Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পিংলার কোণ ঘেঁষে ছোট্ট অথচ শিল্পে-ভরপুর একটি গ্রাম নয়া গ্রাম (West Midnapore Patchitra) । এখানে শিশুরা যখন হাঁটতে শেখে, তখন থেকেই হাতে তুলে নেয় রং-তুলি। প্রতিটি বাড়ির দেওয়ালই যেন একেকটি খোলা ক্যানভাস, আর প্রতিটি মানুষ একেকজন জন্মজাত শিল্পী। এই গ্রামের পরিচয়ই হলো পটচিত্র। নয়া গ্রাম যেন এক জীবন্ত গ্যালারি, যেখানে গাছপালা, প্রাণী, পৌরাণিক চরিত্র আর প্রকৃতির রঙিন ছোঁয়া একাকার হয়ে গেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে।

কাপড়ে আঁকা কাহিনি (West Midnapore Patchitra)
‘পট’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘পট্ট’, অর্থাৎ কাপড়। আর যারা এই পটে গল্প আঁকেন, তাঁদের বলা হয় ‘পটুয়া’। তাঁরা শুধু ছবি আঁকেন না, সেই ছবির সঙ্গে গান গেয়েও গল্প বলেন যা পরিচিত ‘পটের গান’ নামে। এই গান ও ছবির সংমিশ্রণে ফুটে ওঠে দেব-দেবীর কাহিনি, লোককথা, বীরগাথা, এমনকি আধুনিক সামাজিক বার্তাও যেমন বনভূমি সংরক্ষণ, নারীস্বাধীনতা, এইডস প্রতিরোধ ইত্যাদি।

রং আসে প্রকৃতি থেকে (West Midnapore Patchitra)
পটুয়ারা আজও প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করেন। গাছ, ফুল, পাতা, মাটি সবকিছু থেকেই তৈরি হয় রঙের প্যালেট। হলুদ আসে হালুদের গুঁড়ো থেকে, নীল রং নীল গাছের পাতা থেকে, লাল রং সিঁদুর বা ল্যাটারাইট মাটি থেকে। এই প্রাকৃতিক রঙেই প্রাণ পায় তাঁদের পটচিত্র।
প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা (West Midnapore Patchitra)
প্রথম দিকে এই শিল্প জনপ্রিয় ছিল সাঁওতাল, হোস, মুন্ডা, জুয়াং, খেরিয়া উপজাতিদের মধ্যে। তাঁদের পৌরাণিক কাহিনি ও পূর্বপুরুষদের গল্প ফুটে উঠত পটে। পরে বৌদ্ধধর্মের প্রসারে পটচিত্র ব্যবহৃত হয় ধর্ম প্রচারের মাধ্যম হিসেবে। বৌদ্ধ ভিক্ষু ও রাজারা দূর দেশ পর্যন্ত বালি, জাভা, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, তিব্বত এই শিল্পের প্রসার ঘটান। পরবর্তীকালে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটলে পটুয়াদের মধ্যেও ধর্মীয় মিলন ঘটে। আজও নয়া গ্রামের পটুয়ারা হিন্দু ও মুসলিম উভয় রীতিই পালন করেন, যা গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য উদাহরণ।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শিল্পের সঞ্চার (West Midnapore Patchitra)
নয়া গ্রামের প্রায় আড়াইশো জন শিল্পী প্রতিদিন সকাল থেকে আঁকার কাজে লেগে পড়েন। কেউ পটে আঁকেন, কেউ শাড়ি, শাল, গয়না কিংবা ঘর সাজানোর জিনিসে রং তুলি দেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই গ্রামের প্রতিটি শিশু ছোটো থেকেই তুলি ধরতে শেখে। শিল্প তাদের জীবনের অংশ, ঠিক যেমন নিঃশ্বাস নেওয়া।

বিশ্বের দরবারে নয়া গ্রামের পটচিত্র (West Midnapore Patchitra)
এই গ্রামের নাম আজ বিশ্বের শিল্প মানচিত্রে। বহু শিল্পী বিদেশে প্রদর্শনী করেছেন, পুরস্কার পেয়েছেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মনু চিত্রকর, যিনি আফ্রিকান-আমেরিকান লেখক আর্থার ফ্লাওয়ার্স-এর সঙ্গে মিলে ‘I See the Promised Land’ নামের গ্রাফিক উপন্যাসটি রচনা করেন, যা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের জীবনী অবলম্বনে তৈরি।
‘পট মায়া’ শিল্পের উৎসব (West Midnapore Patchitra)
প্রতি বছর নভেম্বর মাসে নয়া গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় তিন দিনের এক উৎসব ‘পট মায়া’। এই সময় গোটা গ্রাম পরিণত হয় এক রঙিন শিল্পমঞ্চে। থাকে,
- পটচিত্র প্রদর্শনী,
- লোকসঙ্গীত ও নৃত্যানুষ্ঠান,
- রঙ-তুলির কাজ করা শাড়ি, শাল, টি-শার্ট,
- ঘর সাজানোর নানা সামগ্রী (ল্যাম্পশেড, দেওয়ালের সাজ, পর্দা ইত্যাদি)।
দেশ-বিদেশের পর্যটকরা এই উৎসবে ভিড় করেন নয়া গ্রামের শিল্পীদের সৃষ্টিশক্তি দেখার জন্য।
শিল্প সংরক্ষণের কেন্দ্র
গ্রামে রয়েছে ‘চিত্রতরু’ নামে একটি লোকশিল্প সংরক্ষণকেন্দ্র। এখানে সারা বছর পটচিত্র প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যবস্থা আছে। সঙ্গে রয়েছে ওয়ার্কশপ বা কর্মশালা, যেখানে আগ্রহীরা শিখতে পারেন, পটচিত্র আঁকার কৌশল, প্রাকৃতিক রং তৈরির পদ্ধতি।
শিল্পীরা নিজের হাতে শেখান তাঁদের প্রাচীন দক্ষতা।
আরও পড়ুন: Jagaddhatri Puja: এই পুজো কি সত্যিই চন্দননগরেই শুরু হয়েছিল? জানা আছে এর উৎস?

কীভাবে পৌঁছবেন নয়া গ্রামে
কলকাতা থেকে দূরত্ব: প্রায় ৩–৪ ঘণ্টার পথ। যাতায়াত: হাওড়া থেকে খড়গপুর বা বালিচক পর্যন্ত ট্রেন, সেখান থেকে টোটো বা গাড়িতে পিংলা।



