Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ত্রয়ণ চক্রবর্তী: ৩,০৩০ কোটি টাকার কেন্দ্রীয় প্রকল্পে বাংলাকে যুক্ত করার দাবি, সম্ভাব্য জায়গার তালিকায় সিঙ্গুর-হলদিয়া-রঘুনাথপুর-দুর্গাপুর (Samik Bhattacharya)। পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে কেন্দ্রের ‘ভব্য রাসায়ন’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় রাজ্যে একটি আধুনিক কেমিক্যাল পার্ক গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দিয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য। দ্রুত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য রাজ্য সরকারের তরফে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, কেন্দ্রের এই প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় সুযোগ এনে দিতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও দ্রুত পদক্ষেপ করা গেলে কেমিক্যাল পার্ককে কেন্দ্র করে রাজ্যে বিপুল বিনিয়োগ আসার পাশাপাশি তৈরি হতে পারে কর্মসংস্থানের একাধিক নতুন ক্ষেত্র।
দেশজুড়ে হবে তিনটি কেমিক্যাল পার্ক (Samik Bhattacharya)
চিঠিতে শমীক ভট্টাচার্য উল্লেখ করেছেন, গত ২৪ জুলাই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ৩,০৩০ কোটি টাকার ‘ভব্য রাসায়ন’ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আধুনিক পরিকাঠামো-সমৃদ্ধ ডেডিকেটেড কেমিক্যাল পার্ক গড়ে তোলা। প্রকল্পের আওতায় দেশজুড়ে মোট তিনটি কেমিক্যাল পার্ক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি পার্কের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে সর্বোচ্চ ১,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতে পারে। ফলে যে রাজ্য এই প্রকল্পের সুযোগ নিতে পারবে, সেখানে শিল্প পরিকাঠামো তৈরির পাশাপাশি বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট রাজ্যকে ন্যূনতম ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রায় ২,০০০ একর জটিলতামুক্ত জমি দিতে হবে। অর্থাৎ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করাই এই প্রকল্প পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাংলার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই কেমিক্যাল পার্ক? (Samik Bhattacharya)
শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের শিল্প পরিকাঠামো এবং ভৌগোলিক অবস্থান এই ধরনের একটি প্রকল্পের জন্য যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। রাজ্যে ইতিমধ্যেই হলদিয়া, দুর্গাপুর, রঘুনাথপুরের মতো শিল্পাঞ্চল রয়েছে। পাশাপাশি সিঙ্গুরকেও সম্ভাব্য জায়গা হিসেবে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি আধুনিক কেমিক্যাল পার্ক গড়ে উঠলে শুধু রাসায়নিক শিল্পই নয়, তার সঙ্গে যুক্ত একাধিক সহযোগী শিল্পও দ্রুত বিকশিত হতে পারে। কাঁচামাল সরবরাহ থেকে শুরু করে উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহণ এবং লজিস্টিক্স—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে বড় শিল্পের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি শিল্প সংস্থাগুলিও উপকৃত হতে পারে। স্থানীয় স্তরে গড়ে উঠতে পারে বহু ancillary unit বা সহায়ক শিল্প।
রাসায়নিক শিল্পের পাশাপাশি বাড়বে একাধিক ক্ষেত্র
কেমিক্যাল পার্কের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এর প্রভাব শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট শিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাসায়নিক শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত বহু ক্ষেত্র রয়েছে। ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে রাসায়নিক উপাদানের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেশি। একইভাবে অটোমোবাইল, টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিক্স, প্লাস্টিক, রং, প্যাকেজিং এবং বিভিন্ন উৎপাদনশীল শিল্পেও রাসায়নিক উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে বাংলায় এমন একটি পার্ক গড়ে উঠলে একদিকে যেমন নতুন শিল্প ইউনিট তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে ইতিমধ্যে থাকা শিল্পগুলিও তাদের উৎপাদন ও ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।
সরাসরি চাকরির পাশাপাশি তৈরি হবে পরোক্ষ কর্মসংস্থান
