Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: কোনও কোনও জায়গাকে বর্ণনা করতে গেলে প্রথমেই চোখে ভাসে তার রং (Valley of Flowers)। খিরাই তেমনই এক ব্যতিক্রমী গন্তব্য, যেখানে প্রকৃতির ভাষা যেন রং দিয়েই লেখা। কলকাতা থেকে মাত্র দু’ঘন্টার গাড়ি চালানোর দূরত্বে অবস্থিত এই ছোট্ট গ্রামটি কমলা, গোলাপি, হলুদ ও বেগুনির অসংখ্য ছোঁয়ায় রূপ নিয়েছে এক জীবন্ত ক্যানভাসে। পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব ‘ফুলের উপত্যকা’ বললে খিরাইকে একেবারেই বাড়িয়ে বলা হয় না।

ফুলে ফুলে ভরা এক গ্রাম (Valley of Flowers)
খিরাই মূলত একটি ফুলচাষি অধ্যুষিত এলাকা। এখানকার অধিকাংশ বাসিন্দার প্রধান জীবিকা উদ্যানপালন। গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, অ্যাস্টার, ডায়ানথাস, সেলোসিয়া শীতের মরসুমে যতদূর চোখ যায়, কেবল ফুল আর ফুল। নভেম্বরের শেষ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই ফুলের সমারোহ চূড়ান্ত রূপ নেয়। বছরের বাকি সময়ে একই জমিতে চাষ হয় নানা রকম শাকসবজি, যাতে জমি উর্বর থাকে।
রোড ট্রিপের আনন্দ (Valley of Flowers)
খিরাই পৌঁছনো যায় ট্রেন বা গাড়ি দুই পথেই। খিরাই রেলওয়ে স্টেশন থেকে ফুলের ক্ষেত প্রায় এক কিলোমিটার দূরে, হেঁটেই যাওয়া যায়। তবে গাড়িতে গেলে অভিজ্ঞতাটা আরও উপভোগ্য। কলকাতা থেকে সকাল সকাল রওনা দিলে দুপুরের আগেই পৌঁছে যাওয়া সম্ভব, আর ভিড়ও তুলনামূলক কম থাকে। শীতকাল ও সপ্তাহান্তে পর্যটকের ভিড় বাড়ে, তাই সকালের দিকটাই সবচেয়ে ভালো সময়। জাতীয় সড়ক ১৬ ধরে এগোতে এগোতে উলুবেড়িয়ার কাছে বিখ্যাত আজাদ হিন্দ ধাবায় ব্রেকফাস্ট থামা যেন প্রায় নিয়ম। গরম আলু পরোটা, আন্দা ভুর্জি আর মসলা চায়ের পর আবার যাত্রা শুরু করলে মনও যেমন চনমনে হয়, তেমনই শরীরও। ধাবা থেকে প্রায় ৪০ মিনিট পর গুগল ম্যাপ হাইওয়ে ছেড়ে বামদিকে একটি সরু গ্রামীণ রাস্তায় ঢুকতে বলবে। লাল মাটির সেই পথ, পাশ দিয়ে উঁচু-নিচু ক্ষেত, সবজির ঝাঁক আর দূরে দূরে রঙিন ফুল এই পথচলাতেই বোঝা যায় শহর অনেক পিছনে পড়ে গেছে।
ফুলপ্রেমীদের স্বর্গরাজ্য (Valley of Flowers)
রেল সেতুর নীচে একটি খোলা জায়গায় গাড়ি পার্ক করলেই শুরু হয় খিরাইয়ের আসল অভিজ্ঞতা। এখানে রয়েছে ফুল ও গাছপালা বিক্রির ছোট ছোট অস্থায়ী দোকান। পাশেই একটি চায়ের দোকানে রোল, ম্যাগি, বিস্কুট সব মিলিয়ে একেবারে গ্রামবাংলার স্বাদ। খিরাইয়ে এসে যে জিনিসটি না করলেই নয়, তা হলো ফুলের মুকুট বা টিয়ারা কেনা। তার ও টাটকা ফুল দিয়ে বানানো এই কাস্টমাইজড মুকুট মাথায় পরে পুরো দিন ঘোরার মজাই আলাদা। সামান্য দর কষাকষিতে মাত্র ২০ টাকাতেই গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, জিপসি ও বুনো ফুলের সুন্দর মুকুট মিলতে পারে।
রূপকথার রাজ্যে হাঁটা (Valley of Flowers)
ফুলের মুকুট পরে মাঠের সরু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় যেন রূপকথার কোনও রাজ্যে ঢুকে পড়েছেন। সকালের নরম রোদ যখন মেঘের ফাঁক দিয়ে পড়ে, তখন ফুলের রং আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ফুলের সুগন্ধ, বাতাসে হালকা শীতের ছোঁয়া সব মিলিয়ে পরিবেশটা যেন ছবির মতো নিখুঁত। সরু পথগুলি একেকটি ক্ষেতকে আলাদা করেছে, আর চারপাশ ঘিরে রয়েছে প্রশস্ত হাঁটার রাস্তা। মাঝখান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে মনে হয় এক সুবাসিত রংধনুর তোড়ার ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন।
মাটির টানেই জীবন (Valley of Flowers)
স্থানীয় ফুলচাষিরা এই এলাকার প্রাণ। রাজু নামে এক কৃষক বলেন, “আমরা ফুলচাষি। নভেম্বরের শেষ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত জমি ভরে থাকে ফুলে। বাকি সময়ে শাকসবজি চাষ করি।” এই অঞ্চলটি কংসাবতী নদীর (স্থানীয় নাম কসাই নদী) তীরে অবস্থিত হওয়ায় জমি অত্যন্ত উর্বর। মৌমিতা পাত্র জানান, তাঁদের পরিবারের চাষ করা ফুল কোলাঘাট ও হাওড়ার বাজারে যায়, সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রপ্তানি হয়। গাঁদাই এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুল।
আরও পড়ুন: Dilip Ghosh: ‘ঘরছাড়া’ দিলীপই কি ফের ছাব্বিশে বিজেপির তুরুপের তাস?
স্মৃতির সঙ্গে ফেরার পথ
খিরাইয়ে কাটানো একটি দিন শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে এক অনন্য মুক্তি। এখানে কেনা ফুল বা তোলা ছবি শুধু স্মারক নয়, সঙ্গে নিয়ে ফেরার মতো একরাশ প্রশান্তি। ফেরার পথে কোলাঘাট হয়ে শের-ই-পাঞ্জাব ধাবায় দুপুরের খাবার না খেলে ভ্রমণ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দুপুর দু’টোর মধ্যে পৌঁছোতে পারলে ভিড় এড়ানো যায়। রসুন নান, কাবাব আর ছোলে ভাতুরে সব মিলিয়ে দিনের শেষটাও হয়ে ওঠে তৃপ্তির।



