Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল : রবিবার রাত ১১টা ১৫ মিনিট। মুকুন্দপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিভে গেল এক দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রদীপ (Samir Putatunda)। প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, পার্টি অফ ডেমোক্রেটিক সোশালিজম -এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সমীর পুততুণ্ড আর নেই। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ -এ ভুগছিলেন। দিন সাতেক আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। তার মধ্যেই দু’দিন আগে ঘটে যায় মারাত্মক হার্ট অ্যাটাক। শেষ পর্যন্ত রবিবার রাতে সমস্ত লড়াই শেষ করে বিদায় নিলেন তিনি। এই মৃত্যু শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার প্রস্থান নয় এ যেন পশ্চিমবঙ্গের বাম রাজনীতির এক স্বতন্ত্র, আপসহীন অধ্যায়ের অবসান।

শোকস্তব্ধ রাজ্য রাজনীতি (Samir Putatunda)
সমীর পুততুণ্ডের মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সমাজমাধ্যম ‘এক্স’-এ দেওয়া বার্তায় তিনি লেখেন “একদা বাম আন্দোলনের শক্তিশালী নেতা সমীর পুততুণ্ডকে হারিয়ে আমি খুবই মর্মাহত। মনে হচ্ছে, আমি নিজের কাউকে হারালাম। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনে একসাথে কাজ করেছি। অনুরাধাদিকে সান্ত্বনা জানানোর ভাষা নেই, তবুও সর্বদা পাশে আছি।”এই বক্তব্যেই ধরা পড়ে সমীর পুততুণ্ডের রাজনৈতিক গুরুত্ব। আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যাঁর সঙ্গে আন্দোলনের ময়দানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তাঁর চলে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই এক গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে। রাতেই শোকবার্তা জানান পূর্ণেন্দু বসু, দোলা সেন-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক আন্দোলনের নেতৃত্বরা।
সিপিএম থেকে পিডিএস (Samir Putatunda)
একদা সিপিএমের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা ছিলেন সমীর পুততুণ্ড। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সাংগঠনিক দক্ষতা, তাত্ত্বিক স্পষ্টতা ও আন্দোলনের মাঠে সক্রিয় উপস্থিতি এই তিনের মেলবন্ধনই তাঁকে বাম রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ করে তুলেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর মতানৈক্য প্রকট হয়ে ওঠে। বামফ্রন্ট সরকারের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, আমলাতান্ত্রিক প্রবণতা ও কৃষকস্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্রমশ সরব হন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালে সিপিএম ছাড়েন সমীর পুততুণ্ড। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আর এক বাম নেতা সইফুদ্দিন চৌধুরী। দু’জনের হাত ধরেই জন্ম নেয় পার্টি অফ ডেমোক্রেটিক সোশালিজম একটি বিকল্প বাম রাজনৈতিক মঞ্চ, যা ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে থেকে জনস্বার্থের আন্দোলনকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল।

রাজপথের লড়াকু মুখ (Samir Putatunda)
সমীর পুততুণ্ডের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিঃসন্দেহে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলন। শিল্পায়নের নামে কৃষিজমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে যখন রাজ্য জুড়ে ক্ষোভ দানা বাঁধছিল, তখন তিনি ছিলেন কৃষি জমি রক্ষা কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা। শুধু বক্তৃতা নয়, রাজপথে নেমে আন্দোলন, গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলা, প্রশাসনের চাপ উপেক্ষা করে অবস্থান এই সমস্ত কিছুর মধ্য দিয়েই তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন এক সত্যিকারের আন্দোলনকারী নেতা হিসেবে। এই আন্দোলনের সময়েই বাম রাজনীতির ভিতরে ও বাইরে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়, যেখানে সমীর পুততুণ্ডের মতো নেতারা আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন থেকে বৃহত্তর গণঐক্যের পথে হাঁটেন।
ক্ষমতার বাইরে থেকেও প্রভাবশালী (Samir Putatunda)
পিডিএস-এর বাইরেও সমীর পুততুণ্ড ছিলেন দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ-এর অন্যতম অভিভাবক। শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী বিভিন্ন স্তরের মানুষকে এক ছাতার তলায় এনে তিনি নাগরিক আন্দোলনের ভিত মজবুত করেছিলেন। নির্বাচনী রাজনীতির চেয়েও সামাজিক প্রতিরোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন। এই কারণে শাসক ও বিরোধী উভয় শিবিরেই তিনি ছিলেন এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর।

আরও পড়ুন :Baghajatin Station: বাঘাযতীন স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে আগুন
শেষদিন পর্যন্ত আপসহীন অবস্থান
সিপিএম ছাড়ার পরও সমীর পুততুণ্ড কখনও আপস করেননি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি বামফ্রন্ট সরকারের অতীত ভূমিকা ও সিপিএমের রাজনৈতিক বিচ্যুতির কঠোর সমালোচনা করে গিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে ছিল তিক্ততা নয়, বরং আদর্শগত দায়বদ্ধতা। তিনি বিশ্বাস করতেন বাম রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতা নয়, বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি কখনও মূল স্রোতে মিশে যাননি।



