Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ‘আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল, সকলই ফুরায়ে যায় মা…’ এমন আকুল করে দেওয়া মা’ডাক, সে শুধু পান্নালাল ভট্টাচার্যের গলায়ই সম্ভব ছিল (Pannalal Bhattacharya)। তাঁর গানে ছিল মাতৃভক্তির এমন এক গভীরতা, যা কালীপুজোর রাতের আকাশে আজও প্রতিধ্বনিত হয়। বছরের পর বছর ধরে বাঙালির কালীপুজো যেন অপূর্ণ পান্নালালের কণ্ঠ ছাড়া। ‘আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠ না ফুটে মন’ বাজলেই, পুজোর আবহে যেন ভেসে ওঠে অদৃশ্য ভক্তির স্রোত আকাশে-বাতাসে কেঁদে ওঠে মায়ের নাম।
বালির আঙিনায় শুরুর দিন (Pannalal Bhattacharya)
পান্নালালের জন্ম ১৯৩০ সালে, এক সঙ্গীতময় পরিবারে। জন্মের আগেই পিতৃবিয়োগ ঘটে বাবা সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য মারা যান, তখন মা অন্নপূর্ণা দেবী ছিলেন সন্তানসম্ভবা। পিতার মৃত্যুর পর পরিবারটি চলে আসে বালিতে, হুগলির তীরে এক শান্ত অথচ সংস্কৃতিময় পল্লিতে। বালির রিভার টমসন স্কুল থেকে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু। কিন্তু গানের সাধনা শুরু হয়েছিল অনেক আগেই মামারবাড়িতে, বড়দা প্রফুল্ল ভট্টাচার্য ও বিখ্যাত শিল্পী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য–এর কাছে। পরবর্তীতে সনৎ সিংহের কাছেও তিনি গানের তালিম নেন।
গানের পথে প্রথম পদক্ষেপ (Pannalal Bhattacharya)
মাত্র ১৫ বছর বয়সে (১৯৪৫) পান্নালাল আকাশবাণীতে গান গাওয়ার সুযোগ পান। শ্রোতারা তাঁর মধুর কণ্ঠে মুগ্ধ হয়ে যান। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম আধুনিক গানের রেকর্ড,
- ‘কিশোরবেলায় খেলার ছলে’
- ‘সে দিনের সেই গানখানি’।
তবে তাঁর হৃদয় টেনেছিল শ্যামাসঙ্গীত। ১৯৫১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর মা’কে উদ্দেশ্য করে গাওয়া রেকর্ড,
- ‘আমায় দে মা পাগল করে’
- ‘সকলই তোমারই ইচ্ছা’।
এই গানগুলিই তাঁকে পৌঁছে দেয় ভক্তির এক অনন্য উচ্চতায়।
শ্যামাসঙ্গীতের অমর জ্যোতি (Pannalal Bhattacharya)
পান্নালাল শুধু রামপ্রসাদী গানই নয়, গেয়েছেন নজরুলগীতি ও রজনীকান্তের গানও।
তাঁর কণ্ঠে,
- ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায়’
- ‘লুকাবি কোথায় মা কালী’
- ‘তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে’
- ‘যবে তৃষিত এ মরুছায়া’
সবাইকে ভক্তির অনির্বচনীয় আবেগে ভাসিয়েছে।
তাঁর গান ছিল কেবল গাওয়া নয় ধ্যান, প্রার্থনা ও নিবেদন। মায়ের প্রতি সেই অদ্ভুত আত্মসমর্পণই তাঁকে করে তুলেছিল শ্যামাসঙ্গীতের অমর পুরোহিত।
বালিতে আজও তাঁর স্মৃতি (Pannalal Bhattacharya)
বালির চক্রবর্তীঘাট রোডে আজও আছে সেই বাড়ি যেখানে বড় হয়েছেন পান্নালাল। সেই বাড়িতেই আজ তাঁর ভাইয়ের ছেলেরা বাস করেন। দেওয়ালে ঝোলানো আছে শিল্পীর কয়েকটি পুরোনো ফ্রেমে বাঁধানো ছবি সময়ের ধুলোয় মলিন, কিন্তু ভক্তির আলোয় দীপ্ত। বালির বারেন্দ্রপাড়ায় তাঁর ও ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের আবক্ষ মূর্তি আজও তাঁদের স্মৃতি জাগিয়ে রাখে। বালির বহু বয়স্ক মানুষ আজও বলেন “যখন পান্নালাল গান ধরতেন, মনে হত মা যেন পাশে আছেন।”
আরও পড়ুন: Fatakesto Kali Puja 2025: গুণ্ডার দাপট না ভক্তের নিবেদন?
অকালে অবসান, অমর স্মৃতি
মাত্র ৩৬ বছর বয়সে, ২৭ মার্চ ১৯৬৬ পান্নালাল ভট্টাচার্য চিরবিদায় নেন। তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা রহস্য, নানা জল্পনা কেউ বলেন অবসাদ, কেউ বলেন গভীর ভক্তির টান। যে মানুষ মা’কে ডাকতে ডাকতে চোখ ভিজিয়ে দিয়েছিলেন অসংখ্য ভক্তের, তিনি যেন একদিন সত্যিই মায়ের ডাকে সাড়া দিলেন। স্ত্রী ও তিন কন্যা সহ সংসার, গৃহ, পরিবার সব ফেলে তিনি পাড়ি দিলেন সেই মায়ের কাছে, যার প্রতি তাঁর গান ছিল অর্ঘ্য।



