Last Updated on [modified_date_only] by Shroddha Bhattacharyya
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলার সংস্কৃতি জগতে এক গুরুত্বপূর্ণ খবর সামনে এসেছে। প্রায় ২০ বছর পর আবার পশ্চিমবঙ্গে পা রাখতে চলেছেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin)। আগামী ১ আগস্ট কলকাতার রবীন্দ্রসদনে আয়োজিত মৌলবাদ-বিরোধী কবি-সাহিত্যিকদের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। অনুষ্ঠানে তিনি কবিতা পাঠ করবেন বলেও জানা গেছে। একই মঞ্চে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। এই খবরটি প্রথম প্রকাশ্যে আনেন তসলিমা নাসরিন নিজেই। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি কলকাতায় ফেরার খবর জানিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। তাঁর এই ঘোষণার পর থেকেই সাহিত্য মহল, রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা।
২০০৭ সালের বিতর্ক থেকে ২০২৬-এর প্রত্যাবর্তন (Taslima Nasrin)
তসলিমা নাসরিনের কলকাতা ছাড়ার ঘটনা এখনও অনেকের স্মৃতিতে স্পষ্ট। ২০০৭ সালে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে শহরে উত্তেজনা ও প্রতিবাদের আবহ তৈরি হওয়ার পর তাঁকে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল। পরে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ভারতে এলেও পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের সুযোগ পাননি। দুই দশক পর সেই অধ্যায়ের যেন নতুন মোড়। বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে তাঁর কলকাতা প্রত্যাবর্তনকে কেউ দেখছেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জয় হিসেবে, আবার কেউ মনে করছেন এর পিছনে রাজনৈতিক বার্তাও থাকতে পারে।
“স্বাগত জানাই, তবে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার মতো ঘটনা নয়” (Subho Dasgupta)
বিশিষ্ট কবি শুভ দাশগুপ্ত এই প্রসঙ্গে সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যে কারণে তসলিমা নাসরিনকে একসময় কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল, সেই কারণ যেমন তাঁর পছন্দ হয়নি, তেমনই বর্তমানে যাঁরা তাঁকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন, তাঁদের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়েও তিনি নিশ্চিত নন। শুভ দাশগুপ্ত বলেন, তসলিমা নাসরিনের লেখার একটি বড় অংশ মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধে। ফলে তাঁকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র উদার মানসিকতাই কাজ করছে, এমনটা তিনি নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না। ভবিষ্যৎই তার প্রকৃত উত্তর দেবে বলে তাঁর মত।
তাঁর বক্তব্যে আরও উঠে আসে, তসলিমা নাসরিন কলকাতায় ফিরে এলেই সমাজে বিরাট পরিবর্তন হবে বা মানুষের জীবনযাত্রা বদলে যাবে এমনটা তিনি মনে করেন না। তাঁর মতে, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘটনা হলেও অতিরঞ্জিত করে দেখার প্রয়োজন নেই। তবে একজন সাহিত্যিক হিসেবে আর একজন সাহিত্যিককে স্বাগত জানানোই তাঁর দায়িত্ব বলে মনে করেন শুভ দাসগুপ্ত। তিনি বলেন, তসলিমা নাসরিন একজন অত্যন্ত ভালো লেখিকা এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাই তিনি কলকাতায় এলে তাঁকে স্বাগত জানানো উচিত।
“মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বার্থে এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ” (Binod Ghoshal)
অন্যদিকে বিশিষ্ট সাহিত্যিক বিনোদ ঘোষাল বিষয়টিকে অনেক বেশি ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাঁর কথায়, এই খবরটি দেখার পর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, “বাহ!” বিনোদ ঘোষালের মতে, ভারতের সংবিধানের জন্য প্রকৃত বিপজ্জনক না হলে কোনো লেখক বা চিন্তাবিদকে শুধুমাত্র মতপ্রকাশের কারণে দেশ থেকে দূরে রাখা ভারতের গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, পশ্চিমবঙ্গের আগের দুটি সরকারকে সাধারণ মানুষ যথেষ্ট উদারপন্থী বলে মনে করলেও তারা কেউই তসলিমা নাসরিনকে কলকাতায় থাকার সুযোগ করে দিতে পারেনি। তাঁর মতে, ভোটব্যাঙ্কের রাজনৈতিক সমীকরণই সেই সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ ছিল।
“বাংলার মানুষ এখনও উদার” (Taslima Nasrin)
বিনোদ ঘোষালের মতে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এখনও যথেষ্ট উদার এবং নতুন ভাবনাকে গ্রহণ করার মানসিকতা তাঁদের রয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, বাঙালি সমাজ বহুদিন ধরেই নতুন চিন্তা ও ভিন্ন মতকে গ্রহণ করার ক্ষমতা দেখিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, যেই সরকারকে দীর্ঘদিন সাম্প্রদায়িক বলে সমালোচনা করা হয়েছে, সেই সরকারের আমলেই তসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তন ঘটছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতেই পারে, তবে তিনি নিজেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে নয়, একজন সাহিত্যিক হিসেবেই বিষয়টি দেখছেন। তাঁর বক্তব্য, যদি তসলিমা নাসরিন সত্যিই মুক্তচিন্তার পক্ষে লেখালেখি করেন, তাহলে তাঁর কলকাতায় আগমনকে স্বাগত জানানো উচিত। একইসঙ্গে বর্তমান রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তকেও তিনি সাধুবাদ জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: Taslima Nasrin: তসলিমার কলকাতায় ফেরা নিয়ে এবার নতুন সিদ্ধান্ত নেবে প্রশাসন
রাজনীতির সংযোগস্থলে নতুন বিতর্ক
তসলিমা নাসরিন বরাবরই বিতর্কিত হলেও একইসঙ্গে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত লেখক। ধর্মীয় মৌলবাদ, নারী স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর লেখালেখি বহুবার আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। তাঁর কলকাতা প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে শুধু একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নকেও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।



