Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: জলই জীবন। পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জলের কোনও বিকল্প নেই। অথচ একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিনির্ভর যুগে দাঁড়িয়ে ভারত আজ এক ভয়াবহ জলসংকটের সম্মুখীন। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূগর্ভস্থ জলের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে দেশের একাধিক বড় শহর ‘ডে জিরো’ বা সম্পূর্ণ জলশূন্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে (Save Water)।

‘ডে জিরো’ কী? (Save Water)
‘ডে জিরো’ বলতে এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝায়, যখন কোনও শহর বা অঞ্চলের জলাধার, নদী, হ্রদ এবং ভূগর্ভস্থ জলস্তর এতটাই কমে যায় যে প্রশাসনের পক্ষে সাধারণ মানুষের জন্য নিয়মিত জল সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। এই অবস্থায় মানুষকে নির্দিষ্ট রেশনিং পদ্ধতিতে জল দেওয়া হয় অথবা ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে সীমিত পরিমাণ জল সরবরাহ করতে হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন শহর কয়েক বছর আগে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। এখন সেই আশঙ্কাই ভারতের একাধিক শহরকে ঘিরে ধরেছে।
কেন তৈরি হচ্ছে এই জলসংকট? (Save Water)
ভারতের জলসংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, শহরের বিস্তারের জন্য দ্রুত জলাভূমি, পুকুর এবং প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করা হচ্ছে। ফলে বৃষ্টির জল মাটির নিচে পৌঁছাতে পারছে না। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন, প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ বোরওয়েল ও নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ জল তোলা হচ্ছে। কিন্তু সেই জল পুনরায় মাটির নিচে ফিরে যাওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বর্ষার অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ খরা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলাধার দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে জলের ব্যবহার কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় নতুন জলসম্পদের সৃষ্টি হয়নি।
দেশের সবচেয়ে সংকটাপন্ন শহর (Save Water)
বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূগর্ভস্থ জলসংকটের মুখে রয়েছে তেলঙ্গানার রাজধানী হায়দরাবাদ। কেন্দ্রীয় জল শক্তি মন্ত্রকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রেটার হায়দরাবাদের ২৬টি মন্ডল ও তহসিল এলাকাকে ‘Over-exploited’ বা অতিশোষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।হাজার হাজার বোরওয়েল শুকিয়ে গেছে। বহু এলাকায় ট্যাঙ্কারের জল ছাড়া জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে পানীয় জলের জন্য।
প্রযুক্তির শহরে জলের জন্য হাহাকার (Save Water)
ভারতের আইটি রাজধানী বেঙ্গালুরু একসময় ‘হ্রদের শহর’ নামে পরিচিত ছিল। প্রায় ২৬০টিরও বেশি হ্রদ ছিল এই শহরে। বর্তমানে তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ টিকে আছে। দ্রুত নগরায়ণ ও অবৈধ নির্মাণের ফলে অধিকাংশ জলাধার ধ্বংস হয়ে গেছে। হাজার হাজার বোরওয়েল শুকিয়ে যাওয়ায় আবাসনগুলিতে জলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। কাভেরী নদী থেকে বহু দূর থেকে জল এনে সরবরাহ করা হলেও শহরের চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না।
রাজধানীতেও পানীয় জলের সংকট (Save Water)
দেশের রাজধানী দিল্লির অবস্থাও উদ্বেগজনক। দিল্লির প্রায় ৩.৩ কোটি মানুষের পানীয় জলের বড় অংশ আসে যমুনা নদী থেকে। কিন্তু যমুনা বর্তমানে মারাত্মকভাবে দূষিত। অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ জলস্তরের বহু ইউনিটকে ‘গুরুতর’ বা ‘Critical’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। গরমের মরসুমে হাজার হাজার মানুষ ট্যাঙ্কারের জলের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। জল সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইন, ঝগড়া-বিবাদ এবং প্রশাসনিক চাপ রাজধানীতে এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা।
‘ডে জিরো’-র বাস্তব অভিজ্ঞতা (Save Water)
২০১৯ সালে চেন্নাই ভারতের প্রথম বড় শহর হিসেবে কার্যত ‘ডে জিরো’ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। শহরের চারটি প্রধান জলাধার সম্পূর্ণ শুকিয়ে গিয়েছিল। সেই সময় ট্রেন ও ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে জল এনে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছিল। বর্তমানে আরেকটি বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। ভূগর্ভস্থ জলস্তর কমে যাওয়ার ফলে সমুদ্রের নোনা জল মাটির নিচে প্রবেশ করছে। ফলে পানীয় জল ধীরে ধীরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে উঠছে।
নীরব সংকটের দিকে অগ্রসর (Save Water)
মুম্বইয়ের প্রধান জলাধারগুলিতে জলের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ায় প্রশাসনকে জল রেশনিং করতে হচ্ছে। বর্ষা দেরি হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। অন্যদিকে কলকাতায় আর্সেনিক দূষণ এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনের কারণে বিপদের আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ব কলকাতা জলাভূমি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষা না করা গেলে ভবিষ্যতে কলকাতাও গুরুতর জলসংকটের মুখে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন : Kolita Maji: পরিচারিকা থেকে প্রতিমন্ত্রী, স্বপ্নের উড়ান বর্ধমানের কলিতার
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ‘ওয়াটার মাফিয়া’
যেখানে সরকারি জল সরবরাহ ব্যাহত হয়, সেখানে বেসরকারি ট্যাঙ্কার ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কৃত্রিম জলসংকট তৈরি করা হচ্ছে। অতিরিক্ত দামে জল বিক্রি করা হচ্ছে। দরিদ্র মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফলে জল একটি মৌলিক অধিকার থেকে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হচ্ছে।



