তরঙ্গ সত্য (Ritwik Ghatak)
দেশভাগ, রিফিউজি জীবন, মানুষের অনটন এইসব ছিল ঋত্বিকের শিল্পের মূলে। তাঁর সিনেমা ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’ কেবল গল্প নয়, বাংলার ইতিহাসের আত্মকথা। ‘কোমল গান্ধার’-এর ভৃগু যখন বলে, “রিফিউজি হবো ক্যানে?” সেটা কেবল চরিত্রের প্রশ্ন নয়, এক যুগের আর্তনাদ। ঋত্বিক বিশ্বাস করতেন, “যতদিন দুই বাংলা না মিলবে, ততদিন ভাঙা বাংলার কপাল ভাঙাই থাকবে।”
হারানো দেশ, হারানো মানুষ (Ritwik Ghatak)
ছোটোবেলার পদ্মার ধারে বেড়ে ওঠা ছেলেটি সারাজীবন খুঁজেছেন সেই হারানো রূপকথার দেশ। তাঁর লেখায় উঠে আসে হাহাকার, “যাহা দেখিয়াছি, তাহা দেখাইতে পারিতেছি না।” এই না-পারার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ঋত্বিকের বেদনাবোধএক ভাঙা দেশ, ভাঙা মানুষের সত্তা, যা বারবার ফিরে আসে তাঁর সিনেমায়।
তাঁর নন্দনদর্শন (Ritwik Ghatak)
ঋত্বিক ঘটকের কাছে শিল্প মানে কেবল সৌন্দর্য নয়, প্রথমে সত্য। তিনি লিখেছেন, “শিল্পকে সুন্দর হতেই হবে, কিন্তু সত্যকে বর্জন করে নয়। সে সত্য সামাজিক সত্য।” তিনি রবীন্দ্রনাথকে যেমন সমালোচনা করেছেন, তেমনই সন্মানও জানিয়েছেন। আবার সত্যজিৎ রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলেছেন, “ভারতে সিনেমার মাধ্যমটাকে যদি কেউ বোঝে, তবে তিনি একমাত্র সত্যজিৎ রায়।” তবু সাহসের সঙ্গে তাঁর সিনেমার সমালোচনাও করেছেন, কারণ তাঁর কাছে আদর্শের সততা ছিল সর্বাগ্রে।
মানুষ ছিল তাঁর কেন্দ্র (Ritwik Ghatak)
চলচ্চিত্র বা নাটক সবখানেই ঋত্বিকের কেন্দ্রবিন্দু মানুষ। কৃষক, শ্রমিক, রিফিউজি, যৌনকর্মী সবাই তাঁর সিনেমার অংশ। ‘সুবর্ণরেখা’-য় সীতার আত্মহত্যা কেবল এক নারীর মৃত্যুই নয়, ভাঙা সমাজের নৈতিক পরাজয়। তাঁর চোখে শিল্পের উদ্দেশ্য ছিল, “মানুষের সঙ্গে যোগ, মানুষকে ভালোবাসা, মানুষের মধ্যে অনন্তকে প্রত্যক্ষ করা।”
হাসপাতালের মঞ্চে নাটক (Ritwik Ghatak)
জীবনের শেষদিকে, মানসিক রোগে ভুগতে ভুগতে লিখলেন নাটক ‘সেই মেয়ে’। অভিনয় করলেন হাসপাতালের কর্মীদের দিয়ে। ১৯৭৫ সালে জমা দিলেন চলচ্চিত্র ‘সেই বিষ্ণুপ্রিয়া’-র প্রস্তাব, যা কখনও অনুমোদন পেল না। এর কয়েক মাস পর, ১৯৭৬ সালে, নিঃশব্দে চলে গেলেন তিনি যে শহর একদিন তাঁকে ভুলে গিয়েছিল, সেই কলকাতাতেই।
আরও পড়ুন: West Midnapore Patchitra: একটা গোটা গ্রামই যদি হয় ক্যানভাস! তবে শিল্প কখনও থামে?
আজও কী প্রাসঙ্গিক ঋত্বিক ঘটক!
আজও যখন বাংলার সাধারণ মানুষের গল্প হারিয়ে যায় চকচকে পর্দায়, তখন ঋত্বিক ঘটকের সিনেমাগুলো মনে করিয়ে দেয়, “বাংলার ঘাটে-আঘাটায় শুধু মানুষ, মানুষ আর মানুষ।” তাঁর শিল্প আজও প্রশ্ন তোলে, জাগায়, আলো ছড়ায়। তিনি যে আগুন একদিন ‘জ্বালা’ নাটকে জ্বালিয়েছিলেন, তা আজও নেভেনি।



