Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলার ধর্মচেতনা, ভক্তি ও সাহিত্যের কেন্দ্রে যে দেবী যুগযুগ ধরে বিরাজ করছেন (Kali Puja 2025), তিনি মা কালী বা শ্যামা মা। দুর্গাপূজার মহোৎসবের পর অমাবস্যার রাত্রিতে বাংলার আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে শ্যামা মায়ের নামস্মরণ দীপের আলোয়, মন্ত্রের ধ্বনিতে, আর ভক্তদের অন্তরের গভীরে।

সময় ও আচার (Kali Puja 2025)
যদিও বছরের নানা সময়ে কালীপূজা হয় বিশেষত ফাল্গুন, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আশ্বিন মাসে তবু দুর্গাপূজোর পরের অমাবস্যার রাত, অর্থাৎ কার্তিক অমাবস্যা, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টিকেই ধরা হয় শ্যামা মায়ের প্রধান উৎসবকাল। পুরাণে বলা হয়েছে,“অমাবস্যায় কালীপূজাঃ তস্যাঃ প্রসাদে সিদ্ধিঃ সর্বকামদা।” অর্থাৎ, অমাবস্যা তিথিতে কালীপূজা করলে সর্বকামনা সিদ্ধ হয়।
পাড়া-কেন্দ্রিক ভক্তি ও সমাজসংস্কৃতি (Kali Puja 2025)
দুর্গাপূজার বিপুল আয়োজন একসময় রাজবাড়ি বা বড় এলাকা কেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু কালীপূজা ছিল পাড়াভিত্তিক, ঘরোয়া, অথচ হৃদয়স্পর্শী। পাড়ায় পাড়ায় প্রতিযোগিতা হতো কে বেশি সুন্দর আলোকসজ্জা করবে, কার মণ্ডপে কীর্তন বেশি শ্রুতিমধুর হবে। এই পাড়া-কেন্দ্রিক ভক্তিই বাংলার সমাজে সামাজিক ঐক্য, আনন্দ ও ভক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে।

ভক্তির সুরে মাতোয়ারা বাঙালি (Kali Puja 2025)
বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের ইতিহাসে শ্যামা সংগীত এক অনন্য অধ্যায়। রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য, বামাক্ষ্যাপা, রামকৃষ্ণদেব, এঁদের গান ও সাধনাভাবই শ্যামা মায়ের পূজাকে দিয়েছে আত্মার গভীরতার সুর। রামপ্রসাদ সেন গেয়েছেন, “আমার মা কালী, অমায়িক মায়া তুমি, জাগাও আমার অন্তর…” কমলাকান্তের গানে রয়েছে আধ্যাত্মিক প্রতিবাদ,
“মা, তুই দিগম্বরী, আমি নগ্ন শিশুর মতো…”
তান্ত্রিক দর্শন ও মহাশক্তি রূপে কালী (Kali Puja 2025)
শাস্ত্রমতে, দেবী কালী হলেন মহামায়া, আদ্যাশক্তি এবং ত্রিনয়না চণ্ডরূপা। ‘দেবী মহাত্ম্য’ ও ‘তন্ত্রচূড়ামণি’ অনুসারে কালী উদ্ভব হয় রক্তবীজ সংহারে, “রক্তবীজং হতা কালী, তস্যা রূপং মহোন্নতং।” দেবী নগ্ন, কারণ তাঁর শক্তি বস্ত্র দ্বারা আবদ্ধ নয়। তিনি সময় (কাল)-এর প্রতীক সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের নিয়ন্ত্রিণী। তাঁর গলায় অসুরমুণ্ডের মালা, হাতে খড়্গ ও কপালপাত্র, আর পদতলে শায়িত শিব, যা শক্তি ও চৈতন্যের মিলনরূপ।
দেবী কালী ও বাংলার সাধকসমাজ (Kali Puja 2025)
- বাঙালির ধর্মচেতনার ভিতর দিয়ে মা কালী প্রবাহিত হয়েছেন তন্ত্র, ভক্তি ও মুক্তির পথের প্রতীকে।
- রামপ্রসাদ সেন শ্যামাকে দেখেছেন মাতৃরূপে।
- বামাক্ষ্যাপা দেখেছেন প্রেমিকরূপে।
- রামকৃষ্ণ পরমহংস দেখেছেন চিরজীবন্ত শক্তির রূপে, যাঁর কাছে তিনি কৃষ্ণকালী বা সর্বেশ্বরা।
- রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন,“যে কালীকে ভয় পায়, সে তাঁকে চেনে না। কালী প্রেমময়ী, তিনি মা।”
কলকাতার বিখ্যাত কালীমন্দির (Kali Puja 2025)
- কলকাতায় কালীপূজা এক অমূল্য ঐতিহ্য।
- কালীঘাট কালীমন্দির, সতীপীঠ, যেখানে দেবীর চারটি আঙুল পড়েছিল। কালীপুজোর দিন এখানে লক্ষ্মীরূপে দেবীর পূজা হয়।
- দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণী মন্দির, রানি রাসমণির প্রতিষ্ঠিত, রামকৃষ্ণদেবের লীলাক্ষেত্র।
- বউবাজারের কালী, কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির প্রতিষ্ঠিত।
- ঠনঠনিয়া কালী, তান্ত্রিক উদয়নাথের প্রতিষ্ঠা।
- কাশীপুরের কৃপাময়ী কালী, রঘু ডাকাতের ভক্তির নিদর্শন।
- চিত্তেশ্বরী কালী, চিত্তেশ্বর রায় প্রতিষ্ঠিত চিৎপুরে অবস্থিত।
- করুণাময়ী কালী মন্দির, নাগরিক ও ঐতিহ্যিক গুরুত্ব বহনকারী প্রাচীন মন্দির।
আরও পড়ুন: Rashmika-Vijay Deverakonda: রশ্মিকার হাতে জ্বলজ্বলে হিরের আংটি, বাগদানে সিলমোহর?
“জয় কালী কলকাত্তাওয়ালি”
কলকাতায় কালীপুজো কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সংস্কৃতি, সংগীত, শিল্প, ঐতিহ্য ও সমাজবোধের এক সংমিশ্রণ। রসিক কলকাতাবাসী তাই বলে,“জয় কালী কলকাত্তাওয়ালি, জোরসে বোলো আর বাজাও তালি।” এই আহ্বান কেবল উচ্চারণ নয়, এটি শক্তির, মাতৃস্নেহের ও সাহসের সুর।



