Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: অমল চক্রবর্তী: হুগলির বেগমপুর একসময় যার পরিচয়ই ছিল তাঁতশিল্প। জমিদার আমল থেকে এই অঞ্চলের তাঁতিদের হাতের তৈরি ধুতি, শাড়ি পৌঁছে যেত কলকাতার বড়বাজারে (Begampur Handloom)। চণ্ডীতলা ও সিঙ্গুর ব্লকের বহু পরিবারের ঘরে ছিল তাঁত। শুধু স্থানীয় তাঁতিরাই নয়, একসময় দূরদূরান্ত থেকে বহু শিল্পী ট্রেনে চেপে বেগমপুরে এসে তাঁত বুনতেন। বেগমপুরেই ছিল প্রায় ১০টি তাঁত সমবায়। মহাজনী প্রথার মাধ্যমে বড়বাজারের ব্যবসায়ীরা তাঁতিদের দিয়ে কাপড় তৈরি করাতেন।

কিন্তু সময় বদলেছে। বাজারের চাহিদা বদলেছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সুতোর দাম, কমেছে তাঁতের মজুরি। পাওয়ার লুম ও বিভিন্ন যন্ত্রনির্ভর শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে হাতে বোনা কাপড়। ফলে যে বেগমপুর একসময় তাঁতের গর্জনে মুখর থাকত, আজ সেখানে বহু তাঁতঘর নিস্তব্ধ। বেগমপুরের তাঁত শাড়ি জি আই তকমা পেলেও সেই স্বীকৃতি এখনও তাঁতিদের ঘরে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি এনে দিতে পারেনি। বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এখন তাঁতিদের ভরসা হয়ে উঠেছে হ্যান্ডলুম ক্লাস্টার এবং নতুন ধরনের পণ্য তৈরির পরিকল্পনা।
একসময় প্রতিটি ঘরেই ছিল তাঁত (Begampur Handloom)
বেগমপুরের তাঁতশিল্পের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। চণ্ডীতলা ও সিঙ্গুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় এমন সময় ছিল, যখন প্রায় প্রতিটি ঘরেই তাঁত বসানো থাকত। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁতের খটখট শব্দই ছিল এলাকার স্বাভাবিক ছবি। বেগমপুরের তাঁত শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ ছিল না। কলকাতার বড়বাজার ছিল এর অন্যতম প্রধান বাজার। মহাজনদের মাধ্যমে সুতো ও অর্ডার আসত, তাঁতিরা কাপড় বুনে দিতেন। জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হতেন। আজ সেই ছবিই বদলে গেছে। একের পর এক তাঁত বন্ধ হয়েছে। বহু পরিবার বিকল্প পেশায় চলে গেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁত আর নিশ্চিত জীবিকার প্রতিশ্রুতি নয়।

দু’দিনের শ্রম, মজুরি মাত্র কয়েকশো টাকা (Begampur Handloom)
বেগমপুরের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সংকট মজুরি। একজন তাঁতি দিনের পর দিন পরিশ্রম করেও যে আয় করেন, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁতশিল্পী সুকুমার দে-র কথায় উঠে এসেছে সেই বাস্তবতা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি শাড়ি বুনতে প্রায় দু’দিন সময় লাগে এবং তার জন্য মজুরি মেলে প্রায় ৪৭০ টাকা। সপ্তাহে চারটি কাপড় তৈরি করতে পারলেও মাসে তাঁর আয় দাঁড়ায় মাত্র সাত থেকে আট হাজার টাকার মতো। এই আয়ে সংসার চালানো যে কতটা কঠিন, তা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট। বয়সের কারণে নতুন পেশায় যাওয়ার সুযোগও নেই। অথচ তাঁর সঙ্গে একটি শাড়ি তৈরির কাজে যুক্ত আরও পাঁচজন ইতিমধ্যেই এই পেশা থেকে সরে গিয়েছেন। শুধু শ্রমিকের অভাব নয়, সুতোর দাম বাড়ার পাশাপাশি তার মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু বাজারে সেই অনুযায়ী দাম পাওয়া যাচ্ছে না।

নারী তাঁতিদের লড়াই (Begampur Handloom)
বেগমপুরের তাঁতশিল্পের সঙ্গে নারীদের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। সোমা দে ছোটবেলায় নিজের আগ্রহে বাবার কাছ থেকে তাঁত বোনা শিখেছিলেন। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতেও সেই পেশা ধরে রেখেছেন। তাঁদের বাড়িতে একসময় ছ’টি তাঁত ছিল। এখন চলছে মাত্র একটি। সোমার কথায়, একটি শাড়ি তৈরি করতে দু’আড়াই দিন সময় লাগে। অথচ মজুরি প্রায় ৪০০ টাকা। এই সামান্য আয়ে সংসার চালানো ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। বাইরে থেকে আর তাঁতি আসেন না, কারণ এই পেশায় পরিশ্রমের তুলনায় আয় অত্যন্ত কম। বাজারে চুড়িদার, নাইটি-সহ আধুনিক পোশাকের ব্যবহার বাড়ায় তাঁতের শাড়ির চাহিদাও আগের তুলনায় কমেছে। ফলে একদিকে বাজার সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে শ্রমিকও হারিয়েছে শিল্পটি (Begampur Handloom)।

