Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR ঘিরে নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক আরও তীব্র হল (Election Commission)। বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করে কক্রোচ জনতা পার্টি (CJP) মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের জন্য ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না হলে দেশজুড়ে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দলটি। পরবর্তী পর্যায়ে দিল্লিতে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচির কথাও জানিয়েছে তারা।
SIR ঘিরে ফের প্রকাশ্যে রাজনৈতিক চাপ (Election Commission)
CJP-র এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এল, যখন দেশজুড়ে SIR-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক চলছে। দলটির অভিযোগ, খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে এবং এই বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। CJP-র বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে কোনও নাগরিকের নাম বাদ দেওয়ার আগে তাঁকে যথাযথভাবে যাচাই এবং কার্যকর আপিলের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
তবে খসড়া তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার সংখ্যা এবং সেই নামগুলির মধ্যে কতগুলি ভুলভাবে বাদ পড়েছে—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, SIR-এর মাধ্যমে মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত বা ডুপ্লিকেট ভোটার-সহ বিভিন্ন ধরনের রেকর্ড যাচাই করা হচ্ছে।
১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়ার দাবি (Election Commission)
CJP দাবি করেছে, SIR-এর আওতায় ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। দলটির দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মহারাষ্ট্র ও উত্তরপ্রদেশে ২ কোটির বেশি করে, কর্ণাটকে প্রায় ১ কোটি, তামিলনাড়ুতে ৯৭ লক্ষ, পশ্চিমবঙ্গে ৯০ লক্ষ, তেলেঙ্গানায় ৭৩ লক্ষ, দিল্লিতে ৪৭ লক্ষ এবং কেরলে ২৪ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এই সংখ্যাগুলিকে CJP-র দাবি হিসেবে দেখা হচ্ছে; এগুলি যে সমস্ত ক্ষেত্রেই যোগ্য ভোটারের নাম ভুলভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত এই পরিসংখ্যান থেকে সরাসরি টানা যায় না। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে, SIR-এ ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে এবং তাঁদের মধ্যে ২২ লক্ষের বেশি পুনর্বহালের আবেদন করেছেন।
কেন ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম?
CJP-র মূল দাবি, SIR চলাকালীন ভোটার বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া অবিলম্বে পর্যালোচনা করতে হবে। সেই সঙ্গে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং গোটা প্রক্রিয়া নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবিও তুলেছে দলটি।
আরও পড়ুন: Kolkata Police: উৎসবের মরশুমে জোর করে চাঁদা! কলকাতা পুলিশের বিশেষ হেল্পলাইনেই জানান অভিযোগ
CJP-র প্রতিষ্ঠাতা তথা জাতীয় আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকের বক্তব্য, ভোটার তালিকায় কার নাম থাকবে এবং কার নাম থাকবে না—এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে আইনি ভিত্তি, স্বচ্ছতা এবং পুনর্বিবেচনার সুযোগ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। দলটির অভিযোগ, বর্তমান ব্যবস্থায় সাধারণ ভোটারের কাছে সিদ্ধান্তের কারণ ও প্রতিকারের পথ সবসময় পরিষ্কার নয়।
নির্বাচন কমিশনের অন্দরমহলের মতপার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন
CJP-র অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে The Indian Express-এর সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন।
এই আপত্তিগুলির মধ্যে ভোটার তালিকায় নতুন নাম অন্তর্ভুক্তি, নাম বাদ দেওয়া, পুনর্বহাল, Form 6-এ পরিবর্তন এবং ভোটার তথ্যভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ ও কেন্দ্রীকরণের মতো বিষয় ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের তরফে এই ধরনের মতপার্থক্যকে অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলি শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মত ছিল বলে জানানো হয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে একদিকে রয়েছে CJP-র অভিযোগ, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের পাল্টা ব্যাখ্যা।
Form 6 নিয়ে নতুন বিতর্ক
