Last Updated on [modified_date_only] by Ananya Dey
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল : গত ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতীতে মেসির কনসার্ট ঘিরে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) দায়ের হয়েছিল তিন জনস্বার্থ মামলা। সোমবার হাইকোর্টে সেই মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষ হল। রায়দান স্থগিত রাখলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের ডিভিশন বেঞ্চ।
শুভেন্দু অধিকারীর আইনজীবীর দাবি (Calcutta High Court)
মামলার শুনানিতে (Calcutta High Court) মামলাকারী বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর আইনজীবী বিল্লদল ভট্টাচার্য্য আদালতে দাবি করেন, গত ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতীতে মেসির অনুষ্ঠানের জন্য আগস্ট মাস থেকেই প্রচার চালানো হয়। প্রচারে বলা হয়েছিল, মেসি মাঠে কিছুক্ষণ বল নিয়ে খেলবেন এবং সংবর্ধনাও গ্রহণ করবেন। এছাড়াও আরও বেশকিছু অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই হয়নি। দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু মেসিকে দিয়ে ৭০ ফুটের মূর্তি উন্মোচন করান এবং হোটেলে অর্থের বিনিময়ে ছবি তোলার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে মেসির মাঠে পৌঁছতে প্রায় ৪০ মিনিট দেরি হয়। সেই কারণে মেসিকে দ্রুত যুবভারতী ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হয়।
বিশাল আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ (Calcutta High Court)
আইনজীবী আদালতে (Calcutta High Court) আরও জানান, অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক শতদ্রু দত্ত পুলিশি জেরায় স্বীকার করেছেন যে, তিনি মাত্র ১৫০টি পাস দিয়েছিলেন। অথচ ৩০০টিরও বেশি পাস বিতরণ হয়। তাই আয়োজককে সামনে রেখে গোটা অনুষ্ঠানটি শাসক দলের মদতেই পরিচালিত হয়েছিল। টাকা দিয়ে টিকিট কেটে আসা দর্শকরা মেসিকে দেখতে না পেয়ে ক্ষুব্ধ হন। মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তর পাশাপাশিই ৮ জন দর্শককেও গ্রেফতার করা হয়েছে। অথচ শাসক দলের কোনও মন্ত্রীর নাম এফআইআরে নেই। পুলিশের এই এফআইআর ‘লোক দেখানো’ এবং প্রভাবশালীদের আড়াল করার হাতিয়ার বলে আদালতে দাবি করেন বিরোধী দলনেতার আইনজীবী। স্টেডিয়ামের ভিতরে জলের বোতল নিয়ে ঢোকা নিষিদ্ধ ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছিল। অথচ চড়া দামে স্টেডিয়ামে জলের বোতল, কোল্ডড্রিঙ্কস, খাবার বিক্রি হয়েছে। বিশাল আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে। মেসিকে ভারত সফরের জন্য আগাম ৬৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। সেই টাকা কোথা থেকে এল? সেই প্রশ্নও এদিন আদালতে তোলেন মামলাকারীর আইনজীবী।
মেসির মূর্তি বসানোর ঘটনায় প্রশ্ন
লেকটাউনে মেসির মূর্তি বসানো এবং মুখ্যমন্ত্রীর তদন্ত কমিটি নিয়েও এদিন আদালতে প্রশ্ন তোলেন বিরোধী দলনেতার আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘রাস্তার ধারে মূর্তি বানানো হয়েছে। শাসকদলের নেতা সেই মূর্তি বানালেন কীভাবে? ১২ টার সময় ঘটনা ঘটল, আর ১ টায় মুখ্যমন্ত্রী কমিটি গঠন করলেন। বিধানসভার অনুমতি ছাড়া কোনওভাবে কমিটি গঠন করা যায় না।’
ইডি তদন্তের দাবি
অপর মামলাকারী ময়ূখ বিশ্বাসের আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় এদিন গোটা ঘটনায় সিএজি অডিট এবং সিরিয়াস ফ্রড ইনভেস্টিগেশন অথোরিটি (এসএফআইও) কে দিয়ে তদন্তের দাবি জানান। আন্তর্জাতিক আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি আদালতে দাবি করেন, যেহেতু সমস্ত টিকিটে রাজ্য ক্রীড়া দফরের স্ট্যাম্প ছিল, তাই এই গোটা অনুষ্ঠানের দায়িত্ব রাজ্য সরকারেরই। তাই গোটা ঘটনায় ইডি তদন্তের দাবি তোলেন তিনি।
পুলিশের তদন্তের আগেই কী করে তদন্ত কমিটি গঠন ?
