Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: দিনভর দিনমজুরি। মাথায় ঝুড়ি চাপিয়ে পাথর তোলা, গাড়িতে পাথর বোঝাই করা। সন্ধ্যা নামলে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরা (Birbhum)। কিন্তু সেখানেই দিনের কাজ শেষ নয়। সংসারের ন্যূনতম খরচটুকু চালাতে নিজের ভাঙা সাইকেলে চেপে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বাড়িতে গিয়ে গৃহশিক্ষকতা করতেন তিনি। বছর পঁচিশেক আগে বীরভূমের মহম্মদবাজারের পাথর খাদান এলাকার এই ছবির সঙ্গে আজকের টুলু মণ্ডলের বিপুল সম্পত্তির কোনও মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। অভিযোগ, সেই দিনমজুরিই একসময় তাঁকে নিয়ে যায় পাথর পরিবহণের ব্যবসায়। এরপর ধাপে ধাপে পাথর ব্যবসা, লরি, ডিসিআর টোলগেট এবং শেষ পর্যন্ত পাথর ও বালি ব্যবসাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় বিশাল সাম্রাজ্য। স্থানীয় মহলে যাঁকে পাথর ব্যবসার ‘বেতাজ বাদশা’ বলে উল্লেখ করা হয়, সেই টুলু মণ্ডল ওরফে মহম্মদ নাজিবুদ্দিনকে ঘিরে এখন নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।

দিনমজুরি থেকে পাথর ব্যবসায় প্রথম পা (Birbhum)
স্থানীয় সূত্রের দাবি, বাম আমলে মহম্মদবাজারের পাথর খাদান এলাকায় নিয়মিত দিনমজুরির কাজ করতেন টুলু। তবে অন্য শ্রমিকদের থেকে তাঁর একটি পার্থক্য ছিল তিনি তুলনামূলকভাবে শিক্ষিত ছিলেন। সেই শিক্ষাকেই কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে পাথর ব্যবসার খুঁটিনাটি বুঝতে শুরু করেন। প্রথম দিকে গাড়িতে পাথর তোলার কাজের ইজারা নেন তিনি। সেখান থেকে কিছুটা পুঁজি তৈরি হওয়ার পর পাথর পরিবহণের ব্যবসায় নামেন। একে একে কয়েকটি লরি কেনেন। নিজেই পরিবহণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পাথরের বাজার, খাদান, লরি মালিক এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে থাকেন। এই পর্যায়েই তাঁর আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয় বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। তবে টুলুর উত্থানের আসল গতি আসে পরবর্তী সময়ে।
নজরে আসে রাজনৈতিক মহলের (Birbhum)
রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর মহম্মদবাজারের পাথর খাদান এলাকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও আগ্রহ বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ। কারণ, মাটির নীচে থাকা পাথর যে বিপুল অর্থের উৎস হতে পারে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, এই সময় পাথর ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন টুলু। শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যবসায়িক বুদ্ধি এবং স্থানীয় যোগাযোগ এই তিনের সমন্বয়ে তিনি দ্রুতই পাথর ব্যবসার অন্যতম প্রভাবশালী মুখ হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ। এরপর আসে ২০১৬ সাল। আর এই সময়টিকেই টুলু মণ্ডলের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
২০১৬: ডিসিআর টোলগেটের দায়িত্ব (Birbhum)
