Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: শান্তিনিকেতনের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হল। প্রয়াত হলেন নন্দলাল বসুর নাতি সুপ্রবুদ্ধ সেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর (Nandalal Bose)। সোমবার সকাল ৭টা ১৫ মিনিট নাগাদ দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে রবিবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকালে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি প্রয়াত হন। তাঁর মৃত্যুতে শুধু পরিবার নয়, শোকস্তব্ধ শান্তিনিকেতন, শিল্প-সংস্কৃতির জগৎ এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী।

কে সুপ্রবুদ্ধ সেন ছিলেন (Nandalal Bose)
তিনি ছিলেন ভারতীয় শিল্পকলার অন্যতম মহীরুহ নন্দলাল বসু-র ছোট মেয়ে যমুনা সেনের পুত্র। জন্মসূত্রে তিনি এমন এক পরিবারের সদস্য, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। তবে পারিবারিক ঐতিহ্যের আড়ালে নিজস্ব জীবনদর্শন ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমেই তিনি পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন। শান্ত, বিনয়ী এবং সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তি হিসেবে শান্তিনিকেতনের মানুষ তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে চিনতেন।
শিক্ষাজীবন থেকে কর্মজীবন (Nandalal Bose)
১৯৫৪ সালে শান্তিনিকেতনের পাঠভবন থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন সুপ্রবুদ্ধ সেন। এরপর বিশ্বভারতী-তে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ডিভিসি বা দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন-এ কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ৩২ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে সেখানে চাকরি করেন। কর্মজীবনের ব্যস্ত অধ্যায় শেষ করে ১৯৯৬ সালে অবসর গ্রহণের পর তিনি স্থায়ীভাবে শান্তিনিকেতনের পৈতৃক বাড়িতে ফিরে আসেন। এরপর জীবনের বাকি সময় তিনি শান্তিনিকেতনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।

একজন সচেতন নাগরিক (Nandalal Bose)
সুপ্রবুদ্ধ সেন ছিলেন একজন সচেতন নাগরিক। শান্তিনিকেতনে ফিরে আসার পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনে তিনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি তাঁর এই আস্থা ও দায়িত্ববোধ ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে সম্প্রতি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত এক জটিলতার মুখে পড়েন তিনি। সুপ্রবুদ্ধ সেন, তাঁর স্ত্রী দীপা সেন এবং পরিচারক চক্রধর নায়কের নাম ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ তালিকায় চলে যাওয়ায় বিষয়টি আলোচনায় আসে। দীর্ঘদিনের ভোটার হওয়া সত্ত্বেও এই পরিস্থিতি অনেকের মধ্যেই বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিল।
কে ছিলেন নন্দলাল বসু (Nandalal Bose)
সুপ্রবুদ্ধ সেনের জীবনকে বুঝতে গেলে তাঁর মাতামহ নন্দলাল বসুর অবদান স্মরণ করা জরুরি। ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলার ইতিহাসে নন্দলাল বসুর নাম এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত। তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন না, বরং ভারতীয় শিল্পভাবনার পুনর্জাগরণের অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক।
ভারত জুড়ে শিল্প-অনুসন্ধান (Nandalal Bose)
কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি পাটনা, রাজগির, বুদ্ধগয়া, বারাণসী, দিল্লি, আগ্রা, মথুরা, বৃন্দাবন এবং এলাহাবাদ ভ্রমণ করেন। উত্তর ভারতের শিল্প ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় তাঁর শিল্পভাবনাকে সমৃদ্ধ করে। পরবর্তীকালে পুরী থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত সমগ্র দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ করেন। বিশেষত কোণারকের সূর্যমন্দির তাঁর শিল্পচিন্তায় গভীর প্রভাব বিস্তার করে।

বাঘ গুহাচিত্র পুনরুদ্ধারে ঐতিহাসিক ভূমিকা
১৯২১ সালে মধ্যপ্রদেশের ঐতিহাসিক বাঘ গুহার ক্ষয়প্রাপ্ত চিত্রসম্ভার পুনরুদ্ধারের গুরুদায়িত্ব তাঁর হাতে অর্পিত হয়। এই কাজ ভারতীয় প্রাচীন শিল্প ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতনের সঙ্গে অটুট সম্পর্ক
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত ‘বিচিত্রা সংঘ’-এ ১৯১৬ সালে শিল্পকলার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন নন্দলাল বসু। পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনের কলাভবনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভারতীয় শিল্পশিক্ষার ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে। তাঁর হাতে গড়ে ওঠে এমন এক শিল্পধারা, যেখানে ভারতীয় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।
লোকশিল্পকে জাতীয় মঞ্চে তুলে ধরা
১৯৩৫ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত পরপর তিন বছর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনের শিল্প প্রদর্শনীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বিশেষত ১৯৩৭ সালের হরিপুরা কংগ্রেসে তাঁর নির্মিত ৮৩টি ধারাবাহিক লোকচিত্র ইতিহাস সৃষ্টি করে। ‘হরিপুরা পট’ নামে পরিচিত এই শিল্পকর্মসমূহ ভারতীয় লোকজ সংস্কৃতিকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা পালন করে।
সংবিধানের অলংকরণে শিল্পীর তুলির ছোঁয়া
ভারতের সংবিধানের সচিত্র সংস্করণ অলংকরণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন নন্দলাল বসু। ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসকে চিত্ররূপে তুলে ধরে তিনি সংবিধানকে এক অনন্য শিল্পনিদর্শনে পরিণত করেন। আজও ভারতের সংবিধানের সেই অলংকৃত সংস্করণ শিল্প ও রাষ্ট্রচেতনার এক বিরল মেলবন্ধনের উদাহরণ।

দেয়ালচিত্রে বিশ্বজোড়া খ্যাতি
শান্তিনিকেতন, শ্রীনিকেতন এবং বরোদার কীর্তিমন্দিরে তাঁর নির্মিত দেয়ালচিত্র তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। ১৯৪৩ সালে বরোদার মহারাজার কীর্তিমন্দির অলংকরণের দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তাঁর শিল্পসাধনা নতুন মাত্রা লাভ করে।
শিল্পের বহুমাত্রিক প্রকাশ (Nandalal Bose)
রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-এর চিত্রাঙ্কনও তাঁরই সৃষ্টি। তাঁর আঁকা ‘অন্নপূর্ণা’, ‘সতী’, ‘দার্জিলিং’ প্রভৃতি চিত্রকর্ম ভারতীয় শিল্পকলার অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। জীবনের শেষ পর্বে তিনি তুলি-কালি এবং ছাপচিত্রের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেন এবং সেখানেও অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় রেখে যান।
আরও পড়ুন: Rituparno Ghosh: বাংলা সিনেমার পর্দায় নারীর যন্ত্রণা ‘বাড়িওয়ালি’ থেকে ‘উত্তরা’র বেঁধে
এক যুগের ইতি
সুপ্রবুদ্ধ সেন হয়তো নিজে শিল্পী হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন ভারতীয় শিল্প-ঐতিহ্যের এক জীবন্ত উত্তরাধিকার। তাঁর জীবন জুড়ে ছিল শান্তিনিকেতনের মূল্যবোধ, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং নাগরিক সচেতনতার অনন্য মেলবন্ধন। তাঁর প্রয়াণে শুধু একটি পরিবারের নয়, শান্তিনিকেতনের এক ঐতিহাসিক স্মৃতিবাহকের অবসান ঘটল। নন্দলাল বসুর শিল্পঐতিহ্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত এক প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে সুপ্রবুদ্ধ সেনের নাম ভবিষ্যতেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।



