Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
বিশেষ প্রতিবেদন: দেবযানী সরকার: কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এমন কিছু মানুষের উত্থান ঘটে (Kolita Maji), যাঁদের জীবনকাহিনি শুধু রাজনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়, বরং সমাজের অসংখ্য সাধারণ মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আবাসন দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী কলিতা মাঝির জীবনও তেমনই এক অনন্য সংগ্রামের কাহিনি। যিনি একসময় সংসার চালানোর জন্য বাড়ি বাড়ি পরিচারিকার কাজ করতেন, আজ তিনি রাজ্যের একজন মন্ত্রী। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন প্রমাণ করে পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং লড়াই করার মানসিকতা থাকলে কোনও স্বপ্নই অধরা থাকে না।

অভাবের সংসার থেকে স্বপ্নের যাত্রা (Kolita Maji)
কলিতা মাঝির জীবনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তাঁকে একসময় একাধিক বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতে হয়েছে। নিজের মুখেই তিনি স্মৃতিচারণা করে বলেন, ২০২১ সালের আগে তিনি সাতটি বাড়িতে কাজ করতেন। ঘড়ি ধরে ধরে তাঁর দিন চলত। কোথাও আধ ঘণ্টা, কোথাও এক ঘণ্টা, আবার কোথাও দেড় ঘণ্টা। এক বাড়ির কাজ শেষ করে আরেক বাড়িতে ছুটে যাওয়াই ছিল তাঁর প্রতিদিনের জীবন। সেই দৌড়ঝাঁপের মধ্যেই মানুষ তাঁকে মজা করে বিভিন্ন ট্রেনের নামে ডাকত। তিনি স্মরণ করেন, কোনও বাড়িতে ঢুকলেই অনেকে বলত, “আমাদের রাজধানী এক্সপ্রেস আসছে, সরে যা, সরে যা!” আবার কেউ কেউ বলত, “ওই কাঞ্চনজঙ্ঘা আসছে!” দ্রুত কাজ করার দক্ষতার জন্য এই নামগুলো পেলেও সেই সময়ের কঠিন বাস্তবতা তাঁকে অনেকবার কাঁদিয়েছে।
অপমান, কষ্ট আর চোখের জলের দিনগুলো
আজ যাঁকে মন্ত্রীর চেয়ারে দেখা যায়, তাঁর অতীতের পথ মোটেই সহজ ছিল না। কলিতা মাঝি স্বীকার করেন, জীবনের অনেক মুহূর্তে তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেঁদেছেন। অপমান, দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু তিনি কখনও হার মানেননি। কষ্টকে শক্তিতে পরিণত করেছেন। সেই কারণেই আজও তিনি নিজের অতীতকে লুকিয়ে রাখেন না, বরং গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।

রাজনীতিতে আসার প্রথম দ্বিধা (Kolita Maji)
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সিদ্ধান্তও সহজ ছিল না। কলিতা মাঝি জানান, প্রথমদিকে তিনি নিজেই ভাবতেন রাজনীতি করলে সংসারে অশান্তি হবে, কাজের ক্ষতি হবে, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। তাঁর ভাষায়, “আমি বলেছিলাম, না, আমি পার্টি করতে গেলে তোমরা ঘরে অশান্তি হবে, কাজ হবে না, কিছু হবে না।” কিন্তু মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা এবং রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতি বিশ্বাস তাঁকে ধীরে ধীরে জনজীবনের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। সেখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।
‘ভয়’ শব্দটি নেই তাঁর অভিধানে (Kolita Maji)
কলিতা মাঝির ব্যক্তিত্বের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হল তাঁর নির্ভীক মনোভাব। সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট বলেন, “ভয় জিনিসটা আমার নাই।” এই আত্মবিশ্বাসই তাঁকে জীবনের প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে সাহায্য করেছে। রাজনৈতিক ময়দান হোক বা ব্যক্তিগত সংগ্রাম—কোথাও তিনি পিছিয়ে যাননি। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিবারের সদস্যরা একে অপরের উপর ভরসা করে এগিয়ে গেলে অনেক কঠিন পরিস্থিতিও জয় করা সম্ভব। সেই পারিবারিক ঐক্যই তাঁর শক্তির অন্যতম ভিত্তি।
লটারির মতো পাওয়া জীবনের বড় সুযোগ
নিজের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে বলতে গিয়ে কলিতা মাঝি অত্যন্ত বিনয়ী। তিনি বলেন, “কোন জায়গায় ছিলাম আর কোথায় এলাম! এটা ভগবান যেমন লটারির মতো দেয়, সেরকম দিয়েছে।” তবে এই ‘লটারি’ শুধুমাত্র ভাগ্যের দান নয়। এর পিছনে রয়েছে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, সংগ্রাম, মানুষের সঙ্গে সংযোগ এবং রাজনৈতিক নিষ্ঠা। তাঁর সাফল্যের গল্প দেখিয়ে দেয়, সুযোগ এলেও সেটিকে কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুতি এবং সাহস থাকা জরুরি।
মন্ত্রী হলেও সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাপন
রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছেও কলিতা মাঝির মধ্যে আজও রয়ে গেছে সাধারণ মানুষের সরলতা। তাঁর কথাবার্তায় নেই কোনও অহংকার, নেই ক্ষমতার প্রদর্শন। তিনি জানান, টেলিভিশনের ধারাবাহিক বা সিরিয়াল খুব একটা দেখেন না। কারণ অতিরিক্ত দুঃখের গল্প তাঁকে আবেগপ্রবণ করে তোলে। হাসতে হাসতে বলেন, “সিরিয়ালটা একটু মন খারাপ হয় গো!”

রোমান্টিক অ্যাকশন গল্পের প্রতি ভালোবাসা (Kolita Maji)
পড়াশোনার প্রসঙ্গ উঠতেই ফুটে ওঠে তাঁর আরেকটি সাধারণ মানবিক দিক। তিনি জানান, দুঃখের বই পড়তে তাঁর ভালো লাগে না, কারণ সেগুলো পড়ে কাঁদতে হয়। বরং রোমান্টিক এবং অ্যাকশনধর্মী গল্পের বই তাঁর বেশি পছন্দ। জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নেওয়ার এই মানসিকতাই তাঁকে আলাদা করে তোলে।
নামের মধ্যেই ছিল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত (Kolita Maji)
‘কলিতা’ শব্দের অর্থ সর্বগুণে সম্পন্না। অনেকেই মনে করেন, তাঁর নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। যদিও বাস্তব জীবনে তাঁর পথ ছিল কাঁটায় ভরা, কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি নিজের যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা এবং নেতৃত্বগুণের মাধ্যমে সেই নামের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

আরও পড়ুন : Jennifer Winget: নতুন জীবনের পথে জেনিফার? জোর চর্চা বিনোদন মহলে
নারীশক্তির এক উজ্জ্বল উদাহরণ
“যিনি রাঁধেন তিনি চুলও বাঁধেন” এই বহুল প্রচলিত বাংলা প্রবাদটির বাস্তব প্রতিফলন যেন কলিতা মাঝির জীবন। সংসার সামলানো, পরিচারিকার কাজ করা, রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং শেষ পর্যন্ত রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী হওয়া—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।



