Last Updated on [modified_date_only] by Sabyasachi Bhattacharya
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ২০১২ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি গায়ে খেলেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এবং লুকা মদ্রিচ। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে দুজন ছিলেন প্রতিপক্ষ। নাটকীয় ম্যাচে মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে পরের পর্বে রোনাল্ডোরা (Portugal vs Croatia)।
বিশ্বকাপের শেষ ১৬-য় পর্তুগাল (Portugal vs Croatia)
বাঙালির সবথেকে বড় সুবিধা হল যখন কিছু অনুভূতি সহজে বাক্যে প্রকাশ করা যায় না তখন একজনের স্মরণে গেলে ঠিক ঠাঁই মেলে। তিনি আর কেউ নন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাঙালি যে ঠাকুরে ভরসা রাখে আনন্দ, আবেগ, মনখারাপের দিনে। ফুটবল বিশ্বকাপে এমন এক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হল যেখানে ম্যাচের জয় পরাজয় যেন অনেক পিছনের সারিতে, সামনের সারিতে শুধু দুজন, দুই কিংবদন্তি। একজন রোনাল্ডো আর আরেকজনের নাম মদ্রিচ। ম্যাচ জিতে পরের পর্বে রোনাল্ডো আর বিশ্বকাপ থেকে বিদায় মদ্রিচের (Portugal vs Croatia)।
পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচ শুধুমাত্র বিশ্বকাপের আর চার পাঁচটা ম্যাচের থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল। এখানে খেলার নিয়ম অনুযায়ী বা কালের অমোঘ নিয়মে একদল জিতে এগিয়ে যাবে আরেকদল হেরে ত্যাগ করবে মঞ্চ। কিন্তু এই ম্যাচে দুই দলেই এমন দুজন তারকা ছিলেন যাঁদের এটাই শেষ বিশ্বকাপ মঞ্চ আর সেই ওয়ান লাস্ট ড্যান্স-এর মঞ্চে ফুটবলপ্রেমীদের নজর ছিল রোনাল্ডো এবং মদ্রিচ দুজনের দিকেই। একদিকে রোনাল্ডোর পরের পর্বে যাওয়ার আনন্দের চোখের জল আবার অন্যদিকে মদ্রিচের বিদায় আবেগে চোখের জল। ফুটবল বিশ্ব সাক্ষী থাকল এই দুইয়ের (Portugal vs Croatia)।

আরও পড়ুন: Venezuela Sailor Body: ভেনেজুয়েলা ফেরত নাবিকের দেহে একাধিক অঙ্গ উধাও, উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি
ফুটবলজীবনের প্রায় শেষ লগ্নে পৌঁছে যাওয়া দুই তারকা ফুটবলারের লড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন ফুটবলপ্রেমীরা। শুক্রবার সকালে ২-১ ব্যবধানে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় পৌঁছে গেল পর্তুগাল। মদ্রিচের দলকে হারিয়ে শেষ হাসি হাসলেন রোনাল্ডো। অফসাইডের জন্য দুই দলের বাতিল হল তিন গোল। তবে এই ম্যাচ শুধু জয় পরাজয়ের নয়, তার থেকে ছিল অনেক বেশি কিছুর (Portugal vs Croatia)।

সাফল্যের পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায় এই দুই তারকা তথা রোনাল্ডো এবং মদ্রিচ পরস্পরকে টেক্কা দিতে পারেন। ২০১২ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি গায়ে খেলেছেন দুজন। দুই প্রাক্তন সতীর্থের কাঁধেই ছিল সেই সময়ের গুরু দায়িত্ব। একসঙ্গে খেলেছেন ২২২টি ম্যাচে খেলেছেন। মাঝমাঠ থেকে মদ্রিচের দেওয়া পাস থেকে রোনাল্ডোর বেশ কিছু গোল রয়েছে রিয়ালের হয়ে। তবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের এই ম্যাচ ছিল মুখোমুখি বোঝাপড়ার। সেই লড়াইয়ে প্রথমার্ধে কেউই দলের সাফল্যগাঁথা লিখতে পারেননি।

