Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
প্রতিবেদন ত্রয়ণ চক্রবর্তী: কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রীতি, সহাবস্থান এবং বহুত্ববাদের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে পরিচিত (Adhir Ranjan Chowdhury)। ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মতের বৈচিত্র্যের মধ্যেও বাংলার মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতাই এই রাজ্যের প্রকৃত শক্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রেড রোডে ঈদের নামাজ এবং আন্তর্জাতিক যোগ দিবসকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে বাংলায় কি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি জায়গা করে নিচ্ছে?

ঈদের নামাজ ও রেড রোডের ঐতিহ্য (Adhir Ranjan Chowdhury)
কলকাতার রেড রোড বহু দশক ধরে ঈদের জামাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। কুরবানির ঈদ বা ঈদ-উল-ফিতরের দিনে কয়েক ঘণ্টার জন্য সেখানে হাজার হাজার মুসল্লি একত্রিত হয়ে নামাজ আদায় করতেন। এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না, বরং কলকাতার বহুত্ববাদী সংস্কৃতিরও প্রতীক ছিল। বছরের বাকি সময় রাস্তাটি স্বাভাবিকভাবেই যান চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হলেও, ঈদের দিন অল্প সময়ের জন্য সেখানে নামাজের আয়োজন করা হতো। দীর্ঘকাল ধরে এই ব্যবস্থা চললেও সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের অসন্তোষ বা সামাজিক সংঘাতের ঘটনা খুব কমই দেখা গেছে।
জনসাধারণের অসুবিধা (Adhir Ranjan Chowdhury)
পরবর্তীকালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয় যে রেড রোডে নামাজের কারণে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং সাধারণ মানুষের অসুবিধা হয়। সেই কারণ দেখিয়েই সেখানে নামাজের অনুমতি বন্ধ করা হয় এবং বিকল্প হিসেবে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড ব্যবহারের কথা বলা হয়। সরকারি যুক্তি ছিল জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। রাস্তা মানুষের চলাচলের জন্য, তাই সেটি বন্ধ করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করা ঠিক নয়। এই যুক্তিকে কেন্দ্র করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

তাহলে যোগ দিবসে রেড রোড কেন? (Adhir Ranjan Chowdhury)
বিতর্কের সূত্রপাত এখানেই। সমালোচকদের প্রশ্ন, যদি জনসাধারণের অসুবিধার কথা ভেবে ঈদের নামাজের জন্য রেড রোড ব্যবহার বন্ধ করা হয়ে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক যোগ দিবসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে বিশাল কর্মসূচির জন্য একই রাস্তায় ব্যাপক নিরাপত্তা বলয় ও যান নিয়ন্ত্রণ কেন করা হবে? যদি কয়েক ঘণ্টার জন্য ঈদের নামাজ মানুষের চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি করে, তাহলে একটি বৃহৎ সরকারি অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও কি একই যুক্তি প্রযোজ্য নয়? এই প্রশ্নের মধ্যেই অনেকে দ্বিচারিতার ইঙ্গিত খুঁজে পাচ্ছেন। তাঁদের মতে, একই ধরনের পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত মানুষের মনে পক্ষপাতিত্বের ধারণা তৈরি করতে পারে।
বিষয়টি কি শুধুই প্রশাসনিক!
সমালোচকদের একাংশ মনে করেন, এই বিতর্ক শুধুমাত্র রাস্তা ব্যবহারের বিষয় নয়; বরং এর মধ্যে রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। যখন কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানকে জনস্বার্থের কারণে সীমাবদ্ধ করা হয়, অথচ অন্য কোনো রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্য একই ধরনের বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। গণতান্ত্রিক সমাজে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হওয়া উচিত সমতা ও নিরপেক্ষতা। একই মানদণ্ড সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ না হলে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বাংলার ঐতিহ্য: সম্প্রীতির পথ
বাংলার ইতিহাসে ধর্মীয় সহাবস্থানের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। দুর্গাপূজায় মুসলিম শিল্পীদের অংশগ্রহণ যেমন দেখা যায়, তেমনি ঈদের উৎসবে হিন্দু প্রতিবেশীদের শুভেচ্ছা ও সহযোগিতাও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এই কারণেই বাংলার মানুষ সাধারণত ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে সংঘাতের নয়, বরং মিলনের উৎসব হিসেবে দেখে। তাই কোনো সিদ্ধান্ত বা রাজনৈতিক বক্তব্য যদি সমাজে বিভেদের আবহ তৈরি করে, তা বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করেন অনেকে।

আরও পড়ুন : Longview Tea Garden: ৫০ দিনের অনশনেও মেলেনি সমাধান, এবার নড়বে মালিকপক্ষ
সংকীর্ণতার রাজনীতি থেকে দূরে থাকার আহ্বান
যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হলো একই ধরনের পরিস্থিতিতে কি একই ধরনের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে? যদি না হয়, তাহলে সেই বৈষম্যের ব্যাখ্যা কী? গণতন্ত্রে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের অধিকার। তবে সেই প্রশ্ন যেন বিদ্বেষ নয়, বরং ন্যায়সঙ্গত ও সমান আচরণের দাবিকে সামনে আনে। বাংলার সামাজিক পরিবেশকে সুস্থ রাখতে হলে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজনের পরিবর্তে সমতা, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।



