Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: সাত মিনিটের আর্জেন্টাইন ঝড়েই নিভল ইংল্যান্ডের ‘হ্যারি কেন’! মেসি ম্যাজিকে দুরন্ত কামব্যাকে ফাইনালে স্পেনের সামনে আর্জেন্টিনা (FIFA World Cup 2026)।

চলতি বিশ্বকাপে শেষ মুহূর্তে ‘মেসি ম্যাজিক শো’ যেন অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছে আর্জেন্টিনা। হাইভোল্টেজ দ্বিতীয় সেমিফাইনালেও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৮৪ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে ছিল লিওনেল স্কালোনির দল। কিন্তু, গোটা বিশ্বের বিশ্বাস ছিল, আটলান্টাতেও মেসি ম্যাজিক হবে। শেষ ৭ মিনিটে মেসির ভরসায় ঝড় তুলে অবিশ্বাস্য কামব্যাক করে হ্যারি কেনদের ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে পৌঁছে গেল গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। না, এই ম্যাচে রেফারিং বা ভার-এর সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনও কোনও বিতর্ক ছিল না। শেষ ৪০ মিনিট শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়লেন ম্যাক অ্যালিস্টার, রড্রিগো ডি’পল, এনজো ফার্নান্দেজরা। আর আর্জেন্টাইনদের মরিয়া এই জয়ের খিদের কাছেই হার মানলেন গর্ডন, হ্যারি কেন, বেলিংহ্যামরা।
এদিনের এই ফলাফলের সঙ্গে সঙ্গেই রবিবার মধ্যরাতে স্পেন বনাম আর্জেন্টিনার বিশ্ব সেরার খেতাবী লড়াইয়ের মেগা মঞ্চও তৈরি হয়ে গেল। সেদিন মেসিরা নামবেন টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের নজির গড়তে। আর স্পেন নামবে ১৬ বছর আগের স্বপ্নের রাত ফিরিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিততে।
নকআউটে কেপ ভার্দে, মিশর, সুইৎজারল্যান্ডের পর এবার শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেও এই আর্জেন্টিনা দল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, ‘হারার আগে হারব না’, আর, ‘মরার আগে মরবো না।’ এই বিশ্বকাপে তারাই একমাত্র ‘কামব্যাক কিং’। সেই সঙ্গে আবারও প্রমাণ হয়ে গেল, ‘মেসি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’। আট গোল করে সোনার বুট জয়ের দৌড়ে থাকা মেসি এদিন ইংরেজদের বিরুদ্ধে নিজে গোল করতে না পারলেও ৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ এবং ৯২ মিনিটে লাউতেরো মার্টিনেজের করা দু’টি গোলের ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান রয়েছে। বিশ্বকাপে মারাদোনার সর্বোচ্চ ১০ অ্যাসিস্টের রেকর্ড গত সুইজারল্যান্ড ম্যাচেই ভেঙে দিয়েছিলেন। এদিন ইংরেজদের বিরুদ্ধে জোড়া অ্যাসিস্ট করে ব্যবধানটা ১৩ করে ফেললেন আর্জেন্টিনা দলের প্রাণভোমরা।
বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা (FIFA World Cup 2026)
শুধু মেসির ম্যাজিক বা এনজো, ম্যাক অ্যালিস্টার, ডি’পলদের লড়াইয়ের ফল এই জয় নয়! স্বয়ং মারাদোনার আশির্বাদও এদিন ছিল আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে। মারাদোনা না থাকলেও, এদিন গোটা ম্যাচে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির উপস্থিত ছিল প্রতি মুহূর্তে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে এই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অফ গড’-এ দলকে জয় এনে দিয়েছিলেন মারাদোনা। তাই তাঁকে স্মরণ করেই এদিন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আকাশী-সাদার পরিবর্তে গাঢ় নীল রঙের অ্যাওয়ে জার্সিতে মাঠে নামার আবেদন করেছিল আর্জেন্টিনা দল। এই শ্রদ্ধা ও সম্মান বিফলে যায়নি। ৬০ বছর পর ইংল্যান্ডের কাপ জয়ের স্বপ্ন চুরমার করে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছে গেল আর্জেন্টিনা।
