Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: দেবী কালিকা শক্তির প্রতীক। তাঁর অসংখ্য রূপের মধ্যে শ্মশানকালী সর্বাধিক ভয়ঙ্কর (kali Puja 2025), অথচ সর্বাধিক গূঢ়তত্ত্বে ভরা। শাস্ত্রমতে, এমন অনেক রূপই আছে যা গৃহস্থ জীবনের জন্য নয় কারণ, সেই রূপের আরাধনা সীমিত থাকে তান্ত্রিক ও বীরাচারী সাধকদের কাছে। শ্মশানকালী সেই রূপগুলির অন্যতম। ‘কালীমাত্রেই শ্মশানের দেবী’ এই বাক্যটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে তন্ত্রতত্ত্বের গভীর ইঙ্গিত। শ্মশান, অর্থাৎ ‘মৃত স্থান’, যেখানে জড়ের পরিণতি ঘটে, সেখানেই আদ্যাশক্তি প্রকাশিত হন সর্বাধিক প্রখর রূপে।

শ্মশান কেন দেবীর প্রিয় স্থান (kali Puja 2025)
শ্মশান শুধুমাত্র মৃত্যুর স্থান নয়, বরং জীবনের চূড়ান্ত সত্যের প্রতীক। সেখানে গিয়ে মানুষ দেহের নশ্বরতার উপলব্ধি করে। সেই কারণেই শ্মশান দেবীর প্রিয় স্থান। কালী পুজো করার অর্থ, মানুষ তার জীবনের শেষ পরিণতিতে মায়ের কোলে আশ্রয় পায়, এবং সেই আশ্রয়ে মেলে মুক্তি ও শান্তি। শ্মশান, মন্দিরের মতোই পবিত্র। এখানে শাস্ত্রের জ্ঞান বাস্তবে পরিণত হয় “যা ক্ষয়িষ্ণু, তাই অনিত্য” এই তত্ত্বের জীবন্ত রূপ শ্মশান। তাই বলা হয়, শ্মশানই মা কালীর আসল আবাসস্থল।
দেবীর রূপ ও বৈশিষ্ট্য (kali Puja 2025)
আদ্যাশক্তি মহামায়ার আটটি প্রধান রূপের একটি হল শ্মশানকালী। এই আটটি রূপ হল দক্ষিণাকালী, সিদ্ধকালী, উগ্রকালী, গুহ্যকালী, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী এবং চামুণ্ডাকালী। শ্মশানকালীর রূপ ভয়ঙ্কর করালবদনা, মুক্তকেশী, চতুর্ভুজা, নৃমুণ্ডমালা বিভূষিতা। তাঁর দেহ শ্যামবর্ণ, ত্রিনেত্রা, উন্নতদন্তা এবং শবরূপী মহাদেবের হৃদয়ে অধিষ্ঠিতা। তাঁর গলায় ঝুলছে পঞ্চাশটি মুণ্ডমালা, যা চেতনশক্তি ও সৃষ্টি তরঙ্গের প্রতীক। আলুলায়িত কেশ তাঁর প্রচণ্ড শক্তির প্রকাশ। বিবসনা রূপে তিনি অসীমের প্রতীক—কারণ অসীমকে কোনো বসনে সীমাবদ্ধ করা যায় না। দেবীর প্রসারিত জিহ্বা ‘খেচরিমুদ্রা’-র প্রতীক, যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভারসাম্য রক্ষা করে।
দর্শনের আলোয় কালী (kali Puja 2025)
স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘Kali the Mother’-এ লিখেছেন, “কালী করাল নাম তোর, মৃত্যু তোর নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে, তোর ভীমচরণ নিক্ষেপে প্রতি পদে ব্রহ্মাণ্ড বিকাশে।” এই রূপেই তিনি মৃত্যু, ধ্বংস ও সৃষ্টির মহাশক্তি। কাজী নজরুল ইসলাম গেয়েছেন “কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন” অর্থাৎ, অন্ধকারের মধ্যেই তিনি জ্ঞানের আলো। রামপ্রসাদ সেন থেকে কমলাকান্ত পর্যন্ত অসংখ্য শাক্ত কবি কালী-তত্ত্বকে প্রকাশ করেছেন ভক্তি ও দর্শনের মিলনে।