এই ম্যাচে নামার আগে রোনাল্ডো একটি পোস্ট করেছিলেন। ২০২৫ সালের ৩ জুলাই গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন রোনাল্ডোর জাতীয় দলের সতীর্থ দিয়েগো জোতা। আর তাঁকে একটা জয় উপহার দিতে চেয়েছিলেন পর্তুগালের ফুটবলারেরা। সেই লক্ষ্যে আক্রমণাত্মক মেজাজে শুরু করেন পর্তুগীজরা। প্রেসিং ফুটবলে ক্রোয়েশিয়াকে চাপে রাখছিল পর্তুগালের প্লেয়াররা। ৪ মিনিটের মাথাতেই ভাল সুযোগ পায় পর্তুগাল। রাফায়েল লিয়াওর তৈরি করা আক্রমণ কাজে লাগিয়ে গোল লক্ষ্য করে দু’টি শট নেন ব্রুনো ফের্নান্দেস। দু’টিই আটকে দেন ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক লিভাকোভিচ। প্রথমার্ধে গোল করতে পারেনি কোনও দলই (Portugal vs Croatia)।
দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের গতি বাড়ায় ক্রোয়েশিয়া। ৪৮ মিনিটে মাতেয়ো কোভাচিচের শট পর্তুগালের এক ডিফেন্ডারের গায়ে গেলে অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের ম্যাচে নাটকীয় দ্বিতীয়ার্ধ ফলাফল নির্ধারণ করে দিল। ৫৩ মিনিটে ইভান পেসিরিচের গোলে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া, সেই ওমর পর্তুগাল শিবিরে ক্ষণিকের বিষণ্ণতা। ইয়োসিপ স্তানিশিচের কাছ থেকে বক্সের মধ্যে বল পান পেরিচিস। বাঁ পায়ের শটে দলকে এগিয়ে দেন অভিজ্ঞ উইঙ্গার (Portugal vs Croatia)।

পিছিয়ে পড়ার পর সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে ওঠে পর্তুগাল আর সেই সময় তাঁরাও হাঁটেন প্রতি আক্রমণের দিকে। আক্রমণের চাপ বাড়তে শুরু করে ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্সে। ৫৮ মিনিটে লিয়াওয়ের শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ঠিক ২ মিনিট পরেই রোনাল্ডো ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষককে প্রায় একা পেয়ে গোল করেন। কিন্তু অফসাইডের জন্য বাতিল হয়ে যায় তাঁর গোল। নাটকে যেন বারবার চূড়ান্ত নাটকীয় মোড়। প্রতিপক্ষ দলের ডিফেন্ডারের থেকে রোনাল্ডোর পা পিছিয়ে থাকলেও তাঁর শরীরের উপরের অংশ বেরিয়ে ছিল (Portugal vs Croatia)।
সেই গোল বাতিল হলেও বেশিক্ষণ থিম থাকেনি পর্তুগাল। একের পর এক আক্রমণে ক্রোশিয়াকে ব্যাতিব্যাস্ত করে দিতে থাকেন রোনাল্ডো। সেখান থেকেই চাপে পড়ে যান ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণ। এরপরে ৬৮ মিনিটে ক্রোয়েশিয়ার এক ডিফেন্ডার বক্সের মধ্যে ফাউল করেন রেনাতো ভেগাকে। পেনাল্টি পায় পর্তুগাল। গোল করতে ভুল করেননি সিআর ৭। সমতা ফেরে পর্তুগালের। এই দিন চেনা ছন্দে রোনাল্ডোকে না পাওয়া গেলেও ওই যে শুরুতেই যে কথা বলেছি এই ম্যাচ ছিল এসবের অনেক ঊর্ধে।
তবে এই ম্যাচে নাটকের আরও অনেকটাই বাকি ছিল। ৮৫ মিনিটে আবার এগিয়ে যেতে পারত ক্রোয়েশিয়া। সুচিচের গোল বাতিল হয়ে যায় অফসাইডের জন্য। এ ক্ষেত্রেও তাঁর শরীরের উপরের অংশ প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের থেকে সামান্য এগিয়ে ছিল। সেই সময় মনে হতে থাকে খেলা অতিরিক্ত সময়ে যাবে কিন্তু সেই সময়ই পর্তুগালকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন গন্সালো রামোস। সংযুক্ত সময়ে লিয়াওয়ের কাছ থেকে বক্সের মধ্যে বল পান। প্রতিপক্ষের দুই ডিফেন্ডারকে ঘাড়ে নিয়েই দুরন্ত গোল করেন তিনি।
শুরুতে যে ম্যাচের কথা লিখতে স্মরণ নিতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কারণ জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে তিনি প্রাসঙ্গিক। এক মঞ্চে বিশ্বকাপের হেতাব জয়ের দিকে আরও এক ধাপ এগোলেন রোনাল্ডো আর অন্যদিকে কেরিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ খেলে ফেললেন মদ্রিজ। ‘আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই কি গেছে?’ না দুই তারকা বিশ্ব ফুটবল থেকে অবসর নিলেও তাঁদের সোনালী দিন থেকে যাবে, থেকে যাবে দর্শকদের আবেগ, গ্যালারি জুড়ে আনন্দ কান্না, একে অপরের প্রতি সম্মান এবং ভালবাসা। ঠিক যেমন শেষের কবিতায় বলা আছে, ‘রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে’।