কেমিক্যাল পার্ক তৈরির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা অবশ্যই কর্মসংস্থান। একটি বড় শিল্প প্রকল্পে ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান, অপারেটর, গবেষণাকর্মী থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কর্মী বিভিন্ন ধরনের দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হয়। শুধু সরাসরি চাকরিই নয়, পার্ককে কেন্দ্র করে পরিবহণ, গুদাম, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, খাদ্য পরিষেবা, নির্মাণ, প্যাকেজিং এবং লজিস্টিক্সের মতো ক্ষেত্রেও বিপুল পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় যুবকদের পাশাপাশি ছোট ব্যবসায়ী ও পরিষেবা প্রদানকারীরাও উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সম্ভাব্য জায়গার তালিকায় সিঙ্গুর (Samik Bhattacharya)
চিঠিতে সম্ভাব্য জায়গা হিসেবে সিঙ্গুর, হলদিয়া, রঘুনাথপুর এবং দুর্গাপুরের নাম উল্লেখ করেছেন শমীক ভট্টাচার্য। হলদিয়া দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও পেট্রোকেমিক্যাল কেন্দ্র। দুর্গাপুর ও রঘুনাথপুরের মতো এলাকাতেও শিল্প পরিকাঠামো রয়েছে। ফলে এই এলাকাগুলির মধ্যে উপযুক্ত জায়গা চিহ্নিত করে কেমিক্যাল পার্ক গড়ে তোলা গেলে বিদ্যমান শিল্প পরিকাঠামোকেও কাজে লাগানো সম্ভব হতে পারে।
অন্যদিকে সিঙ্গুরের মতো জায়গাকে শিল্পের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত কোন জায়গা প্রকল্পের জন্য উপযুক্ত হবে, তা নির্ভর করবে জমির প্রাপ্যতা, পরিকাঠামো, পরিবহণ ব্যবস্থা, জল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পরিবেশগত বিষয়গুলির উপর।
কেন্দ্র-রাজ্যের যৌথ বিনিয়োগে আসতে পারে বেসরকারি পুঁজি
এই ধরনের বড় শিল্প প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সহায়তা এবং রাজ্যের জমি ও পরিকাঠামো এই দুইয়ের সমন্বয় হলে বেসরকারি সংস্থাগুলির কাছেও প্রকল্পটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। একটি বড় কেমিক্যাল পার্ক তৈরি হলে তার আশপাশে নতুন কারখানা, গুদাম, পরিবহণ কেন্দ্র এবং বিভিন্ন সহায়ক শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। ফলে একটি প্রকল্প থেকেই একটি বৃহত্তর শিল্প-পরিবেশ বা industrial ecosystem তৈরি হতে পারে।
শিল্পায়নের পথে নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছে রাজ্য বিজেপি
রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিল্প ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বারবার বলা হয়েছে। সেই বৃহত্তর শিল্পায়ন পরিকল্পনার সঙ্গে কেন্দ্রের ‘ভব্য রাসায়ন’ প্রকল্পকে যুক্ত করার চেষ্টা হিসেবেই শমীক ভট্টাচার্যের এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে। তাঁর চিঠির মূল বক্তব্য হল, কেন্দ্রের প্রকল্পের সুযোগ বাংলার হাতছাড়া করা উচিত নয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমি চিহ্নিত করা এবং রাজ্যের আর্থিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা গেলে পশ্চিমবঙ্গ দেশের তিনটি কেমিক্যাল পার্কের অন্যতম একটি পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে যেতে পারে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ জমি ও পরিবেশ (Samik Bhattacharya)
তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও মাথায় রাখতে হবে। প্রায় ২,০০০ একর জটিলতামুক্ত জমি জোগাড় করা নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ। জমির মালিকানা, শিল্প ব্যবহারের উপযোগিতা এবং স্থানীয় পরিকাঠামো সবকিছু খতিয়ে দেখতে হবে। এর পাশাপাশি কেমিক্যাল শিল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক প্রযুক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জল ব্যবস্থাপনা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই প্রকল্প তৈরি করতে হবে।

আরও পড়ুন: Birbhum: দিনমজুর থেকে হাজার কোটির মালিক! রাতারাতি বদলে গেল টুলু মণ্ডলের ভাগ্য
এখন নজর রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তে
কেন্দ্রের প্রকল্পের সুযোগ নিতে হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। সেই কারণেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার আবেদন জানিয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য। এখন দেখার বিষয়, রাজ্য সরকার এই প্রস্তাব নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং সম্ভাব্য জমি ও আর্থিক অংশীদারিত্বের বিষয়ে কত দ্রুত পদক্ষেপ করে। যদি কেন্দ্রের প্রকল্পের আওতায় বাংলায় একটি আধুনিক কেমিক্যাল পার্ক গড়ে ওঠে, তাহলে তা শুধু একটি নতুন শিল্প প্রকল্প হিসেবেই নয়, রাজ্যের শিল্প মানচিত্রে বড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।



