Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলা নাট্য ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উৎপল দত্ত এক অনন্য নাম যাঁর শিল্প কখনও শুধু বিনোদনের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেনি (Utpal Dutt)। তাঁর কলম, মঞ্চ ও অভিনয় বারবার সমাজের অন্ধকার কোণকে আলোর সামনে এনেছে। ‘টিনের তলোয়ার’-এ তিনি যেমন নিম্নবর্গের মানুষের জীবন ও বঞ্চনাকে মঞ্চে তুলে ধরেছেন, তেমনই ‘আগন্তুক’-এ তাঁর অভিনয় আধুনিক সভ্যতার অহংকারকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। নাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতা তিন ভূমিকাতেই উৎপল দত্ত প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের শিল্প মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত।
উৎপল দত্ত ছিলেন এমন এক শিল্পী, যাঁর কাছে নাটক ও অভিনয় শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; ছিল সমাজকে প্রশ্ন করার শক্তিশালী হাতিয়ার। তাঁর সৃষ্টিতে বারবার উঠে এসেছে প্রান্তিক মানুষের জীবন, শ্রেণিবৈষম্য এবং সংস্কৃতির নামে তৈরি কৃত্রিম বিভাজন।
‘টিনের তলোয়ার’-এ শ্রেণিসংঘাত (Utpal Dutt)
‘টিনের তলোয়ার’-এ উনিশ শতকের কলকাতার বাবুসমাজ ও নিম্নবর্গের মানুষের জীবনযাত্রার তীব্র বৈপরীত্য ফুটে ওঠে। মেথরের মতো চরিত্রের মাধ্যমে উৎপল দত্ত দেখিয়েছেন, যে মানুষ সমাজের সবচেয়ে নিচে অবস্থান করে, তার কাছেও শিল্পের অর্থ আলাদা। “থিয়েটার দেখেন?”—প্রশ্নের উত্তরে “বুঝি না” আসলে তাঁর অজ্ঞতার স্বীকারোক্তি নয়; বরং এমন শিল্পের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ, যেখানে তাঁর জীবনের কোনো প্রতিফলন নেই।

বাবুসমাজের সংস্কৃতির প্রতি তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ (Utpal Dutt)
বেণীমাধবের ‘ময়ূরবাহন’-এর মতো নাটক রাজকীয় প্রেম ও রোমান্টিক কল্পনার জগৎ নির্মাণ করে। কিন্তু গঙ্গার ধারে বসবাসকারী মেথরের কাছে সেই নাটকের প্রাসঙ্গিকতা কোথায়? এই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই উৎপল দত্ত তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাকে বিদ্ধ করেছেন।
হারিয়ে যাওয়া লোকসংস্কৃতির আর্তনাদ
উনিশ শতকে ইউরোপীয় নাট্যরীতির প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খ্যামটা, কবিগান, ঝুমুর, পাঁচালী, আখড়াইয়ের মতো দেশীয় ধারাগুলি ধীরে ধীরে প্রান্তে চলে যায়। উৎপল দত্তের নাটকে সেই হারিয়ে যাওয়া লোকসংস্কৃতির প্রতিও গভীর দায়বদ্ধতা দেখা যায়।
নাটক কার জন্য? (Utpal Dutt)
উৎপল দত্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির একটি—নাটক যদি সাধারণ মানুষের কথা না বলে, তবে সেই নাটক কাদের? তাঁর কাছে শিল্পের সার্থকতা শুধু নান্দনিকতায় নয়; মানুষের জীবন, বেদনা ও সংগ্রামের সঙ্গে তার সম্পর্কেও।
অভিনেতা উৎপল দত্তের অনন্যতা (Utpal Dutt)
নাট্যকার ও পরিচালক হিসেবে যেমন তিনি শক্তিশালী, অভিনেতা হিসেবেও ছিলেন অসাধারণ। তাঁর সংলাপ বলার ভঙ্গি, কণ্ঠস্বর, শরীরী ভাষা এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশের ক্ষমতা তাঁকে বাংলা অভিনয়জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পীতে পরিণত করেছে।
‘আগন্তুক’-এ সভ্যতার মুখোশ খুলে দেওয়া (Utpal Dutt)
১৯৯১ সালে সত্যজিৎ রায়ের শেষ ছবি ‘আগন্তুক’-এ মনোমোহন মিত্র চরিত্রে উৎপল দত্তের অভিনয় তাঁর শিল্পীসত্তার আরেক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। চরিত্রটির সংলাপের মধ্য দিয়ে সভ্যতার অহংকার, মানুষের ভণ্ডামি এবং তথাকথিত আধুনিকতার সীমাবদ্ধতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। উৎপল দত্ত সেই প্রশ্নগুলিকে অভিনয়ের শক্তিতে আরও গভীর করে তুলেছিলেন।
আরও পড়ুন: Teacher Protest: সেনসাসের চাপে শিক্ষকতা! হাইকোর্টের বিকল্প পরামর্শ?
মঞ্চ ও পর্দায় এক চিরকালীন শিল্পী
উৎপল দত্তের সৃষ্টির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতা। ‘টিনের তলোয়ার’ থেকে ‘আগন্তুক’—বারবার তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, শিল্পীর কাজ শুধু দর্শককে আনন্দ দেওয়া নয়, প্রয়োজনে অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানোও। তাঁর লেখা যেমন তীক্ষ্ণ, পরিচালনা যেমন নির্মোহ, অভিনয়ও তেমনই স্মরণীয়।