গোলশূন্য ভাবেই শেষ হয় (FIFA World Cup 2026)
এদিন ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের আগ্ৰাসী মনোভাবের উত্তাপ খেলাতেও চোখে পড়ে। আর তাতেই প্রথমার্ধে দুই দল মিলিয়ে ১৯টা ফাউল হল। ১২টি করে আর্জেন্টিনা। সাতটি ইংল্যান্ড। ফলে প্রথমার্ধে মারপিট হল বেশি। মোটেও ভালো খেলা হয়নি। দেখে যেন মনে হচ্ছিল, ‘ব্যাটল অফ আটলান্টা’ নয়, ‘ব্যাটল অফ ফকল্যান্ড’-এর দ্বিতীয় ভার্সনে অবতীর্ণ হয়েছে দুই দেশ। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনাকে দেখে মনে হচ্ছিল, গোল দিতে নয়, বরং হ্যারি কেনদের আটকাতে নেমেছে। তার সঙ্গে ইংল্যান্ডের খেলা নষ্ট করাই যেন লক্ষ্য ছিল সিমিওনে, লিয়োনার্দো পারেদেসদের। তাই এদিন শুরু থেকে রড্রিগো ডি’পলের জায়গায় কোচ স্কালোনি ডানদিকে জিউলিয়ানো সিমিওনেকে নামালেন। বাবা দিয়েগো সিমিওনের থেকে লড়াইয়ের ভালো ট্রেনিং নিয়েই এসেছিলেন। দৌড়াদৌড়ি, ধস্তাধস্তির কাজটা ভালোই করলেন। দুই দলই দ্রুত আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করলেও প্রথমার্ধে গোল লক্ষ্য করে মাত্র একটি শট নিল ইংল্যান্ড। মেসিও খুব একটা সুবিধে করে উঠতে পারেননি। তাঁর পিছনে প্রথম থেকেই এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে রীতিমতো ‘পুলিশ মার্কিং’ পোস্টিং করিয়ে দেন ইংলিশ কোচ থমাস টুখেল। তবে, গত তিন ম্যাচের তুলনায় আর্জেন্টিনার ডিফেন্স এদিন অনেক বেশি মজবুত ছিল। হ্যারি কেন, গর্ডন, বেলিংহ্যামরা তাই কোনও সুবিধাই করে উঠতে পারেননি। ফলে প্রথমার্ধের খেলা গোলশূন্য ভাবেই শেষ হয়।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেও আর্জেন্টাইন ডিফেন্স ছিল জমজমাট। এবং আক্রমণে গতি বাড়ালেন ম্যাক অ্যালিস্টাররা। আর তাতেই জায়গা পেয়ে গেল ইংল্যান্ড। কিন্তু এইরকম হাইভোল্টেজ ম্যাচে একটা ভুলের খেসারত দিতে হল আর্জেন্টিনাকে। লিসান্দ্রো মার্টিনেজের বাজে ক্লিয়ারেন্স থেকে বল পেয়ে ডান প্রান্তে থাকা মর্গানকে লম্বা ভাসানো বল বাড়ান। সেই বল ধরে মুহূর্তের মধ্যে ক্রস তোলেন মর্গান। চলতি বলে পা ছুইয়ে গোল করতে ভুল করেননি ইংলিশ উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডন। ৫৫ মিনিটে ১-০ গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড।
২০০২ সালে বিশ্বকাপে শেষবার মুখোমুখি হয়ে একমাত্র গোল করে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ছিলেন ইংলিশ কিংবদন্তি ডেভিড বেকহ্যাম। গর্ডনের গোলে দল এগিয়ে যেতেই গ্যালারিতে স্ত্রী ভিক্টোরিয়াকে জরিয়ে ধরে সেলিব্রেশন করতে দেখা গেল বেকহ্যামকে। তিনি হয়তো ভুলে গিয়েছেন তাঁর দল ইন্টার মিয়ামির সেরা ফুটবলারটি তখন মাঠে তাঁর প্রতিপক্ষ।