শাক্তধর্ম ও তন্ত্রতত্ত্ব (kali Puja 2025)
শাক্ত মতে, দেবীই পরব্রহ্ম নারীই শক্তির আধার, পুরুষ নয়। শাক্তধর্মে সমস্ত দেবদেবতা আসলে এই এক শক্তিরই বিভাজন। তন্ত্রসাধনাই শাক্তধর্মের কেন্দ্র। তন্ত্র ও শাক্ত সাধনা কার্যত এক ও অভিন্ন। সাংখ্য দর্শন ও বৈদান্তিক মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হলেও, শাক্ত দর্শনের মূল তত্ত্ব এক “চরম সত্তা বা শিব ও শক্তি, দুই নয় এক।” এই একতাই বিশ্বসৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের মূল কারণ।
গৃহস্থের পক্ষে নিষিদ্ধ রূপ (kali Puja 2025)
ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজে বলেছিলেন “গৃহস্থবাড়িতে শ্মশানকালীর ছবি রাখাও অনুচিত।” কারণ এই উপাসনা অত্যন্ত গূঢ়, এবং উপযুক্ত তন্ত্রগুরু ছাড়া তা বিপজ্জনক। এই দেবী রুদ্ররূপী, খড়্গধারী, শৃগালবাহনা, উলঙ্গিনী এবং মদ্যপানরতা। তিনি ‘পঞ্চ ম-কার’ (মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন)-এর দ্বারা পূজিতা হন। এই কারণেই যুগে যুগে বীরাচারী সাধক, তান্ত্রিক এবং এমনকি ডাকাতরাও কার্যসিদ্ধির জন্য শ্মশানকালী উপাসনা করেছেন কখনও নরবলিসহ।
দেবীর ধ্যানরূপ (kali Puja 2025)
তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ তাঁর বৃহৎ তন্ত্রসার-এ শ্মশানকালীর ধ্যানরূপ এভাবে বর্ণনা করেছেন, “শ্মশানকালী দেবীর দেহ ঘন কালো, চক্ষু রক্তপিঙ্গল, দেহ ক্ষীণ, চুল এলোমেলো, এক হাতে সদ্য কাটা মানবমুণ্ড, অন্য হাতে মদ্যপাত্র। হাস্যমুখে তিনি নরমাংস ভক্ষণ করছেন। উলঙ্গিনী ও মদ্যপানরত অবস্থায় দেবী শ্মশানে অধিষ্ঠিতা।” এই রূপেই তিনি জীবন-মৃত্যুর সংযোগ ধ্বংসের মধ্যেই নতুন সৃষ্টির সূচনা।
আরও পড়ুন: Historical Story of Kali Puja: কেন মা কালীর রূপ এত ভয়ংকর জানা আছে?
শ্মশানকালী পূজার ঐতিহ্য
বিভিন্ন প্রান্তে এখনও শ্মশানকালীর পূজা হয় ভিন্ন ভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানসহ। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বীরভূমের দুবরাজপুরের শ্মশানকালী মন্দির। প্রায় হাজার বছরের পুরনো এই মন্দিরে দেবীর বেদী ১০৮টি নরমুণ্ড দিয়ে গঠিত। এখানে পূজার সময় কেউ মন্দিরে প্রবেশ করতে পারেন না; পূজারীকে বস্ত্রহীন হয়ে পুজো করতে হয়। পুজোর সময় শৃগালের উপস্থিতি শুভ লক্ষণ বলে মানা হয়। কোথাও কাঁটার আসনে বসে পুজো করতে হয়, কোথাও আবার মায়ের ঘট ভরার সময় শৃগাল দেখা দেয়। প্রতিটি স্থানে আলাদা মিথ, অলৌকিক শক্তির গল্প, এবং তন্ত্রসাধনার এক অদ্ভুত গূঢ় আবহ জড়িয়ে আছে।



