Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বাংলা সিনেমায় আবারও দেখা গেল একই দৃশ্য, নতুন প্রজন্মের সৃষ্টিশীল উদ্যোগকে ঠেকানো হলো শেষ মুহূর্তে (The Academy of Fine Arts)। ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রী ও তরুণ পরিচালক জয়ব্রত দাশের তৈরি ‘দ্য অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’ ছবিটি মুক্তির আগের দিনই আটকে দিল ফেডারেশন/সিনে গিল্ড। কারণ হিসেবে জানানো হয়েছে ছবিতে তাঁদের তালিকাভুক্ত টেকনিশিয়ান ব্যবহার করা হয়নি। ফলে চার বছর ধরে যে স্বপ্ন, সংগ্রাম, পরিশ্রম, দিন-রাত্রির ঘাম, অগণিত বার শুটিং বন্ধ হওয়া ও পুনরায় শুরু হওয়ার লড়াই সবই থমকে গেল এক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে। এই ঘটনায় শুধু ছবির টিম নয়, পুরো চলচ্চিত্রমহল উত্তাল।

জয়ব্রত দাশের নতুন ছবি (The Academy of Fine Arts)
লেখক-পরিচালক জয়ব্রত দাশের নতুন সিনেমা ‘দ্য অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’ ইতিমধ্যেই আলোচনায়। ছবিতে মুখ্য চরিত্রে রয়েছেন রুদ্রনীল ঘোষ, সৌরভ দাস, পায়েল সরকার, ঋষভ বসু, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুরাধা মুখোপাধ্যায়, সুদীপ মুখোপাধ্যায় ও অনিন্দ্য পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিচালক জানাচ্ছেন এটি একটি পাল্প অ্যাকশন থ্রিলার, যেখানে অ্যাকশনের পাশাপাশি দর্শক পাবেন টাটকা কমেডির স্বাদও।
স্বাধীন শিল্পকে বাঁধা বাণিজ্যিক নিয়মের (The Academy of Fine Arts)
লকডাউনের সময় ফিল্ম ইনস্টিটিউটের কয়েকজন শিক্ষার্থী নতুন ধরনের অ্যাকশন-কমেডি ছবি বানানোর সিদ্ধান্ত নেন। নিজেদের হাতে লেখা গল্প, নিজেরাই ডিজাইন করা চিত্রনাট্য, নিজের হাতে তৈরি সেট সবকিছুই ছিল শিক্ষার অংশ, শিল্পচর্চার অংশ ও নিজের সীমিত সামর্থ্যের পরীক্ষা। ছাত্ররা, ভাড়া বাড়ি নিয়ে নিজেরাই সেখানে থাকেন। মাসের পর মাস দেয়াল রং করেন। কাঠামো তৈরি করেন। সেট সাজান। নিজেদের পোশাক, প্রপস সংগ্রহ করেন। বহুবার টাকা ফুরিয়ে শুটিং বন্ধ হয়। আবার বন্ধুবান্ধবের সাহায্যে টাকা জোগাড় করে শুরু করেন। এই ছিল তাঁদের বাস্তব সংগ্রাম। অভিনেতারা তাঁদের কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে অত্যন্ত কম পারিশ্রমিকে রাজি হন শুটিংয়ে।

শেষ মুহূর্তে নিষেধাজ্ঞা! (The Academy of Fine Arts)
২০২৫ সালের নভেম্বরের শুরুতেই ছবির ট্রেলার ও গান প্রকাশিত হয়। সোশ্যাল মিডিয়া উত্তপ্ত হয় ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিয়ে। ফিল্ম বৃত্তে কথাবার্তা শুরু হয় একদল ছাত্রছাত্রীর এমন উদ্যোগ বাংলা সিনেমার নতুন পথ খুলে দিতে পারে। কিন্তু মুক্তির আগের দিনই জানিয়ে দেওয়া হয়, “হল-এ ছবিটি দেখানো যাবে না।” এই এক সিদ্ধান্তে চার বছর ধরে তৈরি স্বপ্ন মুহূর্তে ভেঙে পড়ে।
ফেডারেশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র প্রশ্ন (The Academy of Fine Arts)
সূত্রের খবর, ছাত্ররা প্রশ্ন তুলছেন,
১. ফিল্ম ইনস্টিটিউটের শিক্ষামূলক ছবিতে গিল্ডের নিয়ম কীভাবে প্রযোজ্য?
ছাত্ররা নিজেদের শেখার জন্য ছবিটি বানিয়েছেন। এখানে টেকনিশিয়ান বেছে নেওয়া তাঁদের কোর্সের অংশ। এটি বাণিজ্যিক ছবির মতো নয়।
২. তাহলে কি ভবিষ্যতে ছাত্ররা শুধু থিওরি পড়বে?
সিনেমা যদি বাস্তবে বানাতে যায়, তাহলে গিল্ডের অনুমতি না নিলে তারা কি সিনেমাও করতে পারবে না?
৩. শিক্ষামূলক সেট বানানো, নিজেরা কাজ করার দক্ষতা, তার কি কোনো মূল্য নেই?
৪. স্বাধীন উদ্যোগ ও বাণিজ্যিক ছবিকে একই নিয়মে বিচার করা কি ন্যায়সঙ্গত?
৫. এই ঘটনা কি ভবিষ্যতের ছাত্রদের জন্য ভয়ের বার্তা নয়?
স্বপ্নকে হত্যা করছে (The Academy of Fine Arts)
অনেক প্রবীণ অভিনেতা, চিত্রগ্রাহক, সম্পাদক মন্তব্য করছেন “যাঁরা বাংলা সিনেমার ভবিষ্যত তৈরি করছেন, তাঁদেরই পথ আটকে দেওয়া হচ্ছে। বাংলা সিনেমা কি এভাবেই টিকে থাকবে?” অনেকে মনে করছেন, যে সময় বাংলা ছবি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সে সময় নতুন পদ্ধতির স্বাধীন সিনেমাকে থামিয়ে দেওয়ায় ক্ষতি আরও বাড়বে।

