Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
প্রতিবেদন ত্রয়ণ চক্রবর্তী: কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রথম বাজেট অধিবেশনের সূচনা ভাষণে রাজ্যপাল আর এন রবি নতুন বিজেপি সরকারের নীতি, পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকারের একটি বিস্তৃত রূপরেখা তুলে ধরলেন (Budget Session 2026)। তাঁর বক্তব্যে উঠে এল আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতিদমন, শিল্পায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী সুরক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সীমান্ত নিরাপত্তার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে তিনি পূর্বতন সরকারের সমালোচনা করে দাবি করেন, নতুন সরকার বাংলাকে উন্নয়ন ও সুশাসনের নতুন পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।

সীমান্ত নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব (Budget Session 2026)
রাজ্যপালের বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্ন। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের আন্তর্জাতিক সীমান্তকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অনুপ্রবেশের সমস্যা রয়েছে, যার ফলে রাজ্যের জনবিন্যাসেও পরিবর্তন এসেছে বলে অভিযোগ। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হচ্ছে। বিএসএফের হাতে জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান। অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাসও দেন রাজ্যপাল।
আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার (Budget Session 2026)
নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। রাজ্যপালের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তোলাবাজি, দুষ্কৃতীরাজ, জমি দখল, মানবপাচার এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে প্রশাসন ইতিমধ্যেই কড়া অবস্থান নিয়েছে। তিনি বলেন, রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রোধে ধারাবাহিক অভিযান চলবে।

নারী ও শিশু সুরক্ষায় কড়া অবস্থান (Budget Session 2026)
নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন এবং মানবপাচারের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে দাবি করেন রাজ্যপাল। তিনি জানান, নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে এবং পুলিশ বাহিনীতে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মহিলাদের সশক্তিকরণের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ চালু হয়েছে এবং সরকারি বাসে মহিলাদের বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অব্যবহৃত জমি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা
রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শিল্পায়নকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছে নতুন সরকার। রাজ্যপাল বলেন, বহু বছর ধরে অব্যবহৃত বা দখল হয়ে থাকা সরকারি ও বেসরকারি জমি পুনরুদ্ধার করে শিল্প প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করা হবে। তিনি জানান, হাই-লেভেল টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে এবং জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়ে মুখ্যসচিবসহ শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। সরকারের লক্ষ্য বাংলাকে দেশের অন্যতম শিল্পশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা।
রেল ও মেট্রো প্রকল্পে রাজ্যের পূর্ণ সহযোগিতা (Budget Session 2026)
রাজ্যপালের বক্তব্যে পরিবহণ অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, মেট্রো রেলসহ রাজ্যের সমস্ত রেল প্রকল্পের কাজে রাজ্য সরকার সর্বতোভাবে সহযোগিতা করবে। বিশেষভাবে চিংড়িহাটা মেট্রো প্রকল্পের প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, পূর্বতন সরকারের কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন আটকে ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই কাজ আবার শুরু হয়েছে বলে দাবি করেন।

কৃষি, মৎস্য ও উপকূলীয় অর্থনীতিতে জোর
গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কৃষকদের জন্য সুবিধাজনক নীতি প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপকূলীয় পরিবহণ, অন্তঃদেশীয় জলপথ পরিবহণ এবং মৎস্যচাষের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। অশোকনগরে ONGC-র কার্যক্রমকে আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনার বিষয়েও ইতিবাচক বার্তা দেন রাজ্যপাল।
শিক্ষাক্ষেত্রে বড় সংস্কারের ইঙ্গিত (Budget Session 2026)
শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কর্মমুখী করার লক্ষ্যে একাধিক পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। রাজ্যপাল জানান, শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত উন্নত করা হবে। লাইব্রেরিগুলিকে আধুনিক পরিকাঠামোর আওতায় আনা হবে। নিয়মিত TET পরীক্ষা নেওয়া হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) কার্যকর করা হবে। PM SHRI প্রকল্প রাজ্যে চালু করা হবে। স্কুলে ‘বন্দেমাতরম’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গে IIT স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।

স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় AIIMS-এর প্রতিশ্রুতি
উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে সেখানে একটি AIIMS প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন রাজ্যপাল। তিনি বলেন, উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে রাজ্য সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
যুব সমাজের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দিশা
রাজ্যপাল তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেন যে, মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই কর্মসংস্থানের অভাবে অন্য রাজ্যে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এই পরিস্থিতি বদলাতে সরকার স্টার্টআপ হাব গড়ে তুলবে এবং বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য বিশেষ কর্মসংস্থানমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করবে। ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের উপরও জোর দেওয়া হবে।
দার্জিলিং ও উত্তরবঙ্গকে ঘিরে বিশেষ পরিকল্পনা
দার্জিলিংয়ের গোর্খাল্যান্ড দাবির প্রসঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন রাজ্যপাল। তিনি বলেন, সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে দীর্ঘদিনের এই সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজা হবে। এছাড়া গজলডোবা পর্যটন কেন্দ্রকে আরও উন্নত করে উত্তরবঙ্গের পর্যটন শিল্পকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন উদ্যোগ (Budget Session 2026)
রাজ্যপালের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বাংলার মানুষ বহু কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। নতুন সরকার সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে চায়। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় স্বচ্ছতা আনা হবে। বিধবা ও প্রবীণ নাগরিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির পূর্ণ বাস্তবায়নে সবরকম উদ্যোগ নেওয়া হবে। পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ। রাজ্যপাল তাঁর বক্তৃতায় পূর্বতন তৃণমূল সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি চলেছে এবং সাধারণ মানুষ সুবিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করেছে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

আরও পড়ুন : US Command: মার্কিন কম্যান্ডের নাম থেকে ইন্দো উধাও, ভারতের গুরুত্ব কি কমছে? নয়া বিতর্ক
‘ভয় আউট, ভরসা ইন’
সমগ্র ভাষণের মূল সুর ছিল পরিবর্তন, সুশাসন এবং নিরাপত্তা। রাজ্যপালের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে এমন একটি বাংলার চিত্র, যেখানে দুর্নীতি, তোলাবাজি ও অপরাধের পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে; যেখানে শিল্প, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলবে; এবং যেখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় নয়, ভরসার পরিবেশ তৈরি হবে।