নতুন প্রজন্ম কেন তাঁত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে?
বেগমপুরের তাঁতশিল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই নতুন প্রজন্ম কেন এই পেশায় আসছে না? উত্তর খুব জটিল নয়। একজন তরুণ যদি কলকাতায় গিয়ে মাসে ১২ হাজার টাকা বা তার বেশি বেতনের চাকরি পান, সপ্তাহে ছুটি পান, তাহলে অনিশ্চিত আয়ের তাঁতশিল্পে তিনি কেন আসবেন? তাঁতশিল্পীদের বক্তব্য, তাঁত বুনে মাসে ছয়-সাত হাজার টাকা আয় হলে নতুন প্রজন্ম স্বাভাবিকভাবেই অন্য পেশার দিকে ঝুঁকবে। এই কারণেই বেগমপুরের তাঁতশিল্পের সংকট শুধু একটি শিল্পের সংকট নয়। এটি একটি প্রজন্মান্তরের পেশা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
তাঁত ছেড়ে গেঞ্জির কলার, ঝুঁকেছেন অনেকে
জীবিকার তাগিদে বেগমপুরের বহু মানুষ তাঁতের বিকল্প খুঁজেছেন। কেউ গেঞ্জির কলার তৈরির মেশিন কিনেছেন, কেউ পাওয়ার লুমে গিয়েছেন, কেউ অন্য শিল্পে যুক্ত হয়েছেন। বিশ্বজিৎ দে জানিয়েছেন, তাঁর বাবা তাঁতি ছিলেন। কিন্তু তাঁত বুনে পরিবারের আর্থিক উন্নতি না হওয়ায় তিনি পড়াশোনা করে গেঞ্জির কলার তৈরির ব্যবসায় আসেন। যদিও সুতোর দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই শিল্পেও আগের মতো লাভ নেই, তবু তাঁতের তুলনায় কিছুটা বেশি আয় হওয়ায় তিনি এখনও এই কাজ করছেন। অর্থাৎ তাঁতশিল্পের সংকট শুধু তাঁতিদেরই পেশা বদলাতে বাধ্য করেনি, একটি গোটা শিল্পাঞ্চলের পেশাগত চরিত্রও বদলে দিয়েছে।

পাওয়ার লুমও কি শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারল? (Begampur Handloom)
হাতে তাঁতের তুলনায় দ্রুত উৎপাদন এবং কিছুটা বেশি আয়ের আশায় একসময় বেগমপুরের অনেক তাঁতি পাওয়ার লুম বসিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আশাও পুরোপুরি সফল হয়নি। করোনার সময় লকডাউন ও বাজারের ধাক্কায় বহু পাওয়ার লুম ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকেই বাধ্য হয়ে মেশিন বিক্রি করে দেন। পিন্টু শী-র মতো কিছু ব্যবসায়ী এখনও পাওয়ার লুম চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যেখানে হ্যান্ডলুমে একটি শাড়ি তৈরি করতে প্রায় দু’দিন লাগে, সেখানে পাওয়ার লুমে একদিনে দুটি শাড়ি তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু এখানেও সমস্যা একই সুতোর দাম বাড়লে মজুরি কমে যায়। ১২ ঘণ্টা কাজ করেও শ্রমিকের আয় প্রায় ৪০০ টাকার মধ্যে আটকে থাকছে। বাজার অনুযায়ী ৫০০ টাকা মজুরি দেওয়া উচিত হলেও বাস্তবে তা সবসময় সম্ভব হচ্ছে না। ফলে যন্ত্রশিল্পও বেগমপুরের মানুষের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।
নেই আগের সেই সমবায় কাঠামোও (Begampur Handloom)
একসময় মহাজনী প্রথা বেগমপুরের তাঁতশিল্পকে সচল রাখত। বড়বাজারের ব্যবসায়ীদের অর্ডার অনুযায়ী তাঁতিরা কাপড় তৈরি করতেন। তাঁত সমবায়গুলিও ছিল শিল্পের অন্যতম ভরসা। আজ সেই ব্যবস্থার অনেকটাই হারিয়ে গেছে। লক্ষ্মীকান্ত দে-র আশঙ্কা আরও গভীর। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে ২০ বছর পরে হয়তো ‘বেগমপুরের তাঁত’ বলে আলাদা করে কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনি মনে করেন, সরকার যদি তাঁতিদের কাছ থেকে সরাসরি শাড়ি কিনে নেয় এবং মজুরি বা নির্দিষ্ট বেতনভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করে, তাহলে নতুন প্রজন্ম আবার এই পেশায় ফিরতে পারে।

