Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: নিট-সহ একাধিক সর্বভারতীয় পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে টানা ১৭ দিন ধরে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও পরিবেশপ্রেমী সোনম ওয়াংচুক (Sonam Wangchuk)। দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা এই অনশন কেবল একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সংস্কারের দাবিকেই সামনে এনে দিয়েছে। দীর্ঘ অনশনের মধ্যেও নিজের অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেননি ওয়াংচুক। বরং তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই আন্দোলনের লক্ষ্য কোনও ব্যক্তিকে আক্রমণ করা নয়; বরং এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মেধা, সততা ও ন্যায়বিচারের মূল্য থাকবে।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বার্তা (Sonam Wangchuk)
এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সোনম ওয়াংচুক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশে সরাসরি আবেদন জানান। তাঁর কথায়, একটি গণতান্ত্রিক দেশের সরকারকে জনগণের কণ্ঠস্বর শুনতে হবে। একগুঁয়ে মনোভাব পরিহার করে সংবেদনশীল হওয়ার পরামর্শও দেন তিনি। ওয়াংচুকের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সরকারেরই লাভ হবে যদি তারা মানুষের উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং দাবি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে। তাঁর বক্তব্য, গণতন্ত্র কখনও একতরফা সিদ্ধান্তের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না; বরং তা সহমর্মিতা, জবাবদিহি এবং মানুষের আস্থার ভিত্তিতেই টিকে থাকে।
সরকারের সঙ্গে এখনও কোনও যোগাযোগ হয়নি
অনশন শুরু হওয়ার পর এতদিনে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনও যোগাযোগ করা হয়নি বলেই দাবি করেছেন সোনম ওয়াংচুক। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, আন্দোলন আরও জোরদার হলে সরকারের কাছে এই দাবিগুলি পৌঁছাবে এবং সমস্যার সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, যদি সরকার নীরব থাকে, তবে শুধু সরকারের নয়, দেশের সেই সব রাজনৈতিক দল এবং জননেতাদেরও দায় থাকবে, যারা এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

‘একজন মন্ত্রীর পদত্যাগই শেষ কথা নয়, প্রয়োজন জবাবদিহি’
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে কি গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার সম্ভব এই প্রশ্নের উত্তরে ওয়াংচুকের বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, একজন ব্যক্তির ইস্তফা হয়তো সমস্ত সমস্যার সমাধান করবে না, কিন্তু জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি প্রশ্নফাঁস বা দুর্নীতির মতো ঘটনায় কোনও দায়বদ্ধতা না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের অনিয়ম চলতে থাকবে। এর ফলে কেবল পরীক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না; সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়বে। তাঁর ভাষায়, প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তি যদি চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হয়ে ওঠেন, তাহলে ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের জীবনই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
‘আজ দেশে সততার কোনও মূল্য নেই’ (Sonam Wangchuk)
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সোনম ওয়াংচুক বলেন, সততার মূল্য ক্রমশ কমে যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসততা এবং দুর্নীতি সমাজের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠছে। তিনি দাবি করেন, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে শুরু করে নির্বাচন পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যদিও এই বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত মতামত, তবু তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।
বিরোধীদের ভূমিকাতেও অসন্তোষ (Sonam Wangchuk)
সরকারের পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকাতেও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সোনম ওয়াংচুক। তাঁর অভিযোগ, অনেকেই মৌখিক সমর্থন জানালেও আন্দোলনের পাশে বাস্তবে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। তিনি মনে করেন, শিক্ষা ব্যবস্থা দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি মৌলিক বিষয়। তাই দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যেক রাজনৈতিক শক্তির উচিত এই বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।

শারীরিক অবস্থার অবনতি, কমেছে প্রায় আট কেজি ওজন
অনশন দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে বলে আন্দোলনকারীদের দাবি। জানা গিয়েছে, গত ১৭ দিনে তাঁর ওজন প্রায় আট কেজি কমে গিয়েছে এবং রক্তে শর্করার মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে এসেছে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে থাকলেও তিনি এখনও নিজের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন।
পাশে দাঁড়ালেন ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর অভিনেতা ওমি বৈদ্য (Sonam Wangchuk)
সোনম ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলিউড অভিনেতা ওমি বৈদ্য, যিনি ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবিতে ‘চতুর’ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পরিচিত। তিনি যন্তর মন্তরে গিয়ে ওয়াংচুকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং পরে ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, বাস্তব জীবনের সোনম ওয়াংচুকই ‘ফুনসুখ ওয়াংড়ু’ চরিত্রের অনুপ্রেরণা। এমন একজন অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষকে তিনি কোনওভাবেই হারাতে চান না।
ওমি বৈদ্য সকলের উদ্দেশে আবেদন জানান, আন্দোলনের সঙ্গে একমত হোন বা না হোন, অন্তত সোনম ওয়াংচুক কী নিয়ে লড়াই করছেন, তা জানার চেষ্টা করুন। তাঁর মতে, শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং লাদাখের স্বায়ত্তশাসনের মতো বিষয়গুলি কেবল একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, ভবিষ্যৎ ভারতের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
আরও পড়ুন: Abhisek Banerjee: কণ্ঠস্বরের নমুনা মামলায় অস্বস্তিতে অভিষেক, দ্রুত শুনানির আর্জি খারিজ
শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য
সোনম ওয়াংচুকের অনশন এখন শুধুমাত্র নিট প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ নিচ্ছে।



