Last Updated on [modified_date_only] by Ananya Dey
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল : ভয়ঙ্কর সুন্দর। নীল আকাশের নিচে বরফে মোড়া রূপোলি শৃঙ্গ লাংটাং লিরুং (Langtang Lirung) কি নিছকই এক প্রাকৃতিক বিস্ময়, নাকি নেপালের বুকে বারবার ফিরে আসা এক ভয়ঙ্কর অভিশাপ? ২০১৫ সালের বিধ্বংসী তুষারধসের পর ২০২৬-এ ফের হিমবাহ ধসে প্রলয়ঙ্করী আকস্মিক বন্যা (Nepal flash flood)। কেন বারবার রক্তপিপাসু হয়ে উঠছে হিমালয়ের এই শৃঙ্গ?
সৌন্দর্যের আড়ালে মৃত্যুর হাতছানি ? (Nepal flash flood)
পাহাড় কি কখনও প্রতিশোধ নেয়? নাকি প্রকৃতির নিয়মেই একের পর এক বিপর্যয় নেমে আসে মানুষের জীবনে? নেপালের লাংটাং লিরুং—বরফে মোড়া এক অপূর্ব শৃঙ্গ। কাঠমান্ডুর ব্যস্ত শহর ছাড়িয়ে মাত্র ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে দাঁড়িয়ে থাকা ৭,২৪৫ মিটারের এই শৃঙ্গটি পথচলতি পর্যটকদের নিঃশব্দে হাতছানি দেয়। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের ইতিহাস। ২০১৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর ফের ২০২৬ সালে হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যা। প্রশ্ন উঠছে, লাংটাং লিরুং কি ক্রমশ আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে?
প্রথম বিপর্যয়: ২০১৫
২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল। স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৫৬ মিনিট। ৭.৮ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে নেপাল (Nepal)। কম্পনের অভিঘাতে লাংটাং লিরুংয়ের ঢাল থেকে নেমে আসে বিশাল তুষারধস। বরফ, পাথর আর মাটির সেই ধাক্কায় মাত্র কয়েক মুহূর্তে বদলে যায় গোটা উপত্যকার চেহারা। সময় লেগেছিল ঠিক ৬৭ সেকেন্ড। লাংটাং গ্রাম কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বরফে চাপা পরে প্রাণ হারান তিনশোরও বেশি মানুষ।
দ্বিতীয় বিপর্যয়: ২০২৬
২০১৫ সালের সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই মানুষ আবার নতুন করে ঘর বেঁধেছিল। কিন্তু ঠিক এগারোটি বছর পর, ২০২৬ সালের ২৬ অগস্ট। লাংটাং লিরুংয়ের উত্তর ঢালে শুরু হল দ্বিতীয় প্রাণঘাতী তান্ডবের খেলা। লাংটাং লিরুংয়ের উত্তর ঢালে প্রায় ৫,২০০ মিটার উঁচুতে থাকা বিশাল এক হিমবাহ ও পাহাড়ি পাথর আচমকাই একসঙ্গে চুরমার হয়ে ভেঙে পড়ে। সেই প্রলয়ঙ্করী ধস ২,০০০ মিটার নিচে আছড়ে পড়ে লেন্দে নদীর বুকে, যার অভিঘাতে সৃষ্টি হয় ৫.২ মাত্রার তীব্র ভূকম্পন। বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, তৈরি হয় এক অস্থায়ী কৃত্রিম হ্রদ। কিন্তু জলের প্রবল চাপে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে মুহূর্তেই ধেয়ে আসে ঘোলা জলের সর্বগ্রাসী বান। মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে নদীর জলস্তর কয়েক মিটার বেড়ে লেন্দে নদী থেকে সেই উন্মত্ত স্রোত আছড়ে পড়ে ভোটকোশি ও ত্রিশূলি নদীতে। চিনের গিরং বন্দর থেকে নেপালের রাসুয়া হয়ে ত্রিশূলি উপত্যকা—টানা ১০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বাড়িঘর, সেতু, পাহাড়ি রাস্তা এবং বহু নিরীহ মানুষকে এক নিমেষে খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায় এই বিধ্বংসী জলস্রোত।
কেন লাংটাং লিরুং অঞ্চলে বারবার বিপর্যয়?
ভূবিজ্ঞানীদের মতে, লাংটাং লিরুংয়ের অভ্যন্তরে চলছে তীব্র ভূতাত্ত্বিক অস্থিরতা। কোটি কোটি বছর ধরে টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত ধাক্কায় লাংটাং লিরুং ক্রমাগত উঁচুতে উঠছে, যার ফলে এর ঢাল অত্যন্ত খাড়া ও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে ।
এর পাশাপাশি বিশ্বউষ্ণায়নের প্রভাবে গলতে শুরু করেছে শতাব্দী প্রাচীন বরফ যা মাটিকে এতদিন আঠার মতো ধরে রেখেছিল। ফলে পাহাড়ের ভিত আলগা হয়ে যাচ্ছে, তার কঙ্কাল খসে পড়ছে। ফলে হিমবাহ ধস, ভূমিধস এবং হঠাৎ বন্যার মতো বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে।
আরও পড়ুন : Nepal Flood Death: মর্গে জায়গা নেই! নেপালে শনাক্তহীন মৃতদেহ কবর দেওয়া শুরু
লাংটাং লিরুং তাই এখন আর শুধু একটি বরফঢাকা পাহাড় নয়। এটি হিমালয়ের বদলে যাওয়া বাস্তবতারও প্রতীক। ২০১৫-এর ধ্বংসের স্মৃতি এখনও তাজা। তার পরেও ফের বিপর্যয়। প্রকৃতির প্রতিশোধ থামানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু বিজ্ঞান, আগাম সতর্কতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সঠিক নজরদারি—এই তিন অস্ত্রই পারে প্রাণহানি কমাতে।