একমাত্র হ্যান্ডলুম ক্লাস্টারই এখন আশার আলো (Begampur Handloom)
এই অন্ধকারের মধ্যেও বেগমপুরে একটি আশার জায়গা তৈরি করেছে হ্যান্ডলুম ক্লাস্টার। স্থানীয় তাঁতিদের জন্য এই ক্লাস্টার শুধু উৎপাদনের জায়গা নয়, বরং ঐতিহ্য ধরে রাখার শেষ আশ্রয়গুলির একটি। বেগমপুর হ্যান্ডলুম ক্লাস্টারের ম্যানেজার শৈল্য কুমার কুন্ডু মনে করেন, জি আই তকমা পাওয়ার ফলে বেগমপুরের আসল পণ্যকে আলাদা করে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। বাজারে নকল ‘বেগম শাড়ি’ থাকার অভিযোগ রয়েছে। জি আই ট্যাগ সেই প্রতারণা ঠেকাতে সাহায্য করতে পারে। তাঁতিদের আয় বাড়ানোর জন্য কেন্দ্রের উইভার সার্ভিস সেন্টারও যুক্ত হয়েছে। শুরু হয়েছে প্রশিক্ষণ। লক্ষ্য শুধু ঐতিহ্যবাহী শাড়ি তৈরি নয়, বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন ধরনের হ্যান্ডলুম পণ্য তৈরি করা।
শাড়ির গণ্ডি পেরিয়ে চুড়িদার, পাঞ্জাবি ও স্টোল (Begampur Handloom)
বেগমপুরের তাঁতশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এখন সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হচ্ছে পণ্যের বৈচিত্র্য। শুধু শাড়ির উপর নির্ভর না করে তসর, সিল্ক ও লিলেনের সুতো দিয়ে নতুন ধরনের কাপড় তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শাড়ির পাশাপাশি চুড়িদার ও পাঞ্জাবির কাপড়, মহিলাদের স্টোল এবং আধুনিক ডিজাইনের প্রিমিয়াম হ্যান্ডলুম কাপড় তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য একটাই বাজারকে বড় করা। কারণ শুধু ঐতিহ্য ধরে রাখলেই হবে না। ঐতিহ্যকে যদি বর্তমান বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা না যায়, তাহলে শিল্পীর হাতে তাঁত থাকলেও সেই তাঁত থেকে জীবিকা তৈরি হবে না।

৮০ থেকে ২৮০—তাঁতির সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা
বর্তমানে বেগমপুর হ্যান্ডলুম ক্লাস্টারের সঙ্গে যুক্ত তাঁতিদের সংখ্যা প্রায় ৮০। ভবিষ্যতে সেই সংখ্যা ২৮০-তে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।ক্লাস্টার কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, বেগমপুরকে শুধু ঐতিহ্যবাহী শাড়ির উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ হ্যান্ডলুম ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। চুড়িদার ও পাঞ্জাবির কাপড় তৈরি থেকে শুরু করে ডিজাইনারদের মাধ্যমে আধুনিক পোশাক তৈরি—সবকিছুকেই এই পরিকল্পনার অংশ করা হচ্ছে। কলকাতায় চাকরি করে যে পরিমাণ আয় সম্ভব, সেই ধরনের আয় যদি বেগমপুরেই তাঁতিরা করতে পারেন, তবেই নতুন প্রজন্মকে এই পেশায় ফেরানো সম্ভব বলে মনে করছেন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।
আরও পড়ুন: Mustafizur Rahman Rana: “ভাষণ নয়, কাজের হিসাব চাই?” সরকারের কাছে জবাব চাইছেন মুস্তাফিজুর রহমান
মাসে ৩০ হাজার টাকা আয়ের লক্ষ্য (Begampur Handloom)
সেন্ট্রাল উইভার সার্ভিস সেন্টারের কলকাতা শাখার ডেপুটি ডিরেক্টর লক্ষ্মণ চন্দ্র বসাক জানিয়েছেন, বেগমপুরের তাঁতশিল্পকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এরি সিল্ক, তসর ও লিলেনের মতো উন্নত মানের সুতো ব্যবহার করে নতুন ধরনের কাপড় তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। উদ্দেশ্য, হ্যান্ডলুম পণ্যের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁতিদের মজুরিও বৃদ্ধি করা। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন তাঁতি যাতে মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন। এর জন্য প্রয়োজন উন্নত প্রশিক্ষণ, আধুনিক ডিজাইন, উন্নতমানের কাঁচামাল এবং বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। সরকারি সহায়তায় তাঁতঘর ও তাঁত পাওয়ার পাশাপাশি আগামী দিনে চুড়িদার ও পাঞ্জাবির কাপড় তৈরির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ডিজাইনার এনে নতুন পণ্য তৈরি এবং কেন্দ্রের কাছ থেকে আর্থিক বরাদ্দ আনার উদ্যোগও চলছে।
জি আই তকমা কি বদলাতে পারবে বেগমপুরের ভবিষ্যৎ?
জি আই বা Geographical Indication তকমা কোনও পণ্যের ভৌগোলিক পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু শুধু তকমা পেলেই কোনও শিল্পের পুনর্জন্ম হয় না। বেগমপুরের ক্ষেত্রেও আসল প্রশ্ন এই স্বীকৃতি কি তাঁতির ঘরে বাড়তি আয় নিয়ে আসবে? নকল পণ্য থেকে আসল বেগমপুরের পণ্যকে আলাদা করা, ব্র্যান্ড তৈরি করা, বাজার সম্প্রসারণ, অনলাইন ও আধুনিক বিপণনের ব্যবস্থা করা এবং ক্রেতার কাছে সরাসরি পৌঁছনো এই প্রতিটি ধাপ সফল হলে তবেই জি আই তকমা অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। নইলে সেটি কাগজে থাকা একটি সম্মান হয়ে থাকবে, তাঁতির জীবনে তার প্রভাব খুব সামান্যই হবে।