বেকহ্যামের উচ্ছ্বাস বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। আর তার জন্য দায়ী তাঁর দলের কোচ টুখেল। একটা গোল ধরে রেখে জেতার এক কষতে গিয়ে ডিফেন্সে বেশি জোর দেন। আর প্রতিপক্ষ দলে যে ৩৯ বছর বয়সী একজন ‘বুড়ো শিল্পী’ রয়েছেন, সেটাও মনে হয় প্রথমার্ধে আটকে দেওয়ার সাফল্যে হাল্কা চালে নিয়েছিলেন। আর এই মারাত্মক ভুলটারই অপেক্ষা করছিলেন স্কালোনি। এই আর্জেন্টিনা দলকে খেলতে দেওয়ার এবং বুড়ো মেসি জেগে উঠলে পরিণাম কী ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা নিশ্চয়ই ম্যাচ শেষে বুঝতে পেরেছেন টুখেল। গোল খাওয়ার পরই আসল খেলা শুরু করে আর্জেন্টিনা। এগিয়ে থেকেও একের পর এক আর্জেন্টাইন আক্রমণে কার্যত দিশেহারা হয়ে চাপে পড়ে যায় ইংল্যান্ড।
এই ম্যাচ শুরুর আগে কিংবদন্তি সুইডিশ তারকা জালাটন ইব্রাহিমোভিচ ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর ‘হ্যান্ড অফ গড’ নয়, ‘লেফ্ট লেগ অফ গড’ হবে। আর সেটাই হল। গোল পেতে মরিয়া স্কালোনি পরপর পারেদেস, লিসান্দ্রো, সিমিওনে, মোলিনা, ট্যাগলিয়াফিকোকে তুলে নিয়ে মন্টিয়েল, ডি’পল, গঞ্জালেস, ওটামেন্ডি, লাউতেরো মার্টিনেজকে নামাতেই খেলা ঘুরে যায়। ডি’পল, লাউতেরো নামতেই মেসিরও সুবিধা হয়। ঠিক মিসরের বিরুদ্ধে যা করেছিলেন, এদিন ইংরেজদের বিরুদ্ধেও ঠিক সেটাই করলেন। মার্কার এড়াতে ডান প্রান্তে সরে গেলেন। রক্ষণে জোর দিতে গিয়ে মেসির উপর থেকে নজর সরিয়ে নিলেন জেমস, স্টোন্স, গেহি, স্পেন্সরা।

একের পর এক বল মেসি বাড়াতে শুরু করেন। আর প্রতিটি থেকেই ইংলিশ বক্সে আছড়ে পড়তে থাকে একের পর এক আর্জেন্টাইন আক্রমণ। ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডন পিকফোর্ড কিছু দুরন্ত সেভ না করলে আরও আগেই গোল পেয়ে যেত আর্জেন্টিনা। ৬৯ মিনিটে নিকো গঞ্জালেজের হেড গোল লাইন সেভ করেন ইংলিশ গোলরক্ষক পিকফোর্ড। ৭৫ মিনিটে ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড বারে লেগে ফিরে আসে। কিন্তু এই চাপ বেশিক্ষণ সামলাতে পারেনি ইংল্যান্ড। তবে, ৮৫ মিনিটে মেসির শর্ট কর্নার থেকে বল পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে দূরপাল্লার দুরন্ত শটে গোল করে আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরান সেই এনজো ফের্নান্দেজ।
সমতা ফিরিয়ে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। তারা বুঝে গিয়েছিল, এই চাপ ধরে রাখতে পারলেই ইংল্যান্ডের রক্ষণ আবার ভেঙে পড়বে। হলও তাই। দ্বিতীয়ার্ধের ইনজুরি টাইমে দুরন্ত গোল করে আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠা নিশ্চিত করে দেন লাউতেরো মার্টিনেজ। ৯০+২ মিনিটে ম্যাক অ্যালিস্টারের বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া শট বারে লেগে বেরিয়ে এলে সেই বল ধরে বক্সে ক্রস বাড়ান মেসি। ভেসে আসা বলে হেড করে গোল করে যান লাউতেরো। এরপর বেলিংহ্যাম, হ্যারি কেনরা মরিয়া চেষ্টা করেও বিদায় আটকাতে পারেননি। আরও একবার ব্যর্থ হয়েই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হল ইংল্যান্ডকে।
আরও পড়ুন: France Massacre: স্পেন বনাম ফ্রান্স সেমিফাইনাল ২০২৬ : ফরাসিদের বিদায় ও প্যারিসে বিশৃঙ্খলা
এমবাপে, ডেম্বেলে, ওলিসিদের ফ্রান্সের বিরুদ্ধে এবার তৃতীয় স্থানের লড়াইয়ে নামবেন বেলিংহ্যাম, হ্যারি কেন, গর্ডনরা। আর ১৯ তারিখ তথা রবিবার মধ্য রাতে কাপ জয়ের লাড়াইয়ে নামবে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। ফাইনাল শো-তে ফুটবলের রাজপুত্র মেসির বিরুদ্ধে লড়বেন স্প্যানিশ বরপুত্র ইয়ামাল। স্প্যানিশ তিকিতাকা বনাম আর্জেন্টিনার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হার না মানা অদম্য জেদ।



