Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম অমূল্য সম্পদ দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে। পাহাড়ের বুক চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা এই ঐতিহ্যবাহী টয় ট্রেন শুধু একটি রেল পরিষেবা নয়, বরং উত্তরবঙ্গের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পর্যটনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৮৮১ সালের ৪ জুলাই শিলিগুড়ি থেকে প্রথমবারের মতো দার্জিলিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল এই ঐতিহাসিক টয় ট্রেন। সেই স্মরণীয় দিনটির ১৪৫তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শনিবার শুকনা রেলওয়ে স্টেশনে উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হলো ‘টয় ট্রেন ডে’। এদিন ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিল্পচর্চা এবং শিশুদের অংশগ্রহণে গোটা শুকনা স্টেশন পরিণত হয়েছিল এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চে (Toy Train Darjeeling)।

শুকনা রেলওয়ে স্টেশনে উৎসবের আবহ (Toy Train Darjeeling)
বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের এই বিশেষ দিনটি উপলক্ষে দ্বিতীয় বছরের মতো অনুষ্ঠান আয়োজন করে নর্থ বেঙ্গল পেন্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের উদ্যোগে ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে টয় ট্রেনের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। শুকনা রেলওয়ে স্টেশন এদিন রঙ, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক আবহে মুখর হয়ে ওঠে। সকাল থেকেই স্টেশন চত্বরে ভিড় জমাতে শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক, শিল্পী, শিক্ষার্থী এবং রেলপ্রেমীরা।
খুদে শিল্পীদের রঙে ফুটে উঠল টয় ট্রেনের গল্প (Toy Train Darjeeling)
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল অঙ্কন প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রায় ১২০ জন খুদে প্রতিযোগী-প্রতিযোগিনী এতে অংশগ্রহণ করে। ছোট ছোট শিল্পীদের তুলিতে ফুটে ওঠে পাহাড়, সবুজ বন, মেঘ, স্টিম ইঞ্জিন এবং দার্জিলিংয়ের ঐতিহ্যবাহী টয় ট্রেনের মনোমুগ্ধকর ছবি।শিশুদের উচ্ছ্বাস ও সৃজনশীলতা অনুষ্ঠানে নতুন মাত্রা যোগ করে। আয়োজকদের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতেই এই ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নাচ, গান ও শিল্পচর্চায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠল অনুষ্ঠান
অঙ্কন প্রতিযোগিতার পাশাপাশি দিনভর অনুষ্ঠিত হয় একাধিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নাচ, গান, আবৃত্তি এবং বিভিন্ন পরিবেশনার মাধ্যমে টয় ট্রেনের ইতিহাস ও উত্তরবঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়। শুধু শিশুদের জন্যই নয়, উপস্থিত শিল্পীদের জন্যও ছিল বিশেষ আর্ট ওয়ার্কশপ, যেখানে বিভিন্ন শিল্পকলা নিয়ে আলোচনা ও সৃজনশীল কাজের সুযোগ তৈরি করা হয়।
দৃষ্টিনন্দন থ্রি-ডি টয় ট্রেন মডেল ছিল বিশেষ আকর্ষণ
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল টয় ট্রেনের একটি অত্যন্ত সুন্দর থ্রি-ডি মডেল। ঐতিহ্যবাহী স্টিম ইঞ্জিনের আদলে নির্মিত এই মডেল দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। শিশু থেকে প্রবীণ—সকলেই এই মডেলের সামনে ছবি তুলতে ও কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে ভিড় জমান। অনেকের মতে, এই মডেল টয় ট্রেনের ইতিহাসকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।
প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা (Toy Train Darjeeling)
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের ডিরেক্টর ঋষভ চৌধুরী। তাঁর উপস্থিতিতে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন এবং থ্রি-ডি টয় ট্রেন মডেলের উদ্বোধনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিশু, শিল্পী এবং আয়োজকদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, টয় ট্রেন শুধুমাত্র একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়, এটি ভারতের গর্ব এবং উত্তরবঙ্গের পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক।

ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি আধুনিকীকরণের ওপর জোর
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের ডিরেক্টর ঋষভ চৌধুরী জানান, ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি পরিষেবার আর্থিক উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, চলতি বছরের মে এবং জুন মাসে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে রেকর্ড পরিমাণ আয় করেছে, যা পর্যটকদের বাড়তি আগ্রহেরই প্রমাণ। এই ইতিবাচক প্রবণতাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে আগামী দিনে প্রতিটি হেরিটেজ স্টেশনকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যটকদের জন্য উন্নত অপেক্ষাকক্ষ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, আধুনিক তথ্যকেন্দ্র এবং আরও উন্নত পরিষেবার ব্যবস্থা করা হবে বলেও তিনি জানান।
নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ
আয়োজকদের মতে, বর্তমান প্রজন্মকে শুধুমাত্র বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে টয় ট্রেনের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করানোই এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। শিশুদের অংশগ্রহণ, শিল্পচর্চা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা সম্ভব বলেই তাঁদের বিশ্বাস। ভবিষ্যতেও এই ধরনের অনুষ্ঠান আরও বড় পরিসরে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

আরও পড়ুন: Abhisek Banerjee: কণ্ঠস্বরের নমুনা মামলায় অস্বস্তিতে অভিষেক, দ্রুত শুনানির আর্জি খারিজ
পর্যটনের নতুন দিগন্তের বার্তা
১৪৫ বছরের দীর্ঘ পথচলায় দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে বহু ইতিহাসের সাক্ষী। পাহাড়ি প্রকৃতি, প্রকৌশল কৌশল এবং ঐতিহ্যের অপূর্ব মেলবন্ধন আজও দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র। শুকনা রেলওয়ে স্টেশনে ‘টয় ট্রেন ডে’ উদযাপন শুধুমাত্র একটি স্মরণ অনুষ্ঠান নয়, বরং উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ঐতিহ্য সংরক্ষণ, শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ এবং পর্যটনের প্রসারের বার্তা দিয়েই শেষ হলো এই বর্ণাঢ্য আয়োজন।