শুধু প্রশিক্ষণ নয়, দরকার নিশ্চিত বাজার (Begampur Handloom)
তাঁতিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ হল নিশ্চিত বাজার। একজন তাঁতি যদি উন্নতমানের কাপড় তৈরি করেও ন্যায্য দাম না পান, তাহলে তিনি কেন সেই পেশায় থাকবেন? তাই সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, সমবায়কে শক্তিশালী করা, ক্লাস্টারের মাধ্যমে সরাসরি বিপণন, আধুনিক ডিজাইন, অনলাইন বিক্রি এবং বড় বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ সবকিছুকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁতিদের বক্তব্যেও বারবার উঠে এসেছে একই দাবি—শুধু তাঁত বাঁচানোর কথা নয়, তাঁতিকে বাঁচাতে হবে।
বেগমপুরের তাঁত বাঁচানো মানে একটি ইতিহাস বাঁচানো
বেগমপুরের তাঁতশিল্প কেবল শাড়ি তৈরির একটি পেশা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু পরিবারের ইতিহাস, বহু প্রজন্মের দক্ষতা এবং বাংলার নিজস্ব বয়নসংস্কৃতি। একসময় যে ঘরে ছ’টি তাঁত ছিল, সেখানে আজ একটি তাঁত চলছে। যে এলাকায় বাইরে থেকে ট্রেনে করে তাঁতিরা কাজ করতে আসতেন, সেখানে আজ শ্রমিকের অভাব। যে পেশা একসময় পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া হত, সেই পেশা থেকেই এখন সন্তানদের দূরে রাখতে চাইছেন অনেক বাবা-মা। কারণ তাঁরা জানেন শুধু ঐতিহ্য দিয়ে সংসার চলে না।

আরও পড়ুন: Suvendu Adhikari: অগ্নিকাণ্ডের পর বড় প্রশ্ন, মুখ্যমন্ত্রীর বার্তায় চাঞ্চল্য
পুনর্জাগরণের পথে বেগমপুর
বেগমপুরের তাঁতশিল্প এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে সুতোর দাম, কম মজুরি, বাজারের সংকট, পাওয়ার লুমের প্রতিযোগিতা এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ; অন্যদিকে জি আই তকমা, হ্যান্ডলুম ক্লাস্টার, সরকারি প্রশিক্ষণ এবং নতুন পণ্য তৈরির পরিকল্পনা। আগামী দিনে কোন দিকটি শক্তিশালী হবে, তার উপর নির্ভর করছে বেগমপুরের তাঁতের ভবিষ্যৎ। তাঁতিদের দাবি, তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা হোক। সরকার যদি সরাসরি পণ্য কেনে, মজুরি বৃদ্ধি করে এবং বাজারের সঙ্গে তাঁতিদের যুক্ত করে, তাহলে হয়তো আবার তাঁতের শব্দে মুখর হবে বেগমপুর। আর কেন্দ্রীয় উদ্যোগ সফল হলে শাড়ির গণ্ডি পেরিয়ে চুড়িদার, পাঞ্জাবি, স্টোল এবং আধুনিক হ্যান্ডলুম পোশাকের বাজার তৈরি হতে পারে। তখন হয়তো কলকাতামুখী হওয়ার বদলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের গ্রামেই জীবিকার নতুন সম্ভাবনা দেখতে পাবে।



