Last Updated on [modified_date_only] by Sabyasachi Bhattacharya
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ১২ মে দিনটা ইতিহাসের পাতায় যেভাবেই লেখা থাক, সমগ্র বাঙালির কাছে দিনটা বিশেষ একজনের জন্মদিন আর ভেঙে যাওয়া প্রেমের গল্পের জন্য স্মরণীয় (Anjan Dutt)।
আক্ষেপ আঁকা রয়েছে সুরের তুলিতে (Anjan Dutt)
বর্ণের নানান রকম ব্যবহার আমরা করে থাকি কিন্তু যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয় অঞ্জনবর্ণ বলতে কী বোঝেন? তবে খানিকটা মাথা চুলকাতে চুলকাতে ঘাড় নেড়ে না বলবেন অনেকেই। আবার কেউ কেউ পাগলের প্রলাপ বলেও উপহাস করতে পারেন। কিন্তু এই ১২ মে দিনটার সঙ্গে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে অঞ্জনবর্ণ (Anjan Dutt)।
আমাদের চারপাশের জীবন যে খুব সাজানো গোছানো সেটা কিন্তু নয়। জীবন মানে এলোমেলো কথা আর সেই সব কথার কোলাজ। এখানেই রয়েছে ট্রাপিজের খেলা কিন্তু সেখানে আসল মুখের পরিচয় নেই আর আবার রং মুছে ফেললে এক বিষাদ অপেরা। সিনেমার খসড়া থেকে গানে টুকরো কথার কোলাজ, মহড়া মঞ্চে তখন আলো-ছায়া। সেখান থেকেই জীবনের আসল মন্ত্র শিখে যাওয়া। বেঁচে থাকার আসল মন্ত্র তখন একটু একটু করে শিখে নিচ্ছেন সেই ছেলেটা যে প্রস্তুতি নিচ্ছে বড় লাফ দেওয়ার।
ছেলেটা তখন খুব সাহসী ছিল কিনা সেটা জানা নেই তবে কিছুটা তাঁর গল্প জানলে মনে হয় যে সেই সময় খানিকটা হলেও ভয় কাজ করেছে তাঁর মধ্যে। কিন্তু তবু সে পিছু হটেনি। দার্জিলিং থেকে কলকাতায় এসে মানিয়ে নিতে না পারার কারণে মানসিক টানাপোড়েন থেকে ধীরে ধীরে এই কলকাতা শহরের প্রেমে পড়ে যাওয়া ছেলেটার নাম অঞ্জন দত্ত (Anjan Dutt)।

বাঙালির কাছে যা এক ভালবাসার নাম, আবেগের নাম। তাঁর অনুকরণ করতে গেলে অনিবার্যভাবে কিছুটা তোতলানো আসলে শব্দগত না বরং তাঁর জীবনের উত্থান পতনের গল্প বেশি বলে। নৈর্ব্যক্তিক থেকেও যাঁর গল্প আমাদের ভাবিয়ে তুলতে সাহায্য করে সেই মানুষটা আজ সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে। শিকড়ের টানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বোহেমিয়ান ঘোড়া যেভাবে আমাদের চিনতে সাহায্য করে আমাদের চারপাশ তিনিও ঠিক সেই কাজটাই করেছেন। নিজের ছন্দে চিনিয়েছেন আমাদের আশেপাশে ভাল লাগা, খারাপ লাগা। শব্দ দিয়ে ছবি এঁকেছেন জীবন ক্যানভাসে। আজও তাঁর গান বেজে উঠলে স্মৃতিরা মূর্ত হয় (Anjan Dutt)।

আজ থেকে বেশ কয়েক বছর পিছিয়ে যাওয়া গেলে দেখা যাবে মোবাইল তখনও আসেনি, ল্যান্ড ফোনের যুগ। তবে সেই ল্যান্ড ফোনও নেই সবার বাড়িতে। পাড়ায় পাড়ায় টেলিফোন বুথ আর সেখানে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে সকলে। সেই সময় টেলিফোন নম্বর মানুষের মুখস্থ থাকত। ক্রমে এল মোবাইল, সেই টেলিফোন নম্বর মনে রাখার চল উঠে গেল। কিন্তু বাঙালি আজও যে ফোন নম্বর ভোলেনি সেটা হল ২৪৪১-১৩৯, অর্থাৎ বেলা বোসের নম্বর। যে বেকার ছেলেটি চাকরি পেয়েই তাঁর প্রেমিকাকে খবর দেওয়ার জন্য ফোন করেছিল। বাঙালি যেমন ভোলেনি আরেকটি তারিখ আর সেটা হল ১২ মে। কারণ এটা অঞ্জন দত্তর গানের চরিত্র ‘মালা’-র জন্মদিন (Anjan Dutt)।
অঞ্জন দত্তর ‘মালা’ গানটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৩ সালে। তবে গানের সুর মৌলিক নয়। এই গানের সুর পিটার সারস্টেডের ‘হোয়্যার ডু ইউ গো টু মাই লাভলি’ গান থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘মালা’। পিটারের গানের মেরি হয়ে উঠেছেন অঞ্জনের মালা। গান অনুসারে সেই মালার জন্মদিন এই ১২ মে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নীরা’-র মতই অঞ্জনের এই মালা, বাঙালির মনে চিরকালীন জায়গা দখল করে রেখেছে।
