Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: পূর্ব বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলীর নতুনগ্রাম আজ পরিচিত “কাঠপুতুলের গ্রাম” নামে (Natungram)। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানকার মানুষ কাঠের পুতুল তৈরি করে নিজেদের ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন। একসময় যা ছিল নেশা ও পেশার মিশ্রণ, আজ সেই কাষ্ঠশিল্প গ্রামকে রাজ্যের সীমানা ছাপিয়ে জাতীয় স্তরে পৌঁছে দিয়েছে।
শিল্পে-শিল্পীর ব্যস্ততার গ্রামজীবন (Natungram)
গ্রামের সরু রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটলেই চোখে পড়ে ঘরে ঘরে পুতুল তৈরির দৃশ্য। কোথাও রাজা–রানির কাঠের মূর্তি আঁকা হচ্ছে, কোথাও পেঁচা, গৌর-নিতাই, রাধাকৃষ্ণ, কিংবা নিত্যনতুন কাঠের আসবাব। প্রায় প্রতিটি পরিবারের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে কাঠের এই শিল্প। সারাবছর চলে কাঠ কাটা, ঘষামাজা, খোদাই, রঙ করার কাজ যেন পুরো গ্রামটাই এক বিশাল কর্মশালা।

শীত এলে শিল্পে বাড়তি গতি (Natungram)
শীতকাল এলেই ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কারণ শীত মানেই সারা রাজ্যে বিভিন্ন মেলা পৌষমেলা, গ্রাম্য মেলা, হস্তশিল্প মেলা কিংবা সরকারি অনুষ্ঠান সব জায়গাতেই নতুনগ্রামের কাঠশিল্পীদের বিশেষ চাহিদা। তাই শীতকাল থেকে বছরের শুরু এ সময় গ্রামের অনেক পুরুষ বাড়িতে থাকেনই না; এক মেলা থেকে অন্য মেলায় ঘুরে বেড়ান নিজের তৈরি শিল্পসামগ্রী নিয়ে।
নতুনগ্রামের পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু (Natungram)
প্রায় চার প্রজন্ম ধরে নতুনগ্রামের অধিবাসীরা কাঠের পুতুল তৈরি করছেন। আগে অনেকেই পাথর খোদাইয়ের কাজ করতেন, কিন্তু সময়ের প্রবাহে কাঠশিল্পই তাঁদের প্রধান জীবিকা হয়ে ওঠে। একটি কাঠপুতুল তৈরি হয় কয়েক ধাপে, প্রথমে কাঠ কেটে রোদে শুকানো, এরপর চেরাই করে প্রয়োজনীয় অংশ আলাদা করা, বাটালি–হাতুড়ির আঘাতে আকার দেওয়া, শেষে রংতুলি দিয়ে প্রাণ সঞ্চার, পুরুষেরা যেখানে করেন খোদাই ও কাঠের গড়ন, সেখানে মহিলা ও শিশুদের ভূমিকা রঙতুলির কাজে পরিবারভিত্তিক এই দলগত পরিশ্রমেই জন্ম নেয় একেকটি অনন্য শিল্পকর্ম।

সৃষ্টি বহুরূপী (Natungram)
নতুনগ্রামের কাঠপুতুলের তালিকা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তৈরি হয়—
- রাধাকৃষ্ণ
- গৌর-নিতাই
- জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা
- শিব-দুর্গা
- বর–কনে
- গোলাকার চোখের বিখ্যাত কাঠের পেঁচা
- রাজা–রানী
- আর নানাবিধ শৌখিন আসবাব
প্রতিটি পুতুলের নকশা ও রঙে থাকে গ্রামবাংলার গভীর ছাপ।
বাজার, চাহিদা ও সংকট (Natungram)
সারা বছর তৈরি পুতুল বিভিন্ন মেলায় বিক্রি হয় অগ্রদ্বীপ, কাটোয়া, মালদা, তারকেশ্বরসহ নানা জায়গায়। কলকাতার বড় বড় দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল থেকেও আসে বরাত। তবে করোনা পরিস্থিতিতে এই শিল্প মারাত্মক ধাক্কা খায়। একের পর এক মেলা বন্ধ হয়ে যায়, কলকাতার পুজোর বরাতও কমে যায়। ঘরে জমে ওঠা বিক্রিহীন পুতুল নিয়ে শিল্পীরা পড়েছিলেন আর্থিক চাপে। তবুও হাল ছাড়েননি তাঁরা। প্লাস্টিকের সস্তা পণ্যের সঙ্গে লড়াই করেও কাঠশিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন অক্লান্ত পরিশ্রমে।

নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত (Natungram)
বর্তমানে প্রায় ৬০টি পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় কাঠপুতুলের বিশেষ মেলা, যেখানে শুধু প্রদর্শনীই নয়, কেনাবেচারও বিস্তৃত সুযোগ থাকে। পাশাপাশি লোকসংস্কৃতির নানা পরিবেশনা মেলাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে নতুনগ্রামের কাঠপুতুল শিল্পকে জিআই ট্যাগ দেওয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে এটি শিল্পীদের জন্য বড় স্বীকৃতি হয়ে উঠতে পারে।
গ্রামীণ উন্নয়ন (Natungram)
পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে নতুনগ্রামে তৈরি হয়েছে সরকারি গেস্ট হাউস; রয়েছে থাকার ব্যবস্থা। অগ্রদ্বীপ স্টেশন থেকে টোটো বা রিকশায় সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় গ্রামে। অনুপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘেরা এই পুতুল গ্রাম যেন এক জীবন্ত শিল্পমঞ্চ যেখানে প্রতিটি বাড়ি একেকটি ক্ষুদ্র শিল্পশালা।

আরও পড়ুন: Purba Bardhaman: কাঁদামাটির জাদুকরী রূপান্তর, ৭০ বছরে নতুন দৃষ্টান্ত
শিল্পের আলোয় বেঁচে থাকা এক জনপদ
যখন বাংলার বহু প্রাচীন শিল্প ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে, তখন নতুনগ্রামের অধিবাসীরা পরম নিষ্ঠায় ধরে রেখেছেন কাঠপুতুলের ঐতিহ্য। তাঁদের শিল্পসাধনা শুধু জীবিকা নয় এক জীবন্ত ইতিহাস, এক সাংস্কৃতিক পরিচয়, এক শিল্পীসমাজের সম্মিলিত সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প।



