Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: তৃতীয় দিনের জনতার দরবারে মানুষের ঢল, মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রীর ‘জনতার দরবার’-এর তৃতীয় দিনে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো (Janatar Dorbar)। কেউ এসেছেন দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার অভিযোগ নিয়ে, কেউ দুর্নীতি ও স্বজনপোষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে, আবার কেউ এসেছেন নিজেদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার আশায়। এই জনতার দরবার যেন একদিকে মানুষের আশা-ভরসার কেন্দ্র, অন্যদিকে বিগত শাসনকালের নানা অভিযোগ ও বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

সঙ্গীত জগতে ‘সিন্ডিকেট রাজ’-এর অভিযোগ (Janatar Dorbar)
জনতার দরবারে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দোলা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে সাংস্কৃতিক জগতেও গড়ে উঠেছিল এক ধরনের ‘সিন্ডিকেট রাজ’। শিল্পীদের দাবি, সরকারি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। তৎকালীন শাসকদলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা না থাকলে বহু যোগ্য শিল্পীকে সরকারি মঞ্চে গান গাওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো না। এমনকি অভিযোগ উঠেছে যে, সরকারি অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার পরও শিল্পীদের প্রাপ্য সম্মানী পুরোপুরি হাতে পৌঁছাত না। বিভিন্ন স্তরে ‘কাটমানি’ দেওয়ার চাপ থাকত বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা। ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক শিল্পী প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাননি, কারণ প্রতিবাদ করলে ভবিষ্যতে কাজ হারানোর আশঙ্কা ছিল। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার দাবিও তুলেছেন তাঁরা।

পনেরো বছরের বিচারহীনতার যন্ত্রণা (Janatar Dorbar)
জনতার দরবারে উপস্থিত ছিলেন নিহত পরিবেশকর্মী ও তৃণমূল নেতা তপন দত্তের স্ত্রী প্রতিমা দত্ত। তাঁর আগমন ছিল আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১১ সালের ৬ মে হাওড়ার বালিতে জলাভূমি রক্ষার আন্দোলনের অন্যতম মুখ তপন দত্তকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরিবার অভিযোগ তোলে যে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের যোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন সিআইডি তদন্ত চললেও প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয় পরিবার। পরবর্তীতে কলকাতা হাইকোর্ট সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয় এবং সেই নির্দেশ ডিভিশন বেঞ্চও বহাল রাখে। তবুও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিচার সম্পূর্ণ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিমা দত্ত। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তাঁর একটাই আবেদন স্বামীর হত্যার প্রকৃত বিচার।
সন্তানদের চাকরির দাবিতে প্রতিবাদ (Janatar Dorbar)
জনতার দরবারে উপস্থিত হন কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারানো একাধিক পুলিশকর্মীর পরিবারের সদস্যরাও। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কর্মরত অবস্থায় কোনো সরকারি কর্মীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সহানুভূতিমূলক ভিত্তিতে চাকরি দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে সেই চাকরি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে কিংবা আবেদনকারীরা প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে পড়ে বঞ্চিত হচ্ছেন। মৃত পুলিশকর্মীদের সন্তানদের দাবি, তাঁদের পরিবার দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে আত্মত্যাগ করেছে। তাই চাকরির ক্ষেত্রে তাঁদের প্রাপ্য অধিকার দ্রুত নিশ্চিত করা হোক।
সন্দেশখালির ঘটনার বিচার চান প্রাক্তন বিজেপি নেতা
সন্দেশখালির তৎকালীন বিজেপি ব্লক সভাপতিও জনতার দরবারে উপস্থিত হন। তাঁর অভিযোগ, শেখ শাহজাহান এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের দ্বারা তিনি ব্যক্তিগতভাবে আক্রান্ত ও প্রতারিত হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে এই ঘটনার সুবিচার না পাওয়ার কারণে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সন্দেশখালি ইস্যু ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত। সেই প্রেক্ষাপটে এই অভিযোগ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

জমি দখল থেকে আর্থিক প্রতারণা (Janatar Dorbar)
শুধু রাজনৈতিক বা আলোচিত ঘটনাই নয়, জনতার দরবারে এসেছেন বহু সাধারণ মানুষও। অনেকের অভিযোগ, তাঁদের জমি জোর করে দখল করে নেওয়া হয়েছে। কেউ আর্থিক প্রতারণার শিকার হয়েছেন, আবার কেউ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অভিযোগকারীদের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের কিছু কর্মীও রয়েছেন। তাঁদের দাবি, দলের ভেতরের একাংশের দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সাধারণ মানুষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তেমনি বহু দলীয় কর্মীকেও নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
আরও পড়ুন: Pahalgam Pak: পহেলগাম হামলায় পাক যোগ! ৯/১১ হামলায় যুক্ত ব্যাঙ্কের নাম এল তদন্তে
জনতার দরবার কি মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল?
মঙ্গলবারের জনতার দরবারে আসা অভিযোগগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে দুর্নীতি, বঞ্চনা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিচারহীনতার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমিয়ে রেখেছে। সাংস্কৃতিক জগতের শিল্পী থেকে শুরু করে নিহত রাজনৈতিক কর্মীর পরিবার, মৃত পুলিশকর্মীদের সন্তান, রাজনৈতিক হিংসার শিকার ব্যক্তি কিংবা জমি হারানো সাধারণ মানুষ সবাই এক মঞ্চে এসে নিজেদের কথা তুলে ধরেছেন।