অভিযোগ, তৎকালীন বীরভূম জেলা তৃণমূল নেতৃত্বের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠতা পাওয়ার পর ২০১৬ সালে ডিসিআর টোলগেট পরিচালনার দায়িত্ব পান টুলু মণ্ডল। প্রথমে সোঁতশাল এলাকার একটি টোলগেটের দায়িত্ব তাঁর হাতে আসে। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি টোলগেটের পরিচালনার দায়িত্বও তাঁর হাতে আসে বলে দাবি। আর এখান থেকেই তাঁর ব্যবসায়িক উত্থান ‘রকেটের গতিতে’ শুরু হয় বলে অভিযোগ। সরকারি ব্যবস্থায় ডিসিআর বা Duplicate Challan Receipt-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পাথর বহনকারী গাড়ি থেকে নির্ধারিত রাজস্ব আদায় এবং সেই রাজস্ব ফাঁকি রুখতে নজরদারি করা। কিন্তু অভিযোগ, এই ব্যবস্থাকেই কাজে লাগিয়ে একটি বিশাল দুর্নীতির চক্র গড়ে ওঠে।

কীভাবে চলত ‘জাল ডিসিআর’-এর কারবার? (Birbhum)
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে জাল ডিসিআর। দাবি করা হচ্ছে, পাথরবোঝাই গাড়ির চালকদের কাছ থেকে সরকারি হারে টাকা নেওয়া হলেও তাঁদের হাতে এমন রসিদ দেওয়া হত, যা আসলে নকল। ফলে চালকের কাছে প্রমাণ থাকত যে তিনি টাকা দিয়েছেন, কিন্তু সেই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়ত না। এর ফলে একই টাকা থেকে একদিকে চালক ব্যবসা চালাতে পারতেন, অন্যদিকে সরকারি রাজস্বের বড় অংশ ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হত বলে অভিযোগ। আরও গুরুতর অভিযোগ হল, রাস্তায় সেই কাগজ পরীক্ষা করার দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন স্তরের আধিকারিকদের একাংশও এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যদিও এই অভিযোগগুলির সত্যতা নির্ধারণের জন্য তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। এইভাবেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ টাকা লেনদেন হত বলে অভিযোগ। এমনকি টুলুর নিজের প্রায় ২৫০টি লরিও কোনও চালান ছাড়াই চলত বলে দাবি উঠেছে।
প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা? কোথা থেকে এল বিপুল সম্পত্তি
স্থানীয় সূত্র এবং বিরোধী রাজনৈতিক মহলের অভিযোগ, পাথর ব্যবসা এবং কথিত জাল ডিসিআর ব্যবস্থার মাধ্যমে টুলু মণ্ডলের হাতে বিপুল অর্থ জমা হতে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত আয় হত এই চক্র থেকে। সেই হিসাব সত্যি হলে কয়েক বছরেই বিপুল সম্পত্তি তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়। তবে এই বিপুল সম্পত্তির প্রকৃত পরিমাণ কত, তার মালিকানা কার নামে, কোন সম্পত্তি বৈধ ব্যবসা থেকে এসেছে এবং কোন সম্পত্তির সঙ্গে বেআইনি লেনদেনের যোগ রয়েছে—এসবই তদন্তের বিষয়। আজ যে বিপুল সম্পত্তির কথা সামনে আসছে, তারই একটি অংশের হদিশ মিলেছে বলে দাবি করা হচ্ছে মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া নগদ টাকা ও সোনার ঘটনায়।
মিনারের বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা, ফের সামনে টুলুর নাম
সম্প্রতি মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে বিপুল নগদ টাকা এবং সোনা উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। স্থানীয়দের একাংশ এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের দাবি, উদ্ধার হওয়া সম্পত্তির প্রকৃত মালিক টুলু মণ্ডল। পুলিশের তরফেও টুলুর নেতৃত্বে চলা কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া সম্পত্তির যোগের অভিযোগ সামনে এসেছে বলে জানা যাচ্ছে। ঘটনায় এফআইআরে টুলু মণ্ডলের নামও যুক্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনাই ফের প্রশ্ন তুলেছে—টুলু মণ্ডলের নামে বা তাঁর ঘনিষ্ঠদের নামে ছড়িয়ে থাকা বিপুল সম্পত্তির প্রকৃত উৎস কী?
