Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: দক্ষিণবঙ্গের প্রাচীনতম কালীমন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম হল বর্ধমান জেলার কাঞ্চননগরের কঙ্কালেশ্বরী কালীমন্দির (Kankaleshwari Temple)। এখানে বিরাজ করছেন এক অনন্য দেবীমূর্তি মা কঙ্কালেশ্বরী, যার গাত্রে খোদাই করা আছে মানবদেহের সমস্ত অস্থি, শিরা, উপশিরা। বিজ্ঞানীরাও আজ বিস্ময়ে তাকান এই অসামান্য শৈল্পিক নিদর্শনের দিকে। এই দেবীমূর্তি সাধারণ কালীপ্রতিমার মতো নন। আমরা যেখানে চারহাত বিশিষ্ট কালীদেবী দেখি, সেখানে কঙ্কালেশ্বরী দেবী অষ্টভুজা চামুণ্ডা রূপে বিরাজমান। সাত ফুট উচ্চ ও তিন ফুট প্রশস্ত এই পাথরের মূর্তি একদিকে দেবীর রুদ্র রূপ প্রকাশ করে, অন্যদিকে প্রাচীন ভারতের শল্যচিকিৎসা ও শারীরস্থান জ্ঞানের আশ্চর্য নিদর্শন বহন করে।

কঙ্কালেশ্বরী নামের উৎপত্তি (Kankaleshwari Temple)
এই দেবীর নামকরণই তাঁর রূপের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মূর্তির গাত্রে মানব কঙ্কালের প্রতিটি হাড় ও শিরা-উপশিরা খোদাই করা, তাই দেবী পরিচিত ‘কঙ্কালেশ্বরী’ নামে। পুরাণ মতে, এই দেবী চামুণ্ডা রূপিণী কালী, যিনি মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের প্রতীক।শাস্ত্রমতে, চামুণ্ডা দেবী সৃষ্টি ও বিনাশ দুই শক্তির সমন্বয়। কঙ্কালেশ্বরীর রূপে সেই মহাশক্তিরই এক অদ্ভুত প্রকাশ, যা জীবনের ক্ষয় ও পুনর্জন্মের প্রতীকী ব্যাখ্যা দেয়।
আবিষ্কারের ইতিহাস জানেন? (Kankaleshwari Temple)
বাংলা সন ১৩২৩, দামোদর নদীর তীরে এই অদ্ভুত মূর্তিটি পাওয়া যায়। কথিত আছে, কমলানন্দ পরিব্রাজক নামে এক সাধক স্বপ্নাদেশ পান “দামোদর তীরে এক মহাশক্তির প্রতিমা লুকিয়ে আছে, তাকে উদ্ধার করো।” সেই সাধক নদীতীরে খনন করে এই পাথরের দেবীমূর্তিটি উদ্ধার করেন এবং পরে কাঞ্চননগরে মন্দির নির্মাণ করে দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
দেবীর বিরল শৈল্পিক গঠন (Kankaleshwari Temple)
মূর্তিটি একখণ্ড পাথর থেকে খোদাই করা, যা নিজেই এক শিল্পকীর্তি। দেবী শায়িত শিবের নাভি থেকে উৎপন্ন পদ্মের ওপর আসীন। মূর্তিতে প্রতিটি অস্থি, শিরা, পেশি সূক্ষ্ম নিখুঁতভাবে খোদাই করা, যা দেখে আধুনিক শল্যচিকিৎসকরাও বিস্মিত।
ইতিহাসবিদরা বলেন, মানবদেহের প্রতিটি শারীরস্থানিক অংশ এখানে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা প্রমাণ করে প্রাচীন ভারতে মানবদেহ নিয়ে গভীর গবেষণা চলত, এবং সেই সময়ের শিল্পীরা সেই জ্ঞানকে ভাস্কর্যে রূপ দিতে পারতেন।

প্রাচীনত্ব ও যুগনির্ধারণ (Kankaleshwari Temple)
পুরাতত্ত্ববিদদের মতে, কঙ্কালেশ্বরী মূর্তি বৌদ্ধ বা পাল যুগের, অর্থাৎ অন্তত দু’হাজার বছর প্রাচীন। সেই সময় ভারতে শল্যচিকিৎসা ও শরীরতত্ত্ব বিষয়ে অসাধারণ উন্নতি হয়েছিল। সুশ্রুত সংহিতা-য় যেমন দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নিখুঁত বিবরণ পাওয়া যায়, তেমনই এই দেবীমূর্তিও সেই জ্ঞানের এক বাস্তব প্রতিরূপ বলে মনে করেন গবেষকরা।

মন্দিরের বর্তমান রূপ (Kankaleshwari Temple)
এক সময় এই পবিত্র মন্দিরচত্বর ঘন জঙ্গল ও ঝোপঝাড়ে ঢাকা ছিল। এখন তা পরিণত হয়েছে এক পরিচ্ছন্ন ও মনোরম তীর্থক্ষেত্রে। চারপাশে পাকা রাস্তা, ফুলের বাগান, এবং সাজানো জলাশয় সব মিলিয়ে এক শান্ত পরিবেশ। ভক্তদের জন্য বিশ্রামের আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিদিন মাত্র দশ টাকার কুপনে মায়ের অন্নভোগ গ্রহণ করা যায়। বিশাল ভোগঘরে প্রতিদিন শতাধিক মানুষ ভোগ গ্রহণ করেন।
কঙ্কালেশ্বরীর মহোৎসব (Kankaleshwari Temple)
দীপান্বিতা অমাবস্যা এলে এখানে ভক্তসমুদ্র উপচে পড়ে। সারারাত ধরে ভক্তরা ভোগ গ্রহণ করেন, কীর্তন হয়, আরতি হয়, ও মায়ের জয়ধ্বনি ওঠে। এই পুজোয় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পুরুষ-মহিলা, গবেষক, এমনকি বিদেশি পর্যটকও আসেন।
আরও পড়ুন: Rashmika-Vijay Deverakonda: রশ্মিকার হাতে জ্বলজ্বলে হিরের আংটি, বাগদানে সিলমোহর?
বিজ্ঞানের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার সংযোগ
কঙ্কালেশ্বরী কালীমন্দির কেবল একটি তীর্থক্ষেত্র নয়, এটি এক বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন। এই মূর্তি প্রমাণ করে যে প্রাচীন ভারতে ধর্ম ও বিজ্ঞান একে অপরের পরিপূরক ছিল। মানব শরীরের শারীরস্থান ও দেবী তত্ত্বের মিলন এখানে ঘটেছে অপূর্বভাবে যেন দেবী নিজেই জীবন ও মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনের রূপক।



