Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল : সাল ১৯০২, ৪ জুলাই। বেলুড় মঠ সেদিন যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল (Swami Vivekananda)। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন সেই বীর সন্ন্যাসী, যিনি ভারতীয় আধ্যাত্মিকতাকে বিশ্বদরবারে নতুন ভাষা ও মর্যাদা দিয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁর প্রয়াণের খবরে শুধু বেলুড় মঠ নয়, গোটা ভারতবর্ষে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, ততই প্রশ্ন উঠেছে এই মৃত্যু কি নিছকই শারীরিক অসুস্থতার ফল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্য?

মৃত্যুর পূর্বাভাস আগেই পেয়েছিলেন (Swami Vivekananda)
স্বামী বিবেকানন্দের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি নিজেই যেন নিজের মহাপ্রয়াণ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তাঁর অনুগামী স্বামী অভেদানন্দকে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, তাঁর আয়ু বড়জোর আর পাঁচ বছর। তাঁর মতে, তাঁর আত্মা এতটাই বিশাল হয়ে উঠেছিল যে, এই নশ্বর শরীর তাকে আর ধারণ করতে পারছিল না। শরীর যেন আত্মার জন্য এক সংকীর্ণ খাঁচায় পরিণত হয়েছিল। এই ভাবনাই আরও দৃঢ় হয় শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের একটি ভবিষ্যদ্বাণীতে। তিনি একবার বলেছিলেন, “নরেন যেদিন বুঝবে তার কাজ শেষ, সেদিন সে নিজেই চলে যাবে।” এই উক্তি যেন স্বামীজির জীবন ও মৃত্যুর মধ্যকার অদ্ভুত যোগসূত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
শেষ বিদায়ের ইঙ্গিত (Swami Vivekananda)
স্বামীজির মৃত্যুর মাত্র দু’দিন আগে, ২ জুলাই, এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে। সেদিন স্বামীজি নিজ হাতে অত্যন্ত যত্ন করে ভগিনী নিবেদিতাকে খাইয়েছিলেন। তখন নিবেদিতা এর তাৎপর্য বুঝতে না পারলেও, পরে তিনি উপলব্ধি করেন গুরু আসলে তাঁকে নীরবে শেষ বিদায় জানিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর আসে এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা। ৪ জুলাই রাতে ভগিনী নিবেদিতা স্বপ্নে দেখেন, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব দ্বিতীয়বার দেহত্যাগ করছেন। আশ্চর্যের বিষয়, ঠিক রাত ৯টা ১০ মিনিটে যখন স্বামী বিবেকানন্দের মহাপ্রয়াণ ঘটে, সেই একই সময়ে নিবেদিতা এই স্বপ্নটি দেখেন। সময়ের এই অভাবনীয় মিল বহু গবেষক ও ভক্তের কাছে আজও গভীর বিস্ময়ের বিষয়।
শেষ দিনের স্বাভাবিকতা (Swami Vivekananda)
স্বামীজির শেষ দিনটি বাহ্যিকভাবে ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। ৪ জুলাই ভোরে উঠে তিনি দীর্ঘক্ষণ ধ্যান করেন। এরপর ছাত্রদের ব্যাকরণ ও দর্শন পাঠান। গঙ্গার ঘাটে গিয়ে মাঝিদের নৌকা থেকে নিজের হাতে টাটকা ইলিশ মাছ কিনে আনেন। আনন্দের সঙ্গে সকলকে নিয়ে ইলিশের নানা পদে দুপুরের আহারও সারেন। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালেই ছিল গভীর এক সংকেত। সেদিন বিকেলে তিনি মঠের একটি নির্দিষ্ট স্থান দেখিয়ে বলেছিলেন, “আমার দেহ গেলে ওখানে সৎকার করিস।”
আজ বেলুড় মঠের সেই স্থানেই দাঁড়িয়ে আছে স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিমন্দির যেন তাঁর কথারই নীরব সাক্ষ্য।
চিকিৎসাবিদ্যার ব্যাখ্যা বনাম শিষ্যদের বিশ্বাস (Swami Vivekananda)
চিকিৎসকদের মতে, স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যুর কারণ ছিল মস্তিষ্কের রক্তনালী ফেটে যাওয়া (সেরিব্রাল হেমোরেজ)। কিন্তু তাঁর শিষ্য ও অনুরাগীদের বিশ্বাস ছিল ভিন্ন। তাঁদের দাবি, স্বামীজি সাধারণ মৃত্যুবরণ করেননি তিনি লাভ করেছিলেন মহাসমাধি। তাঁদের মতে, মৃত্যুর সময় তাঁর ব্রহ্মরন্ধ্র ফেটে গিয়েছিল, যা যোগশাস্ত্র অনুসারে উচ্চস্তরের সাধকের দেহত্যাগের লক্ষণ।
আরও পড়ুন : Bangladesh: বিএনপির চেয়ারম্যান পদে তারেক রহমান: নির্বাচনের আগে পদক্ষেপ তাৎপর্যপূর্ণ, দাবি রাজনৈতিক মহলের
বয়সের ভবিষ্যদ্বাণী
স্বামী বিবেকানন্দ নিজেই বলতেন, তিনি কখনও ৪০ বছর বয়স পার করবেন না। আশ্চর্যজনকভাবে, তাঁর প্রয়াণের সময় বয়স হয়েছিল ঠিক ৩৯ বছর ৫ মাস ২৫ দিন। এই নিখুঁত সামঞ্জস্য তাঁর জীবন ও মৃত্যুকে ঘিরে থাকা রহস্যকে আরও গভীর করে তোলে। মাত্র ৩৯ বছরের এই সংক্ষিপ্ত জীবনে স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বকে দিয়ে গিয়েছেন এক চিরন্তন সত্যের দিশা। তিনি দেখিয়েছেন আত্মবিশ্বাস, মানবপ্রেম ও আধ্যাত্মিকতার সম্মিলিত পথ। তাঁর জীবন যেমন ছিল সংগ্রামী ও দীপ্তিময়, তাঁর প্রয়াণও তেমনই রহস্যময় ও মহিমান্বিত।



