Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: দেখতে দেখতে ১৫৩টি বসন্ত পেরিয়ে এসেছে কলকাতার ট্রাম (Tram)। ১৮৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যে যাত্রা শুরু হয়েছিল ঘোড়ায় টানা কামরার মাধ্যমে, তা আজ ইতিহাস, আবেগ, নস্টালজিয়া এবং বিতর্ক সব কিছুর এক জটিল মিশ্রণ। সময়ের স্রোতে বহু কিছু বদলেছে, বদলেছে শহরের চেহারা, মানুষের জীবনযাত্রা, প্রযুক্তি, পরিবহন ব্যবস্থার কাঠামো কিন্তু ট্রাম রয়ে গেছে এক বিশেষ স্মারক হয়ে।

ঔপনিবেশিক আধুনিকতার প্রথম পদক্ষেপ (Tram)
১৮৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতার রাস্তায় প্রথম ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলতে শুরু করে। ব্রিটিশ শাসনাধীন শহরে এটি ছিল আধুনিক নগর পরিবহনের এক নতুন অধ্যায়। পরবর্তীতে ১৮৯৫ সালে বৈদ্যুতিক ট্রামের সূচনা হয় যা উপনিবেশিক ভারতবর্ষে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তৎকালীন কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে শহরটির পরিকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ট্রাম শুধু পরিবহন নয়, বরং নগরায়ণের প্রতীক হয়ে ওঠে। একসময় ৩৭টি রুটে চলা ট্রাম আজ সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র দুটি রুটে শ্যামবাজার-ধর্মতলা এবং গড়িয়াহাট-ধর্মতলা। যে যন্ত্র একসময় শহরের প্রাণরেখা ছিল, আজ তা প্রায় স্মৃতিচিহ্নে পরিণত।
নস্টালজিয়া স্মৃতির ভাণ্ডার (Tram)
ট্রাম মানেই কলকাতার ধীর লয়ের ছন্দ। ট্রামের টুংটাং ঘণ্টা, কাঠের বডির গন্ধ, জানালার ধারে বসে শহর দেখা এসবই এক গভীর আবেগ তৈরি করেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মনে। শহরের প্রেম, প্রথম দেখা, আড্ডা, অফিসফেরা ক্লান্তি সব কিছুর সাক্ষী থেকেছে ট্রাম। এটি ছিল সামাজিক মিলনক্ষেত্রও। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একই কামরায় পাশাপাশি বসে যাত্রা করতেন। এক অর্থে ট্রাম ছিল নাগরিক গণতন্ত্রের চলন্ত প্রতিরূপ।

আধুনিকতার চাপে সংকুচিত পরিসর (Tram)
বর্ধিত যানবাহন, উড়ালপুল, দ্রুতগতির বাস ও মেট্রো পরিষেবার বিস্তার এসবের ভিড়ে ট্রাম ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। পরিসংখ্যান বলছে, শহরে গাড়ির সংখ্যা লক্ষাধিক হারে বাড়ছে। দূষণের মাত্রাও বেড়েছে বিপজ্জনকভাবে। অথচ বিশ্বে প্রায় ৪০০টি শহরে আজও ট্রাম আধুনিকীকরণ করে চালু রাখা হয়েছে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পরিবহন হিসেবে। বিদ্রূপ এই যে, যে শহর ভারতবর্ষে প্রথম ট্রাম চালু করেছিল, সেখান থেকেই ট্রাম প্রায় বিলুপ্তির পথে।
এক চলমান রূপক (Tram)
কলকাতার ট্রাম কেবল রাস্তায় নয়, সাহিত্যের পাতাতেও সমানভাবে জীবন্ত। সত্যজিৎ রায়-এর ফেলুদা কাহিনিতে কলকাতার রাস্তা ও ট্রামলাইন প্রায় অবিচ্ছেদ্য। শহরের ভৌগোলিক ও মানসিক মানচিত্র নির্মাণে ট্রাম এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর ‘সেই সময়’ উপন্যাসে ঊনবিংশ শতকের কলকাতার সামাজিক রূপান্তরের সঙ্গে ট্রামের উপস্থিতি আধুনিকতার প্রতীক হয়ে ওঠে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়-এর কবিতায় নাগরিক সুরের সঙ্গে ট্রামের চলন যেন এক অদৃশ্য ছন্দ সৃষ্টি করে। শঙ্খ ঘোষ শহরের বিশৃঙ্খলার মাঝে ট্রামকে দেখেছেন এক শান্ত সঙ্গী হিসেবে। ট্রামের ঘণ্টাধ্বনি তাঁর কবিতায় হয়ে ওঠে সময়ের প্রতিধ্বনি।
জীবনানন্দ দাশ-এর কবিতায় শহুরে যাত্রা ও অন্তর্গত একাকিত্বের যে দীর্ঘ পথচলা তার সঙ্গে ট্রামের ধীর গতি এক অন্তর্মিল খুঁজে পায়।

আরও পড়ুন: Suniti Kum ar Chatterjee: মহাগ্রন্থের শতবর্ষ! ‘ও-ডি-বি-এল’এই বই বাঙালির আত্মপরিচয়ের শিকড়
বর্তমান বিশ্বে টেকসই পরিবহন ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপ ও এশিয়ার বহু শহরে ট্রাম নতুন প্রযুক্তিতে ফিরে এসেছে লো-ফ্লোর, এয়ারকন্ডিশন্ড, বিদ্যুৎচালিত ও দূষণমুক্ত ব্যবস্থায়। কলকাতায়ও এক কামরার এসি ট্রাম চালুর চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু নীতি, পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে তা স্থায়ী রূপ পায়নি। প্রশ্ন উঠছে শহরের দূষণ ও যানজট কমাতে ট্রাম কি আবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে না? ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন দুই কি একসঙ্গে সম্ভব নয়?



