Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: দুর্গাপুজো মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দশভুজা দেবীর মহিষাসুরমর্দিনী রূপ (Tri Bhuja Durga)। কিন্তু হুগলির বলাগড়ের সোমড়াবাজারের সেন পরিবারের দুর্গা যেন সেই চেনা ছবির একেবারে ব্যতিক্রমী রূপ। এখানে দেবী ত্রিভুজা। একদিকে দু’টি এবং অন্যদিকে একটি হাত এই বিশেষ রূপেই প্রায় তিনশো বছর ধরে পূজিতা হয়ে আসছেন তিনি। দেবীর এই অদ্ভুত মূর্তির নেপথ্যে রয়েছে স্বপ্নাদেশের কাহিনি।

কৃষ্ণনগর থেকে বলাগড় (Tri Bhuja Durga)
সেন পরিবারের দুর্গাপুজোর সূত্রপাত কৃষ্ণনগরে। জানা যায়, কৃষ্ণরাম রায় এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাঁকে কৃষ্ণনগর ছাড়তে হয়। তাঁর ছেলে রামচন্দ্র সেন পাড়ি দেন দিল্লিতে। নিজের পাণ্ডিত্য ও দক্ষতার মাধ্যমে তিনি মুঘল সম্রাটের নজরে আসেন। পরবর্তীকালে ‘রায়ান’ উপাধি লাভ করেন। পরে বাংলার প্রশাসনিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পান। সেই সময় থেকেই বলাগড়ে সেন পরিবারের স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠে।
১৭৬০-তে ফের শুরু পুজো (Tri Bhuja Durga)
বলাগড়ে এসে ১৭৬০ সালে রামচন্দ্র সেন নতুন করে দুর্গাপুজো শুরু করেন। পারিবারিক বিশ্বাস অনুযায়ী, স্বপ্নাদেশ পেয়েই দেবীর বিশেষ মূর্তি নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। সেই থেকেই ত্রিভুজা দুর্গার আরাধনা চলে আসছে। দেবীর হাতে থাকে খড়্গ, শূল এবং অসুরের চুল ও নাগপাশ। বিশ্বাস, দেবীর কাঁধে আরও সাতটি ছোট হাত রয়েছে, যদিও সেগুলি সাধারণত দৃশ্যমান নয়।

ধ্বংস হয়েছিল মণ্ডপ, বেঁচে গিয়েছিল ঐতিহ্য (Tri Bhuja Durga)
পুজোর প্রথম দিকে কাঠের মণ্ডপেই দেবীর আরাধনা হত। এক বিজয়া দশমীতে সেই মণ্ডপে হামলা চালিয়ে সেটি ধ্বংস করা হয়েছিল বলে পারিবারিক ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। তবে হামলাকারীদের পরিচয় নিয়ে রয়েছে মতভেদ। কারও মতে, বর্গিরা এই হামলা চালিয়েছিল। আবার কারও মতে, ইংরেজদের মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীরাই এর পিছনে ছিল। পরবর্তীকালে তৈরি হয় স্থায়ী মন্দির।
জন্মাষ্টমী থেকেই শুরু প্রস্তুতি (Tri Bhuja Durga)
সেন পরিবারের পুজোয় এখনও পুরনো রীতিই অনুসরণ করা হয়। জন্মাষ্টমীর তিথিতে কাঠামো পুজোর মাধ্যমে শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। তারপর ধীরে ধীরে শিল্পীর হাতে ফুটে ওঠে সেই অনন্য ত্রিভুজা দুর্গা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতিতে আজও কোনও ছেদ পড়েনি।
বাঁশের দোলনায় গঙ্গার পথে বিসর্জন (Tri Bhuja Durga)
এই পুজোর বিসর্জনও অন্য অনেক পুজোর থেকে আলাদা। পারিবারিক প্রথা মেনে তৈরি করা হয় বড় বাঁশের দোলনা। সেই দোলনায় দেবীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গার ঘাটে। সেখানেই সম্পন্ন হয় প্রতিমা নিরঞ্জন। ঐতিহ্যের এই বিশেষ রীতি আজও ধরে রেখেছে সেন পরিবার।

পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে সকলের দুর্গা
সময়ের সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু, কিন্তু সোমড়াবাজারের ত্রিভুজা দুর্গার ঐতিহ্য বদলায়নি। তিনশো বছরের ইতিহাস, স্বপ্নাদেশ, অলৌকিক বিশ্বাস, প্রতিমার ব্যতিক্রমী রূপ এবং বিসর্জনের অভিনব রীতি—সব মিলিয়ে এই পুজো বাংলার দুর্গোৎসবের এক অনন্য অধ্যায়। এখন আর এটি শুধু সেন পরিবারের পুজো নয়। এলাকার মানুষের আবেগ ও অংশগ্রহণে এই প্রাচীন আরাধনা হয়ে উঠেছে সকলের উৎসব।