বাংলা সিনেমা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আজ?
বর্তমান বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক। কেন? ১) প্রযোজকের ঘাটতি নতুন পরিচালক বা নতুন ধারার ছবিতে প্রযোজক এগিয়ে আসতে চান না। রিস্ক নিতে চান না। ২) বড় প্রডাকশনের দাপট কয়েকটি বড় প্রোডাকশন হাউসই প্রায় সব হল দখল করে রাখে। ছোট বা স্বাধীন ছবির স্ক্রিন পাওয়া কঠিন হয়। ৩) ওটিটি-র যুগে বাংলা কন্টেন্ট কম বিনিয়োগ পাচ্ছে হিন্দি ও দক্ষিণের বাজারে বিনিয়োগ অনেক বেশি। বাংলার কন্টেন্টকে ‘আঞ্চলিক’ বলে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ৪) মৌলিক গল্প কম, রিমেক বেশি নতুন ধারার ছবি কম, পরীক্ষামূলক ছবি গোনা যায় হাতে। যে কারণে তরুণ পরিচালকরা আরও কোণে সরে যাচ্ছেন। ৫) ছাত্রছাত্রীদের কাজকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না ফিল্ম ইনস্টিটিউট হয়তো আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেয়, কিন্তু তাদের প্রজেক্টকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো সুরক্ষা নেই। ৬) হলের সংখ্যা কমছে, দর্শকের আস্থা কমছে গত এক দশকে বাংলায় বেশ কিছু হল বন্ধ হয়ে গেছে। ওটিটি দর্শকদের বড় অংশ দখল করেছে। এই পরিস্থিতিতে ‘দ্য অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’–এর মতো স্বাধীন, সাহসী ছবি মুক্তি পেলে হয়তো নতুন দিশা পাওয়া যেত। কিন্তু সেটাই এখন আটকে আছে।
গল্প হলেও সত্যি? (The Academy of Fine Arts)
এর আগেও ‘Kalponik’ ছবি তার বিষয়বস্তু নিয়ে বিতর্কে নিষিদ্ধ হয়েছিল। বাংলা ছবির ইতিহাসে বারবারই দেখা গেছে, অন্য ঘরানার ছবি, নতুন চিন্তার ছবি বা স্বাধীন উদ্যোগের ছবি কোনো না কোনো কারণে আটকে যায়। এ যেন সৃষ্টিশীলতার ওপর অদৃশ্য সেন্সরশিপ।
আরও পড়ুন: Sohini Sarkar: চ্যাটে সামনে এলো সোহিনী ঋতাভরীর দাম্পত্য কলহ!
চার বছরের পরিশ্রম
এক সংবাদমাধ্যমের থেকে জানা যায়, একজন অভিভাবকের বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে শোরগোল তুলেছে, “আমার মেয়ে সামান্যভাবে যুক্ত ছিল এই ছবির সঙ্গে। চার বছর ধরে ওদের লড়াই দেখেছি। আজ মনে হচ্ছে এ দেশে জন্মানো ভুল ছিল। যেখানে পরিশ্রমের দাম নেই, শিল্পীর সম্মান নেই, সৎ কাজের মূল্য নেই।” এই ক্ষত শুধু এক পরিবারের নয়, এ ক্ষত পুরো বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের।



