Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: অনুষ্কা জোয়ারদার: সকাল থেকেই উত্তপ্ত টলিপাড়া। রাধা স্টুডিও চত্বরে দেখা গেল সদস্যদের মধ্যে তুমুল বচসা ও হাতাহাতির ঘটনা (Papiya Adhikari)। একপক্ষ অন্যপক্ষকে ‘পাপিয়া অধিকারীর লোক’ বলে কটাক্ষ করছে, আবার পাল্টা অভিযোগ উঠছে ‘স্বরূপ বিশ্বাস ও অরূপ বিশ্বাসের গোষ্ঠী’ নিয়ে। এই উত্তেজনার মাঝেই রাধা স্টুডিওতে বৈঠকে বসেন অভিনেত্রী ও সংগঠক পাপিয়া অধিকারী। সেখানে তিনি টলিউডের বর্তমান পরিস্থিতি, শিল্পের উন্নয়ন এবং যোগ্য শিল্পীদের কাজের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, সেই বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।

দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ (Papiya Adhikari)
বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু শিল্পী, টেকনিশিয়ান ও কলাকুশলীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের অসন্তোষ জমা হচ্ছিল। অভিযোগ ছিল, চলচ্চিত্র জগতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। বিশেষ করে ফেডারেশন এবং তার নেতৃত্বকে ঘিরে নানা বিতর্ক বহুবার প্রকাশ্যে এসেছে। শিল্পের একাংশের দাবি, কে কোন ছবিতে কাজ করবেন, কোন প্রযোজকের ছবি শুরু হবে, কোন শিল্পী বা প্রযুক্তিবিদ সুযোগ পাবেন এসব ক্ষেত্রে ফেডারেশনের প্রভাব অত্যন্ত বেশি ছিল। ফলে অনেকেই মনে করতেন যে, ব্যক্তিগত যোগ্যতার চেয়ে সংগঠনগত সম্পর্ক বা রাজনৈতিক অবস্থান কখনও কখনও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। যদিও এই অভিযোগগুলির সবকটির আইনি বা বিচারিক প্রমাণ নেই, তবুও শিল্পের ভেতরে অসন্তোষ যে বাস্তব, তা বিভিন্ন সময় বহু শিল্পীর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
‘ব্যান কালচার’ বিতর্কে উত্তাল টলিউড (Papiya Adhikari)
গত কয়েক বছরে টলিউডের অন্যতম আলোচিত শব্দ হয়ে উঠেছিল ‘ব্যান কালচার’। বহু শিল্পী ও কলাকুশলীর অভিযোগ ছিল, কোনও ব্যক্তি যদি ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেন, তাহলে তাঁর কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। কেউ অভিযোগ করেছেন হঠাৎ করেই নতুন কাজের প্রস্তাব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কেউ জানিয়েছেন, বহুদিনের পেশাগত সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও প্রযোজকরা শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলেছেন। আবার কেউ কেউ দাবি করেছেন, সংগঠনের চাপের কারণে তাঁদের নাম বিভিন্ন প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগগুলির সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, শিল্প জগতের একটি বড় অংশের মধ্যে যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা অস্বীকার করা কঠিন। পাপিয়া অধিকারী এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধেই সরব হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনও শিল্পীর রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে কাজের সুযোগ নির্ধারণ করা উচিত নয়।

পাপিয়া অধিকারীর সংস্কারের রূপরেখা (Papiya Adhikari)
পাপিয়া অধিকারী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মতে, বর্তমান কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই জটিল, ধীরগতি সম্পন্ন এবং অস্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। তিনি এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে চান, যেখানে শিল্পী, টেকনিশিয়ান ও প্রযোজকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন এবং কোনও ধরনের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব তাঁদের পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলবে না। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কর্মসংস্থানের বিষয়টি।
EIMPCC: নতুন সংগঠনের ঘোষণা
এই পরিবর্তনের লক্ষ্যে পাপিয়া অধিকারী একটি নতুন সংগঠনের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন। সংগঠনের নাম Eastern India Motion Pictures & Cultural Confederation (EIMPCC)। তাঁর দাবি, এই নতুন কাঠামোর মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে আরও আধুনিক ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। বর্তমানে বিভিন্ন গিল্ড ও উপ-সংগঠন মিলিয়ে যে জটিল ব্যবস্থা রয়েছে, তার পরিবর্তে চারটি মূল বিভাগের মাধ্যমে কাজ পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই বিভাগগুলির মধ্যে রয়েছে, সিনেম্যাটোগ্রাফি বিভাগ, পরিচালক বিভাগ, প্রোডাকশন কন্ট্রোলার বিভাগ, আর্ট ও কস্টিউম বিভাগ নতুন কাঠামো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে সহজ করবে এবং দ্রুত সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে বলে দাবি করা হয়েছে।
নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান
পাপিয়া অধিকারীর পরিকল্পনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিয়মিত পর্যালোচনা বৈঠক। তিনি জানিয়েছেন, প্রতি সপ্তাহে টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে বৈঠক করে শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হবে। শুধু সাংগঠনিক সমস্যা নয়, কর্মসংস্থান, কাজের সুযোগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং শিল্পীদের অভিযোগের বিষয়েও নিয়মিত আলোচনা হবে। এর ফলে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলি দ্রুত চিহ্নিত ও সমাধান করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কমছে বাংলা ছবির সংখ্যা (Papiya Adhikari)
পাপিয়া অধিকারীর বক্তব্যে উঠে এসেছে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের আর্থিক সংকটের কথাও। তাঁর দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে নতুন বাংলা ছবির নিবন্ধন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। অনেক প্রযোজক নতুন বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। কারণ হিসেবে উঠে আসছে আর্থিক ঝুঁকি, দর্শক সংকট এবং বাজারের অনিশ্চয়তা। এর ফলে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানও প্রভাবিত হচ্ছে। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের এই মন্দা পরিস্থিতি শুধুমাত্র ব্যবসায়িক সমস্যা নয়, বরং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
ঐতিহ্যের গৌরব বনাম বর্তমানের সংকট (Papiya Adhikari)
বাংলা সিনেমার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ভারতীয় চলচ্চিত্রের পথিকৃৎদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হীরালাল সেন। পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক এবং মৃণাল সেন বাংলা সিনেমাকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা এনে দেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দর্শক সংখ্যা কমে যাওয়া, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা, প্রযোজনার খরচ বৃদ্ধি, হল ব্যবসার সংকট এবং সাংগঠনিক জটিলতা শিল্পকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে।
আরও পড়ুন: Councillor Arrested: শ্লীলতাহানি ও মারধরের অভিযোগ, গ্রেফতার কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর
টলিউড কি নতুন অধ্যায়ের সামনে?
বর্তমান সংঘাতকে অনেকেই টলিউডের একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখছেন। একদিকে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত সাংগঠনিক কাঠামো, অন্যদিকে সংস্কার ও পরিবর্তনের দাবি। পাপিয়া অধিকারীর উদ্যোগ কতটা সফল হবে, নতুন সংগঠন EIMPCC বাস্তবে কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে এবং শিল্পের বিভিন্ন অংশের সমর্থন কতটা পাবে তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের ভেতরে পরিবর্তনের দাবি আজ আর বিচ্ছিন্ন নয়। শিল্পী, টেকনিশিয়ান, প্রযোজক এবং দর্শকদের একাংশ এখন এমন একটি পরিবেশ চান, যেখানে যোগ্যতা, সৃজনশীলতা এবং পেশাদারিত্বই হবে সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড।



