Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: প্রায় ২০ বছর পর কলকাতায় এসে এক বিস্তৃত সংবাদ সম্মেলনে লেখিকা তসলিমা নাসরিন তাঁর দীর্ঘদিনের মতাদর্শ, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, বাকস্বাধীনতা, ধর্মীয় মৌলবাদ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Taslima Nasrin), নিজের নির্বাসন এবং ভবিষ্যতে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় অংশগ্রহণের ইচ্ছা নিয়ে খোলামেলা বক্তব্য রাখেন।
বাকস্বাধীনতাই গণতন্ত্রের ভিত্তি (Taslima Nasrin)
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই তসলিমা নাসরিন বলেন, সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে সমালোচনার অধিকার থাকতে হবে। তাঁর মতে, কোনো ধর্ম, মতবাদ বা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করা মানেই ধর্মবিদ্বেষ নয়; বরং যুক্তিবাদী সমাজ গঠনের জন্য প্রশ্ন তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। তিনি বলেন, মুক্তচিন্তা ছাড়া বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি কিংবা সভ্যতার বিকাশ সম্ভব নয়। ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণেই তাঁকে বছরের পর বছর নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছে। তবুও তিনি নিজের অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেননি বলে জানান।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষে জোরালো সওয়াল (Taslima Nasrin)
সংবাদ সম্মেলনে তিনি ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান-সহ গোটা উপমহাদেশে সকল নাগরিকের জন্য সমান নাগরিক আইন প্রণয়নের পক্ষে মত দেন। তাঁর বক্তব্য, ব্যক্তিগত আইন ধর্মভিত্তিক না হয়ে নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে Uniform Civil Code বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, আইনের দৃষ্টিতে নাগরিকের পরিচয় হবে মানুষ হিসেবে, কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ (Taslima Nasrin)
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তসলিমা নাসরিন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির প্রভাব বেড়েছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারের আমলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দুদের ওপর হামলা, নির্যাতন এবং সম্পত্তি দখলের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সহিংসতা ও ধর্মীয় উগ্রপন্থা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, কোনো রাষ্ট্রেই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সমান অধিকার বিঘ্নিত হওয়া উচিত নয়।
আওয়ামি লীগ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা
বাংলাদেশে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-কে নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। তাঁর মতে, রাজনৈতিক মতের লড়াই রাজনৈতিকভাবেই হওয়া উচিত। জনগণ ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে কোন দল ক্ষমতায় থাকবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার অধিকার প্রসঙ্গে (Taslima Nasrin)
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-র বাংলাদেশে ফিরে আসার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তসলিমা নাসরিন বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের নিজের দেশে ফেরার অধিকার রয়েছে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা চাইলে দেশে ফিরে রাজনীতি করবেন এটি তাঁর সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার। একইসঙ্গে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অতীতে শেখ হাসিনার সরকার কিংবা খালেদা জিয়া-র সরকার কেউই তাঁকে নিজের দেশে ফিরে বসবাস করার সুযোগ দেয়নি। দীর্ঘ নির্বাসনের কষ্টের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাসনের যন্ত্রণা ও নিজের অবস্থান (Taslima Nasrin)
নিজের নির্বাসিত জীবনের প্রসঙ্গে তসলিমা বলেন, জন্মভূমি থেকে দূরে থাকা একজন মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টের। তিনি জানান, নিজের দেশ, ভাষা, পাঠক এবং শৈশবের স্মৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে হলেও তিনি কখনও নিজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে আপস করেননি। লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর কলম, আর সেই স্বাধীনতা রক্ষা করাই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় ফেরার ইচ্ছা (Taslima Nasrin)
কলকাতার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের আবেগের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তসলিমা নাসরিন বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে তিনি আবারও কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা-য় অংশ নিতে চান। তিনি আগের মতোই বইমেলার স্টলে বসে পাঠকদের সঙ্গে কথা বলতে, বইয়ে স্বাক্ষর দিতে এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, পাঠকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ একজন লেখকের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আরও পড়ুন: Kolkata Metro: CMS পরীক্ষার্থীদের জন্য রবিবার ভোর থেকেই বিশেষ মেট্রো পরিষেবা
মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রসঙ্গে মন্তব্য
সংবাদ সম্মেলনে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেও প্রশ্ন করা হলে তসলিমা নাসরিন বলেন, শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সমাজ আধুনিক হতে পারে না। তিনি মত দেন, মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, মানবাধিকার, যুক্তিবাদ এবং আধুনিক শিক্ষার সমান গুরুত্ব থাকা উচিত। শিশুদের এমন শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন যাতে তারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখে এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ বা কুসংস্কারের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে।



