Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ভারতীয় চিত্রসাংবাদিকতার আকাশে রঘু রাই ছিলেন এক অনন্য নক্ষত্র। তাঁর প্রয়াণে শুধু একজন কিংবদন্তি আলোকচিত্রীকে হারাল ভারত নয়, হারাল সময়কে দেখার এক স্বতন্ত্র চোখ। (World Photography Day)-তে তাঁর কথা মনে করা মানে আসলে সেই মানুষটিকে স্মরণ করা, যিনি ক্যামেরাকে কেবল যন্ত্র হিসেবে দেখেননি তাকে মানুষের গল্প বলার ভাষা করে তুলেছিলেন।

ছবিওয়ালাদের সেই ‘পাগলামি’ (World Photography Day)
যাঁরা ক্যামেরা হাতে রাস্তায় ঘোরেন, তাঁরা জানেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি কখনও নিজে থেকে সামনে এসে দাঁড়ায় না। তাকে খুঁজতে হয়। অপেক্ষা করতে হয়। কখনও ধুলো, বৃষ্টি, বিপদ, ক্ষুধা কিংবা ক্লান্তিকে উপেক্ষা করতে হয়। এই অদৃশ্য ত্যাগের মধ্যেই থাকে এক ধরনের পাগলামি। রঘু রাইয়ের কাজেও সেই পাগলামি ছিল কিন্তু তা ছিল গভীর পর্যবেক্ষণ ও মানবিক দায়বদ্ধতার পাগলামি।
খবর নয়, মানুষের মুখ (World Photography Day)
রঘু রাইয়ের ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষ। তিনি শুধু ঘটনা রেকর্ড করেননি; ঘটনার মধ্যে আটকে থাকা মানুষের অনুভূতিকে ধরেছেন। তাঁর ক্যামেরায় ইন্দিরা গান্ধী, মাদার টেরেসা, সত্যজিৎ রায়, দালাই লামা কিংবা বাল ঠাকরে শুধুই বিখ্যাত ব্যক্তি নন তাঁরা হয়ে উঠেছেন সময়ের নির্দিষ্ট চরিত্র। তাঁদের মুখ, চোখ, শরীরী ভাষা এবং নীরবতা ছবির মধ্যে আলাদা গল্প তৈরি করেছে।

ভোপাল: ক্যামেরায় ধরা ইতিহাসের ক্ষত (World Photography Day)
১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস বিপর্যয় তাঁর চিত্রসাংবাদিকতার অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। মৃত্যুর ভয়াবহতা, অসহায় মানুষ এবং বিপর্যস্ত জীবনের দৃশ্য তিনি এমনভাবে তুলে ধরেছিলেন, যা সংবাদকে ছাড়িয়ে মানবিক ইতিহাসের দলিলে পরিণত হয়। তাঁর ছবি দেখলে শুধু একটি দুর্ঘটনার কথা মনে পড়ে না মনে হয়, সেই বিপর্যয়ের যন্ত্রণা যেন আজও আমাদের সামনে উপস্থিত।
তাজমহলও তাঁর ক্যামেরায় অন্যরকম
রঘু রাই প্রমাণ করেছিলেন, পরিচিত দৃশ্যও একজন শিল্পীর চোখে নতুন হয়ে উঠতে পারে। তাজমহল তাঁর ক্যামেরায় নিছক একটি স্থাপত্য ছিল না; আলো, ছায়া, কুয়াশা, মানুষ এবং পরিবেশের সঙ্গে মিশে তা হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত দৃশ্যকাব্য। এখানেই তাঁর ফটোগ্রাফির বিশেষত্ব তিনি দৃশ্যের সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার অন্তর্নিহিত আবহটিকেও ধরতেন।
মুহূর্তের অপেক্ষায় এক ধৈর্যশীল শিল্পী
ভালো ছবি অনেক সময় এক সেকেন্ডের ভেতর জন্ম নেয়। কিন্তু সেই এক সেকেন্ডের জন্য একজন ফটোগ্রাফারকে হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। রঘু রাইয়ের ছবিতে সেই অপেক্ষার ছাপ স্পষ্ট। আলো, মানুষ, স্থান এবং মুহূর্ত—সবকিছুর নিখুঁত সমন্বয় ঘটার অপেক্ষায় তিনি থাকতেন। তাই তাঁর ছবি শুধু ‘তোলা’ ছবি নয়, অনেক সময় ‘অর্জন করা’ ছবি।
ছবি যখন সময়ের বিকল্প স্মৃতি (World Photography Day)
রঘু রাইয়ের অসংখ্য ছবি আজ ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ভিজ্যুয়াল আর্কাইভ। সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত হওয়ার মুহূর্ত পেরিয়ে তাঁর ছবিগুলি এখন গবেষণা, শিল্পচর্চা ও ইতিহাসের উপাদান। তাঁর ফটোবুকগুলিও দেখিয়েছে, ছবি একা থাকে না—ছবির সঙ্গে সময়, মানুষ ও সমাজের স্মৃতিও থেকে যায়।
আরও পড়ুন: KMC Ward: ১৪৪ থেকে ২০৯! বদলাচ্ছে কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ডের মানচিত্র, শীঘ্রই প্রকাশিত হবে নয়া খসড়া
World Photography Day-তে রঘু রাইকে মনে রাখা
রঘু রাই আমাদের শিখিয়েছেন, ফটোগ্রাফি শুধু সুন্দর ছবি তোলার শিল্প নয়; এটি দেখার শিল্প, প্রশ্ন করার শিল্প এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক শক্তিশালী মাধ্যম। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় ফটোগ্রাফারের সবচেয়ে বড় সম্পদ দামি ক্যামেরা নয়, তাঁর চোখ। মানুষ চলে যায়, সময় বদলে যায়, কিন্তু সত্যিকারের একটি ছবি থেকে যায়। রঘু রাইও তাই তাঁর ছবির মধ্যেই বেঁচে থাকবেন—একটি দেশের স্মৃতি, যন্ত্রণা, সৌন্দর্য এবং মানুষের গল্প হয়ে।