অপর মামলাকারীর আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য্য আদালতে বলেন মেসির নাম করে সাধারণ জনতার থেকে বিপুল টাকা তোলা হয়েছিল এখানে বিপুল আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে। তাই রাজ্যের পুলিশ এবং কোনও সংস্থা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করতে পারবে না বলেও আদালতকে জানান তিনি। পুলিশের তদন্তের আগেই কী করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হল, সেই প্রশ্ন উত্তোলন বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য্য।
রাজ্যের আইনজীবীর দাবি
রাজ্যের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতকে জানান, ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গোটা ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ দেন। প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এবং মুখ্যমন্ত্রী সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষ এবং মেসির কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন। মেসিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জেড ক্যাটাগরির সিকিউরিটি দিয়েছিল বলেও এদিন আদালতকে জানান তিনি। সেই সঙ্গে অনুষ্ঠানের দিন ভিতরে জলের বোতল নিয়ে যাবার অনুমতি ছিল না বলেও আদালতকে জানিয়েছেন রাজ্যের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, গত ৭ নভেম্বর এই অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তিনি আরও জানান, শুধু লজিস্টিক সাপোর্ট চাওয়া হয় মুখ্যসচিব ও ডিজির কাছে। ৪০০টি পাসের ব্যবস্থা হয়। তার মধ্যে ২৭টি ক্লোজ প্রক্সিমিটি পাস ও ৩৭৩ ডিউটি পাস। স্যোশাল মিডিয়া মনিটরিং সেলের সদস্যদের জন্য ৬টি পাস। আরও ৭৬টি পাস ক্লোজ প্রক্সিমিটিদের জন্য। তিনি জানান, মেসির থাকার কথা ছিল দুপুর ১.০৫ পর্যন্ত।
বিচারপতির প্রশ্ন
বিচারপতি পার্থসারথী সেন রাজ্যকে প্রশ্ন করেন, ‘এমন একটি অনুষ্ঠানে রাজ্য কি নিজে যাচাই করে পাস দিয়েছিল নাকি যা চাহিদা ছিল সেটাই বিতরণ করা হয়েছে?’ রাজ্য তার উত্তরে জানায়, ‘আমাদের কাছে সেই সময় ছিল না। তাহলে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হত। কোনও পাবলিক ইভেন্টের টিকিট সরকার বিক্রি করে না। তাই টিকিটের মূল্য কত সেটা সরকার ঠিক করে না।’
সুজিত বসুর মেসির মূর্তি বসানো ঘিরে প্রশ্ন
তখনই বিচারপতি সেন জানতে চান, ‘সুজিত বসু যে মূর্তি বসিয়েছেন, সেটা কি সরকারি জমিতে? না ব্যক্তিগত জমিতে বসানো হয়েছে? সরকারি জমিতে এভাবে ব্যক্তিগতভাবে কিছু বসানো যায়?’ রাজ্যের তরফে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার উত্তরে বলেন, ‘এটা আমরা জানি না। মুখ্যমন্ত্রী নিজে ক্ষমা চেয়েছেন। রাজ্য আর কি করতে পারে? মেসির সঙ্গে ছবি তুলতে ১০ লক্ষ টাকা চাওয়া হয়েছে, এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যে । রাজ্যের উচিৎ এই সব মামলাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। শতদ্রু দত্তর ২১ কোটি টাকা পাঁচটি অ্যাকাউন্টে রয়েছে। সব বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।’
আরও পড়ুন : Humayun Kabir: হুমায়ুনকে জাত তুলে অপমান! তারপরই বড় সিদ্ধান্ত!
রাজ্য পুলিশকেই কাঠগড়ায় তোলেন শতদ্রু দত্তর আইনজীবী
টিকিট বিক্রি প্রসঙ্গে শতদ্রু দত্তর আইনজীবী ইন্দ্রনীল রায় পুলিশকেই কাঠগড়ায় তোলেন। আদালতে তিনি বলেন, ‘যদি ৪০০ জনের বেশি কেউ মাঠে আসে তাহলে সেটা উদ্যোক্তাদের দোষ হতে পারে না। এটা পুলিশের দোষ। পুলিশকেও সেলফি তুলতে দেখা গিয়েছে। শ্রেয়া ঘোষাল বা অরিজিত সিঙের অনুষ্ঠানে লোক ৫০ হাজার টাকা দিয়েও টিকিট কেনে।’
রায়দান স্থগিত
এরপরই বিচারপতি পার্থসারথী সেন বলেন, “টিকিটের এত দামের পরও দুটো প্রশ্ন থেকে যায়। এক, ব্ল্যাক হয়েছে আর এত টাকা দিয়েও কেউ মেসিকে দেখতে পায়নি।’
সব পক্ষের সওয়াল-জবাব শেষে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ রায়দান স্থগিত রাখলেন। আদালত কী নির্দেশ দেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে সকলে।