প্রথমবার ভোটার হতে চলা নাগরিকদের জন্য ব্যবহৃত Form 6-এ SIR-সংক্রান্ত একটি অতিরিক্ত ঘোষণা যুক্ত করার বিষয়টিও বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে। Indian Express-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন আবেদনকারীদের নিজেদের, বাবা-মা অথবা দাদু-দিদার আগের SIR-এর ভোটার তালিকায় নাম ছিল কি না, সে বিষয়ে তথ্য দিতে বলা হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অংশটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক হিসেবে চিহ্নিত না থাকলেও উত্তর না দিলে অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছিল। দুই নির্বাচন কমিশনার এই পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। CJP-র বক্তব্য, প্রথমবারের ভোটারদের জন্য কোনও অতিরিক্ত প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত বাধা তৈরি হলে তা দ্রুত পরিষ্কার করা দরকার।
ভোটার ডেটাবেস কেন্দ্রীকরণ নিয়েও প্রশ্ন
SIR-কে ঘিরে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীকরণ। CJP অভিযোগ করেছে, ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রাজ্য ও স্থানীয় স্তরের আধিকারিকদের ক্ষমতা এবং কেন্দ্রীয় সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। The Indian Express-এর প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে ভোটার ডেটাবেস এবং ECI-Net ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহ ও প্রবেশাধিকার নিয়ে আপত্তির কথাও উঠে এসেছে। CJP-র দাবি, কোনও ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কোন আইনি ক্ষমতাবলে নিয়েছেন এবং সেই সিদ্ধান্তের লিখিত রেকর্ড কোথায় এই তথ্যগুলি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
পশ্চিমবঙ্গেও SIR-পরবর্তী আপিলের চাপ
SIR নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে, রাজ্যে ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ২২.২১ লক্ষ ভোটার নাম পুনর্বহালের আবেদন করেছেন বলে কমিশনের দেওয়া তথ্য থেকে জানা গিয়েছে। মোট ৩৮.৩১ লক্ষ আপিল জমা পড়েছে—যার মধ্যে কিছু নাম অন্তর্ভুক্তির এবং কিছু নাম বাদ দেওয়ার আবেদন। অর্থাৎ, ভোটার তালিকার সংশোধন শুধু রাজনৈতিক বিতর্কেই সীমাবদ্ধ নেই; বাদ পড়া নাম পুনর্বহাল করার জন্য প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়াতেও উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে।
CJP-র তিন দফা মূল দাবি
CJP তাদের সাংবাদিক বৈঠকে মূলত তিনটি বড় দাবি সামনে এনেছে। প্রথমত, CEC জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং SIR-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের স্বাধীন তদন্ত। দ্বিতীয়ত, SIR-এর মাধ্যমে আরও নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত রেখে যাচাই সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত জানুয়ারি ২০২৫-এর ভোটার তালিকা পুনর্বহালের দাবি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি ও ফাইল স্বাধীন বা বিচারবিভাগীয় তদন্তের আওতায় আনার দাবিও রয়েছে। তৃতীয়ত, ২০২৩ সালের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন বাতিল করে আরও বিস্তৃত অংশগ্রহণমূলক নিয়োগ কাঠামো তৈরির দাবি জানিয়েছে দলটি।
আপত্তির নথি প্রকাশের দাবি
CJP আরও দাবি করেছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী যে আপত্তিগুলি নথিভুক্ত করেছিলেন, সেগুলি প্রকাশ্যে আনা হোক। সেই আপত্তির জবাবে কমিশনের তরফে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তাও প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছে দলটি। এখানেই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসছে—নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য কতটা প্রকাশ্যে আসা উচিত এবং একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতার সীমা কোথায় থাকবে। এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে এখন রাজনৈতিক ও আইনি মহলে আলোচনা চলছে।
৪৮ ঘণ্টা পর কোন পথে CJP?
CJP-র সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কার ঘোষণা, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু করা হবে। পরবর্তী পর্যায়ে দিল্লিতে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। দলের ভাষায়, এই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় বিষয় হবে ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ভুলভাবে বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের পুনর্বহালের ব্যবস্থা।
ফলে SIR নিয়ে বিতর্ক এখন শুধু ভোটার তালিকার সংখ্যার প্রশ্নে আটকে নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, প্রযুক্তিনির্ভর ভোটার ডেটাবেস, নতুন ভোটারদের আবেদন প্রক্রিয়া এবং বাদ পড়া নামের পুনর্বিবেচনার মতো একাধিক বিষয়। CJP-র ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটামের পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, দেশজুড়ে আন্দোলনের ঘোষণা বাস্তবে কতটা বিস্তৃত হয় এবং নির্বাচন কমিশন এই দাবিগুলির জবাবে কী অবস্থান নেয়—সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের।