অঞ্জন এই গানে ‘মালা’-র বর্ণনা করতে যে কাল্পনিক রূপকের আশ্রয় নিচ্ছেন সেখান থেকে সামাজিক অবস্থানের একটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। গানের কথায় রয়েছে ‘তোমার জংলা পাড়ের ঢাকেশ্বরী শাড়ি, তোমার পিসিচন্দ্রের ঝুমকো কানের দুল। আজ ১২ মে তাই সকাল থেকে জন্মদিনের তোড়া তোড়া ফুল’। খুব স্পষ্ট যে মালা তাঁর জন্মদিনে অনেক দামি দেশি বিদেশী উপহার পেয়েছে কিন্তু অঞ্জনের সেই ক্ষমতা নেই, অর্থাৎ এখানে অর্থনৈতিক যে তফাৎ সেটা স্পষ্ট। সেই অর্থনৈতিক বিভেদই বিচ্ছেদের একটা অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে গানে। এখানে এই গান শুধুই আবেগ বা ভালবাসায় আটকে নেই এটা অনেক বেশি সামাজিক বা অর্থনৈতিক।
সকাল থেকেই স্মৃতির মগজে ভিড় করে আসছে পুরনো স্মৃতি, পুরনো সুর। আর সেই কল্পনার মাঝেও একটা চরিত্র ভীষণ জীবন্ত হয়ে উঠছে। ১২ মে তাঁর জন্মদিনের দিনেই এই স্বপ্নবাজ গায়কের জীবন থেকে চলে গিয়েছেন। সেই স্মৃতিচারণাকে আশ্রয় করেই এই গানের জন্ম (Anjan Dutt)।
পিটারের গানে সেই চরিত্রের নাম ছিল মেরি ক্ল্যার, নেপলসের বস্তির এক দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে বনেদিপাড়ার মানুষ বনে গিয়েছিল সে। তার পর দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানো, বিলাসবহুল জীবনযাপন, বনেদি চমকে চলাফেরা। তার পরও গায়কের প্রশ্ন, প্রতি রাতে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ার ক্ষণে কোথায় হারিয়ে যায় সে? যে চিন্তাগুলো তাকে ঘিরে ঘুরপাক খায় অবিরত, তার সন্ধান চায় গায়কের প্রেমিক মন। কথাগুলো ছিল, ‘বাট হোয়্যার ডু ইউ গো টু মাই লাভলি, হোয়েন ইউ অ্যালোন ইন ইয়োর বেড, টেল মি দ্য থটস দ্যাট সারাউন্ড ইউ, আই ওয়ান্ট টু লুক ইনসাইড ইয়োর হেড, ইয়েস আই ডু (Anjan Dutt)।’
তবে অঞ্জন দত্ত অনেক বেশি করে বাঙালির। তিনি সেই কলকাতার গল্প বলেন যে কলকাতায় বাঁচতেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। যিনি শেষবার বেরিয়ে অঞ্জন দত্তর থেকে টাকা নিয়ে ট্যাক্সি ধরেছিলেন এবং তাঁকে আশীর্বাদ করে গেছিলেন ‘বড় হয়ে আল পাচিনো হও।’ তাঁর জীবনে এসেছেন যেমন বাদল সরকার, মৃণাল সেন তেমন এসেছেন লিন্ডসে অ্যান্ডারসনের, কার্লো লিজানির, সিডনি লুমে-র, বা রবার্ট ডে নিরো-রা। ভেনিসে একই উৎসবে তিনি পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার, আর অঞ্জন দত্ত নবাগত হিসেবে অন্য একটি পুরস্কার। ডি নিরো আর অঞ্জন দত্ত হাত মিলিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন: Garga Chatterjee Arrest: গ্রেপ্তার গর্গ চাটার্জী, নেপথ্যে কোন কারণ?
অঞ্জনময় এই গল্পে জীবন যেমন গন্ধের তেমন মিশে আছে স্পর্শ। সেখানে তামাক, থেকে আগে ব্যবহার করা পাউডার বা বিদেশি উপহার। মানুষের ছেড়ে যাওয়ার গন্ধ আবার দার্জিলিংয়ের পাহাড় মাখা এক শান্ত হিমেল হাওয়া। তবে এই জীবন অনেক বেশি রক্ত-মাংসের। জীবন-গদ্য বাংলা ভাষা থেকে বাঙালির মনে বিরাজ করবে আপামর কাল। এই গদ্য চলে নিজের নিয়মে, ফুরিয়ে গিয়েও আবার শুরু হয়। ব্যর্থ হলেও জীবন বিমুখ হয় না। আজ সেই জাদুকরের এক গানের উদযাপনের দিন আজ ১২ মে (Anjan Dutt)।
জীবন জড়িয়ে থাকা এই গায়কের প্রতি তাঁর ভক্তকূল একটাই লাইন উদ্ধৃত করবে, ‘আমি চিনি আমি জানি তোমাকে….তোমাকে’। আর সেই সময়ে এই জাদুকর মুচকি হেসে জীবন অপেরার ক্যানভাসে এঁকে রাখবেন জীবন-দলিল (Anjan Dutt)। যার পাঠ উদ্ধারে বাঙালি আবার স্মৃতিবিজড়িত হবেন, আর কানে বাজবে কেউ একজন বলছেন, ‘I hate Calcutta, I love Calcutta, I’m excited about Calcutta, I’m disappointed about Calcutta, I’m irritated by Calcutta, I’m fascinated by Calcutta .. Calcutta is my El Dorado’.