নিউটাউনে ৫ কোটি টাকা উদ্ধারের ঘটনাতেও নাম (Birbhum)
টুলু মণ্ডলকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। বিধানসভা নির্বাচনের আগে নিউটাউনে একটি গাড়ি থেকে ৫ কোটি টাকা উদ্ধারের ঘটনাতেও তাঁর নাম জড়িয়েছিল বলে জানা যায়। সেই ঘটনার পর থেকেই পাথর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বিপুল নগদ লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়। তবে কোনও মামলায় নাম জড়ানো বা অভিযোগ ওঠা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তই শেষ কথা।
মেয়ের বিয়ে ঘিরে চর্চা, বলিউড তারকাদের উপস্থিতি (Birbhum)
টুলু মণ্ডলের বিপুল সম্পত্তির আলোচনা আরও একবার প্রকাশ্যে আসে তাঁর মেয়ের বিয়েকে কেন্দ্র করে। প্রায় দু’বছর আগে সিউড়িতে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ সেই বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল বলে জানা যায়। বলিউডের একাধিক তারকার উপস্থিতি এবং বিপুল ব্যয়ের কারণে সেই অনুষ্ঠান নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতেও ব্যাপক আলোচনা হয়। বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা সেই সময় প্রশ্ন তুলেছিলেন, এত বিপুল অর্থের উৎস কোথায়? অভিযোগ, বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল। যদিও এই অর্থের হিসাব ও প্রকৃত ব্যয়ের বিষয়ে পৃথকভাবে সরকারি বা আদালত-স্বীকৃত কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত।
ইডির হানা থেকে গ্রেফতারি—বিতর্ক পিছু ছাড়েনি
তৃণমূল আমলে একবার টুলু মণ্ডলের সিউড়ির বাড়িতেও এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি হানা দিয়েছিল বলে জানা যায়। যদিও সেই অভিযানে বড় কোনও সম্পত্তি বা নগদ উদ্ধার হয়নি বলে দাবি করা হয়েছিল। ২০২২ সালে খুন, হুমকি এবং অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগে মহম্মদবাজার থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছিল বলেও জানা যায়। পরবর্তীতে তিনি জামিনে মুক্তি পান। তাঁর গ্রেফতারির পিছনেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে সেই সময় নানা দাবি উঠেছিল। তবে সেই দাবির সত্যতা নিয়েও আইনি প্রমাণ ও তদন্তের ফলাফলই নির্ণায়ক।
বিদেশে সম্পত্তির অভিযোগও (Birbhum)
টুলু মণ্ডলের সম্পত্তির পরিধি শুধু বীরভূম বা পশ্চিমবঙ্গে সীমাবদ্ধ নয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর নিজের নামে এবং স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের নামে দুবাইয়ে একাধিক সম্পত্তি থাকার দাবি বিভিন্ন মহল থেকে করা হয়েছে। যদিও এই সম্পত্তিগুলির প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং আইনসঙ্গত অবস্থান তদন্ত সাপেক্ষ। পালাবদলের পর টুলুর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড অনেকটাই থমকে গিয়েছে বলেও স্থানীয় মহলের দাবি।
আরও পড়ুন: Kanyashree: বদলে গেল কন্যাশ্রীর নাম! তালিকায় সবুজ সাথীও!
টুলুর সাম্রাজ্যের ‘হিমশৈলের চূড়া’?
মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে বিপুল নগদ ও সোনা উদ্ধারের ঘটনাকে তাই অনেকেই বৃহত্তর একটি আর্থিক সাম্রাজ্যের ‘হিমশৈলের চূড়া’ হিসেবে দেখছেন। অভিযোগ সত্যি হলে প্রশ্ন উঠবেই কেবল একজন ব্যবসায়ীর পক্ষে এত বড় আর্থিক নেটওয়ার্ক তৈরি করা কীভাবে সম্ভব হল? সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একাধিক স্তরের মানুষের ভূমিকা ছিল কি? রাজনৈতিক প্রভাব কি এই ব্যবসাকে সুরক্ষা দিয়েছিল? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই বিপুল সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা কোথায় কোথায় ছড়িয়ে রয়েছে?



