Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে টালিগঞ্জ বরাবরই একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র (Papiya Adhikari)। শুধু রাজনৈতিক কারণেই নয়, বাংলা চলচ্চিত্র জগতের প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় এই এলাকার গুরুত্ব আরও বেশি। দীর্ঘদিন ধরে টালিগঞ্জের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এক বিশেষ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব বলয়। সেই প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ফেডারেশনের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং বিশেষ করে বিশ্বাস পরিবার। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই দীর্ঘদিনের ক্ষমতার কাঠামোতে বড় ধাক্কা এসেছে। টালিগঞ্জের নতুন বিধায়ক তথা অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারী প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছেন যে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে এবার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। তাঁর দাবি, দুর্নীতি, পক্ষপাতিত্ব, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং ‘ব্যান কালচার’-এর অবসান ঘটিয়ে স্বচ্ছ ও কর্মমুখী পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। এই ঘোষণার পর থেকেই টলিউডের অন্দরে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।

ফেডারেশন বনাম সংস্কারের দাবি (Papiya Adhikari)
বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু শিল্পী, টেকনিশিয়ান এবং কলাকুশলী দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে এসেছেন যে, ইন্ডাস্ট্রির কাজকর্ম একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ফেডারেশন এবং স্বরূপ বিশ্বাসের নাম প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল। ফেডারেশনের সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। কে কাজ পাবে, কে পাবে না, কোন প্রযোজকের ছবি শুরু হবে, কোন শিল্পী সুযোগ পাবেন—এসব প্রশ্নে ফেডারেশনের ভূমিকা নিয়ে বহু বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে শিল্পীদের মূল্যায়ন করা হয়েছে। কেউ বিরোধী রাজনৈতিক মত পোষণ করলে তাঁকে কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার অভিযোগও বারবার সামনে এসেছে। যদিও এই অভিযোগগুলির সবকটির সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তবুও ইন্ডাস্ট্রির একাংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জমা হয়েছিল। পাপিয়া অধিকারীর বক্তব্য সেই জমে থাকা ক্ষোভকেই যেন নতুন ভাষা দিয়েছে।
টলিউডের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় (Papiya Adhikari)
গত কয়েক বছরে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলির মধ্যে একটি ছিল ‘ব্যান কালচার’। অভিযোগ ছিল, কোনও শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক বা কলাকুশলী যদি ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাহলে তাঁকে কাজ থেকে বঞ্চিত করা হতে পারে। কখনও সরাসরি, কখনও পরোক্ষভাবে তাঁকে শিল্পের মূল স্রোত থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হত বলে অভিযোগ ওঠে। অনেক অভিনেতা ও টেকনিশিয়ান সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। কেউ বলেছেন কাজ হারানোর কথা, কেউ বলেছেন হঠাৎ ফোন আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা, আবার কেউ অভিযোগ করেছেন সংগঠনের চাপে প্রযোজকদের সিদ্ধান্ত বদলে যাওয়ার। পাপিয়া অধিকারী স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই সংস্কৃতির অবসান ঘটানোই তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তাঁর মতে, কোনও শিল্পীর রাজনৈতিক মতাদর্শ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা সংগঠনগত অবস্থানের ভিত্তিতে কাজের সুযোগ নির্ধারিত হতে পারে না।
নতুন সংগঠন EIMPCC (Papiya Adhikari)
পাপিয়া অধিকারীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাগুলির মধ্যে অন্যতম হল নতুন সংগঠন গঠনের পরিকল্পনা। তিনি জানিয়েছেন, Eastern India Motion Pictures & Cultural Confederation (EIMPCC) নামের নতুন কাঠামোর মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প পরিচালিত হবে। এখানে পুরনো ২৬টি গিল্ডের পরিবর্তে চারটি মূল বিভাগের মাধ্যমে কাজের সমন্বয় করা হবে, সিনেম্যাটোগ্রাফি, পরিচালক বিভাগ, প্রোডাকশন কন্ট্রোলার, আর্ট ও কস্টিউম, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং কার্যকর করার চেষ্টা করা হবে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে বৈঠকের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান এবং কর্মসংস্থানের বিষয়গুলি পর্যালোচনা করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।

টলিউডে এসআইআর কেন? (Papiya Adhikari)
সবচেয়ে বিতর্কিত এবং আলোচিত বিষয় হল টলিউডে ‘এসআইআর’ চালুর ঘোষণা। পাপিয়া অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, বহু মানুষ শুধুমাত্র প্রভাব খাটিয়ে বা অস্বচ্ছ উপায়ে শিল্পে প্রবেশ করেছেন। অনেকেই সদস্যপদ পেয়েছেন, অথচ বাস্তবে কোনও কাজ করেন না। তাঁর মতে, এর ফলে প্রকৃত শিল্পী ও কলাকুশলীরা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। একইসঙ্গে শিল্পের অর্থনৈতিক কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই কারণেই তিনি একটি বিশেষ যাচাই প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন, যেখানে খতিয়ে দেখা হবে, কারা প্রকৃত কর্মী, কারা শুধুমাত্র প্রভাব খাটিয়ে সদস্য হয়েছেন, কারা শিল্পের স্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিগত লাভের জন্য কাজ করেছেন, কোথায় কোথায় দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে যদিও এই প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তবুও এর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
চলচ্চিত্র শিল্পে অর্থনৈতিক সংকট (Papiya Adhikari)
পাপিয়া অধিকারীর বক্তব্যে উঠে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্রমহ্রাসমান সংখ্যা। তাঁর দাবি, গত কয়েক মাসে নতুন ছবির নিবন্ধন কার্যত থমকে গিয়েছে। প্রযোজকরা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। অনেকেই নতুন বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বাংলা সিনেমার ঐতিহ্য বহু পুরনো। হীরালাল সেন থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন এই ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলা সিনেমাকে সম্মান এনে দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সেই শিল্প নানা সমস্যায় জর্জরিত দর্শক সংকট, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্রতিযোগিতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, প্রযোজকদের ঝুঁকি বৃদ্ধি, সাংগঠনিক জটিলতা, এই অবস্থায় শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে।

সামনে আসবে কি আরও বিস্ফোরক তথ্য?
পাপিয়া অধিকারীর দাবি, তাঁর কাছে ইতিমধ্যেই একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। তিনি জানিয়েছেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। যদিও সেগুলি এখনও প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি, তবে প্রয়োজনে তদন্তের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে। এই বক্তব্যের পর থেকেই টলিউডে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, আগামী দিনে আরও বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসতে পারে।
আরও পড়ুন: Pahalgam Pak: পহেলগাম হামলায় পাক যোগ! ৯/১১ হামলায় যুক্ত ব্যাঙ্কের নাম এল তদন্তে
ভয়মুক্ত টলিউডের স্বপ্ন নাকি নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ?
পাপিয়া অধিকারীর সমর্থকদের দাবি, এই উদ্যোগ টলিউডকে ভয়মুক্ত এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, শিল্পের সংস্কারের নামে রাজনৈতিক প্রভাব কি আরও বাড়বে না? এসআইআর প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ হবে? অভিযোগ যাচাইয়ের মানদণ্ড কী হবে?



