Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: গন্ধ ভালো লাগে? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা হয়তো বলব, কোনও ফুলের গন্ধ, প্রিয় পারফিউমের সুবাস, প্রথম ফুটে ওঠা শিউলির মাদকতা কিংবা বৃষ্টিভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ (Perfume)। কারও কাছে প্রিয়জনের গায়ের গন্ধও হয়ে উঠতে পারে একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতি। কিন্তু কখনও কি ভেবেছেন, একটি গন্ধকে চিরদিনের জন্য ধরে রাখা সম্ভব?
গন্ধকে চোখে দেখা যায় না, হাতে ছোঁয়া যায় না। অথচ একটি গন্ধ মুহূর্তের মধ্যে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে বহু পুরনো কোনও স্মৃতিতে। এই অদৃশ্য অথচ প্রবল অনুভূতিকেই যখন একজন মানুষের জীবনের একমাত্র obsession বা আবেশে পরিণত করা হয়, তখন সেই আবেশ কোথায় গিয়ে পৌঁছতে পারে? উত্তরটি ভয়ংকর। আর সেই ভয়ংকর উত্তরই খুঁজে পাওয়া যায় টম টাইকিয়ারের পরিচালিত ‘Perfume: The Story of a Murderer’ ছবিতে (Perfume)। প্যাট্রিক জাসকিন্ডের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্র শুধু একটি খুনের গল্প নয়। এটি ঘ্রাণ, সৌন্দর্য, আকাঙ্ক্ষা, একাকিত্ব, ক্ষমতা এবং মানুষের অন্ধকার মনস্তত্ত্বের এক অসাধারণ অনুসন্ধান।
১৮ শতকের ফ্রান্স এবং এক অদ্ভুত শিশুর জন্ম (Perfume)
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র জঁ-ব্যাপতিস্ত গ্রুনুই। ১৮ শতকের ফ্রান্সে এক অস্বাস্থ্যকর ও দুর্গন্ধময় পরিবেশে তার জন্ম। জন্মের পর থেকেই তার জীবন স্বাভাবিক ছিল না। তার মা তাকে পরিত্যাগ করেন এবং শেষ পর্যন্ত শিশুটির জীবন শুরু হয় অনাথাশ্রমের কঠোর বাস্তবতায়। শৈশব থেকেই গ্রুনুই অন্যদের থেকে আলাদা। তার মধ্যে এমন একটি ক্ষমতা ছিল, যা সাধারণ মানুষের নেই সে অসংখ্য গন্ধকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে আলাদা করতে পারত। যে জিনিস অন্য মানুষের কাছে নিছক একটি বস্তু, গ্রুনুইয়ের কাছে সেটি ছিল অসংখ্য গন্ধের সমষ্টি। কাঠ, ধাতু, চামড়া, ফল, ফুল, মাটি, ঘাম—প্রতিটি জিনিসের নিজস্ব গন্ধ তার কাছে আলাদা পরিচয় বহন করত। কিন্তু এই অসাধারণ ক্ষমতার সঙ্গে তার জীবনে ছিল না ভালোবাসা, সামাজিক স্বীকৃতি কিংবা মানবিক উষ্ণতা।
গন্ধই হয়ে উঠল তার পৃথিবী (Perfume)
গ্রুনুইয়ের জীবনে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল গন্ধ। একসময় সে একটি সুগন্ধির দোকানে কাজ করার সুযোগ পায়। এখানেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। সুগন্ধি তৈরির কৌশল তাকে মুগ্ধ করে। কিন্তু অন্যদের মতো কেবল ভালো পারফিউম তৈরি করাই তার লক্ষ্য ছিল না। তার আকাঙ্ক্ষা ছিল আরও বড় সে এমন একটি সুগন্ধি তৈরি করতে চায়, যা পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত, সবচেয়ে মোহময় এবং অতুলনীয়। সমস্যা হল, সে যে গন্ধ খুঁজছে তা কোনও ফুলের মধ্যে নেই। তার অনুসন্ধান তাকে ধীরে ধীরে মানুষের শরীরের স্বাভাবিক গন্ধের দিকে নিয়ে যায়।
সৌন্দর্যের গন্ধের সন্ধান (Perfume)
গ্রুনুই আবিষ্কার করে, কিছু মানুষের শরীর থেকে এমন এক বিশেষ গন্ধ আসে যা তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে তরুণীদের শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ তার কাছে হয়ে ওঠে এক অমূল্য সম্পদ। এখানেই তার প্রতিভা ধীরে ধীরে বিকৃত আবেশে পরিণত হয়। সে আর শুধু সুগন্ধি তৈরি করতে চায় না। সে চায় সেই মানবিক সুবাসকে বন্দি করতে। এমনভাবে সংরক্ষণ করতে চায়, যাতে মানুষের শরীরের গন্ধ তার নিয়ন্ত্রণে থাকে।
কিন্তু গন্ধকে ধরে রাখা যায় কীভাবে? (Perfume)
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই গ্রুনুইয়ের নৈতিক পতন শুরু হয়। প্রথম হত্যা, তারপর একের পর এক মৃত্যু এক তরুণীর গন্ধ তাকে এতটাই আকৃষ্ট করে যে সেই গন্ধকে সংরক্ষণ করার নেশা তার মধ্যে ভয়ংকর সিদ্ধান্তের জন্ম দেয়। প্রথম হত্যার পরও তার থামার কোনও কারণ নেই। বরং প্রতিটি নতুন অভিজ্ঞতা তাকে আরও নিখুঁত সুগন্ধির সন্ধানের দিকে ঠেলে দেয়। এরপর শহরে শুরু হয় একের পর এক তরুণীর রহস্যজনক হত্যা। মৃতদেহগুলির মধ্যে একটি অদ্ভুত মিল দেখা যায়। তারা সবাই তরুণী এবং তাদের মৃত্যুর পেছনে যেন কোনও অজ্ঞাত উদ্দেশ্য রয়েছে। শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যেসব পরিবারে তরুণী মেয়ে রয়েছে, তাদের রাতের ঘুম উধাও হয়ে যায়। সবাই বুঝতে পারে, একজন ভয়ংকর হত্যাকারী ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সে কে—তার কোনও উত্তর নেই।
আরও পড়ুন: Suvendu Adhikari: অগ্নিকাণ্ডের পর বড় প্রশ্ন, মুখ্যমন্ত্রীর বার্তায় চাঞ্চল্য
হত্যাকারীকে খুঁজছে শহর
গ্রুনুইয়ের অপরাধের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হল, তার উদ্দেশ্য প্রচলিত কোনও অপরাধীর মতো নয়। সে অর্থের জন্য হত্যা করছে না। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যও নয়। ক্ষমতা দখল কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণেও নয়। তার উদ্দেশ্য আরও অদ্ভুত সে গন্ধ সংগ্রহ করছে। প্রতিটি হত্যার পেছনে তার কাছে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য। সে যেন মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে অদৃশ্য অংশটিকে নিজের হাতে বন্দি করতে চাইছে। এই অস্বাভাবিক উদ্দেশ্যই ছবির রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে।



