Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে কিছু দুর্ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত শোকের কারণ হয়ে থাকেনি, বদলে দিয়েছে রাজনৈতিক গতিপথ, ক্ষমতার উত্তরাধিকার এবং দলগুলির ভবিষ্যৎ (Sanjay Gandhi)। সাম্প্রতিক কালে বিমান দুর্ঘটনায় অজিত পওয়ারের মৃত্যু মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণ তৈরি করেছে। এনসিপির ভবিষ্যৎ, দলটির অস্তিত্ব, নেতৃত্বের প্রশ্ন সবকিছুই আজ নতুন করে আলোচনায়। এই প্রেক্ষিতে ফিরে তাকানো জরুরি আরেকটি ঐতিহাসিক বিমান দুর্ঘটনার দিকে, যা বদলে দিয়েছিল কংগ্রেসের ভাগ্য সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যু।

মাত্র ১২ মিনিটে শেষ হয়ে যাওয়া এক সম্ভাবনার নাম (Sanjay Gandhi)
১৯৮০ সালের ৩০ জুন সকাল। কুর্তা-পাজামা, কোলাপুরি জুতো পরে সঞ্জয় গান্ধী পৌঁছন সফদরজং বিমানবন্দরে। সময় তখন সকাল ৭টা ৫৮। মাত্র ১২ মিনিট পর ৮টা ১০-এ ভারতীয় রাজনীতির এক আগ্রাসী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও দূরদর্শী নেতার জীবন থেমে যায় চিরতরে। সঞ্জয় গান্ধী ছিলেন প্রশিক্ষিত পাইলট। ১৯৭৬ সালে তিনি পাইলটের লাইসেন্স পান এবং অ্যারোবেটিক উড়ানে তাঁর দক্ষতা নিয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না। কিন্তু যেদিন তিনি দুর্ঘটনার শিকার হন, সেই বিমানটি তিনি আগে উড়িয়েছিলেন মাত্র ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। তবু আত্মবিশ্বাসী সঞ্জয় বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রাখেন। আকাশে স্টান্ট করার সময় উচ্চতা ঠিকভাবে আন্দাজ করতে না পেরে নিয়ন্ত্রণ হারান। একটি নীম গাছে ডানা ধাক্কা খাওয়ার পর ভেঙে পড়ে বিমানটি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় সঞ্জয় গান্ধীর। ইন্দিরা গান্ধীর হাতে উঠে আসে সন্তানের কেবল একটি ঘড়ি যা হয়ে ওঠে এক রাজনৈতিক যুগান্তরের প্রতীক।

প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা (Sanjay Gandhi)
সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যুর পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে এটি নিছক দুর্ঘটনা, না কি এর নেপথ্যে কোনও ষড়যন্ত্র ছিল? কার লাভ হল এই মৃত্যিতে? কে পেল রাজনৈতিক সুবিধা? তদন্ত, লেখালেখি, জল্পনা সবই হয়েছে। কিন্তু চার দশক পেরিয়েও কোনও প্রশ্নেরই নিশ্চিত উত্তর মেলেনি। তবে একটি বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই এই মৃত্যু ভারতীয় রাজনীতির অভিমুখ বদলে দিয়েছিল।
ক্ষমতার কেন্দ্রে সঞ্জয় গান্ধী (Sanjay Gandhi)
জরুরি অবস্থার সময় কংগ্রেসের অন্দরে ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র ছিলেন সঞ্জয় গান্ধী। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, বস্তি উচ্ছেদ, স্বচ্ছতা অভিযান এই নীতিগুলি প্রবল সমালোচিত হলেও উদ্দেশ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন খুব কম মানুষই। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলীয় সংগঠনের উপর কার্যত একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। অনেকে মনে করতেন, ইন্দিরা গান্ধীর থেকেও সঞ্জয় ছিলেন বেশি আগ্রাসী, বেশি কঠোর, এমনকি অনেকের চোখে ‘নিষ্ঠুর’। কিন্তু তাঁর দূরদৃষ্টি ও আধুনিক ভারতের স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা নিয়েও কারও সংশয় ছিল না। দুর্নীতিমুক্ত, শৃঙ্খলাবদ্ধ, উন্নয়নমুখী ভারত যে ভাবনাগুলি আজকের রাজনীতিতে শোনা যায়, তার অনেকটাই সঞ্জয়ের চিন্তায় উপস্থিত ছিল সত্তরের দশকেই।

উত্তরাধিকার প্রশ্নে ইন্দিরার স্পষ্ট পছন্দ (Sanjay Gandhi)
কংগ্রেসের অন্দরে তখন প্রায় সকলেই জানতেন ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হবেন সঞ্জয় গান্ধী। দলীয় নেতাদের বিস্তর অভিযোগ সত্ত্বেও ইন্দিরা কখনও সঞ্জয়কে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেননি। বরং বহু ক্ষেত্রেই তাঁকে ছাড় দিয়েছেন, এমনকি কিছু ‘অন্যায়’-কেও প্রশ্রয় দিয়েছেন। অন্যদিকে, বড় ছেলে রাজীব গান্ধীর রাজনীতিতে কোনও আগ্রহই ছিল না। তিনি ছিলেন ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত, রাজনীতির বাইরে। ফলে পরিবার ও দলের অন্দরমহলে বিষয়টি ছিল স্পষ্ট সঞ্জয়ই ভবিষ্যৎ।
দুর্ঘটনার পর রাজীব গান্ধীর উত্থান (Sanjay Gandhi)
সঞ্জয়ের মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েন ইন্দিরা গান্ধী। ধীরে ধীরে তিনি রাজনীতিতে টেনে আনেন রাজীব গান্ধীকে। ইন্দিরার হত্যার পর রাজীব অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী হন। সেখান থেকেই কংগ্রেসের ব্যাটন চলে যায় গান্ধী পরিবারের এক ভিন্ন ধারায়। রাজীবের পর কংগ্রেসের সভাপতি হন সোনিয়া গান্ধী, পরে রাহুল গান্ধী। সোনিয়ার নেতৃত্বে সরকার গড়লেও তা ছিল জোটনির্ভর, অনেকটাই ‘জোড়াতালি’ দিয়ে চলা শাসন। রাহুল গান্ধীর আমলে কংগ্রেস ক্রমাগত নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে। বর্তমানে দেশের মাত্র তিনটি রাজ্যে কংগ্রেসের সরকার যা এক সময়ের সর্বভারতীয় শক্তিশালী দলের জন্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
সঞ্জয়ের অনুপস্থিতি (Sanjay Gandhi)
কংগ্রেসের অন্দরে আজও অনেকেই বিশ্বাস করেন রাজীব গান্ধীর তুলনায় সঞ্জয় অনেক শক্তিশালী, দৃঢ় ও রাজনৈতিকভাবে দক্ষ নেতা হতে পারতেন। ইন্দিরার পর কংগ্রেসের যে অবক্ষয় শুরু হয়, তার মূল কারণ নেতৃত্বের অভাব। সেই শূন্যতা রাজীব বা পরবর্তী নেতৃত্ব কেউই পূরণ করতে পারেননি। অনেকে মনে করেন, আজ বিজেপি যে এজেন্ডাগুলিকে কেন্দ্র করে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, সঞ্জয় থাকলে সেগুলিকে অনেক আগেই রাজনৈতিকভাবে ভোঁতা করে দেওয়া সম্ভব হত।

আরও পড়ুন: Ajit Pawar: শোকস্তব্ধ বারামতি, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষযাত্রা, চিরবিদায় অজিত পাওয়ারের…
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?
এই প্রেক্ষিতেই অজিত পওয়ারের মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। যেমন সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যু কংগ্রেসের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল, তেমনই অজিত পওয়ারের অনুপস্থিতি এনসিপির রাজনীতিকে আমূল পাল্টে দিতে পারে। শক্তিশালী নেতৃত্ব হারালে শুধু একটি পরিবার বা গোষ্ঠী নয়, গোটা দলই অস্তিত্ব সংকটে পড়ে ভারতীয় রাজনীতি তার বহু উদাহরণ দেখেছে।



