Last Updated on [modified_date_only] by Sumana Bera
সত্যজিৎ পাল, রায়গঞ্জ: ইতিহাসের পাতায় ৭৫ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসেছে রায়গঞ্জ পৌরসভা। ১৯৫১ সালের ১৯ জুলাই পথচলা শুরু হয় এই পুরসভার (Raiganj Municipality)। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে রায়গঞ্জ শহরের পরিধি, জনসংখ্যা এবং নাগরিক পরিষেবার চাহিদা। বর্তমানে ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই পুরসভা উত্তর দিনাজপুর জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান।
রায়গঞ্জ পৌরসভার রাজনৈতিক ইতিহাস (Raiganj Municipality)
রায়গঞ্জ পৌরসভার রাজনৈতিক ইতিহাসও যথেষ্ট ঘটনাবহুল। বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেস, বামপন্থী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে পুরবোর্ড পরিচালিত হয়েছে। ২০০১ সালের পুরসভা নির্বাচনকে ঘিরে চেয়ারম্যান নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের ঘটনাও আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। সেই সময় কাউন্সিলরদের ভোটে অরূপ ঘোষ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বলে কলকাতা হাইকোর্টের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন রায়গঞ্জ পুরসভার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কংগ্রেস নেতা মোহিত সেনগুপ্ত। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়েও তিনি পুরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন বলে তাঁর নিজের বক্তব্য থেকে জানা যায়। পরবর্তী সময়েও তাঁর নেতৃত্বে কংগ্রেস পরিচালিত পুরবোর্ড রায়গঞ্জ (Raiganj Municipality) শহরের পুর পরিষেবা ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ চালায়।
আরও পড়ুন:Kolkata Metro: আজ মেট্রোয় ভোগান্তি! ব্লু লাইনে সাড়ে ৯ ঘণ্টা বন্ধ পরিষেবা
মোহিত সেনগুপ্তের সময়ে শহরে প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ ও থার্মোকলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের মতো উদ্যোগ নেওয়ার কথাও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একইসঙ্গে রাস্তা, স্কুল ভবন, হস্টেল-সহ বিভিন্ন পরিকাঠামোগত কাজ নিয়ে সেই সময় পুরসভায় টেন্ডারও হয়েছিল।
২০১৭ সালের পুরসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে। ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৪টিতে তৃণমূল কংগ্রেস জয়ী হয়। এরপর সন্দীপ বিশ্বাস রায়গঞ্জ পুরসভার (Raiganj Municipality) চেয়ারম্যান এবং অরিন্দম সরকার ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। সেই সময় বাড়ি বাড়ি পানীয় জল সরবরাহ প্রকল্প শেষ করা এবং শহরের যানজট সমস্যা সমাধানকে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
‘গার্ড অব অনার’ প্রাপ্তি রায়গঞ্জ পুরসভার (Raiganj Municipality)
এরপর আসে করোনা-পরবর্তী সময়। পুরসভা প্রশাসনের তরফে স্যানিটেশন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি চালানোর তথ্য পুরসভার নিজস্ব নথি ও প্রকাশিত কর্মকাণ্ডে রয়েছে। করোনা মোকাবিলায় কাজের জন্য ২০২১ সালে জেলা পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকে রায়গঞ্জ পুরসভা (Raiganj Municipality) ‘গার্ড অব অনার’-ও পেয়েছিল।
আরও পড়ুন:Trinamool Symbol Dispute: তৃণমূলের ‘জোড়া ফুল’ কার দখলে? কমিশনের দরজায় দুই শিবির
কিন্তু ২০২২ সালের জুলাইয়ে নির্বাচিত পুরবোর্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এরপর নির্বাচিত কাউন্সিলরদের বোর্ডের পরিবর্তে প্রশাসক বোর্ডের মাধ্যমে পুরসভার কাজকর্ম চালানোর ব্যবস্থা হয়। ২০২২ সালের পুরসভার প্রকাশিত নথিতে প্রশাসক বোর্ডের মুখ্য প্রশাসক হিসেবে সন্দীপ বিশ্বাস এবং অন্যান্য প্রশাসনিক পদাধিকারীদের কাজের উল্লেখ রয়েছে। ওই সময়েও বর্জ্য পৃথকীকরণ, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, নিকাশি পরিষ্কার, স্বাস্থ্য শিবির এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ চলেছে।
নির্বাচিত পুরবোর্ড না থাকায় নাগরিক পরিষেবায় কতটা প্রভাব? (Raiganj Municipality)
বাস্তবতা হল, পুরসভার দৈনন্দিন নাগরিক পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। পানীয় জল, রাস্তা, নিকাশি, জঞ্জাল অপসারণ, মশা নিয়ন্ত্রণ, আলো, স্বাস্থ্য পরিষেবা-সহ পুরসভার মূল কাজ প্রশাসক বোর্ডের মাধ্যমেও চালানো সম্ভব হয়েছে। ফলে শুধু নির্বাচন না হওয়ার কারণেই রায়গঞ্জের মানুষ সমস্ত পুর পরিষেবা থেকে বঞ্চিত—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। পুরসভার নিজস্ব প্রকাশিত কর্মকাণ্ডেও প্রশাসক বোর্ডের সময় একাধিক পরিষেবা ও উন্নয়নমূলক কাজের প্রমাণ রয়েছে।
তবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতির একটি আলাদা প্রভাব রয়েছে। ওয়ার্ডভিত্তিক মানুষের অভিযোগ, স্থানীয় সমস্যা, রাস্তা-নিকাশি-পানীয় জল বা আলো সংক্রান্ত দাবি সরাসরি নির্বাচিত কাউন্সিলরের মাধ্যমে পুরসভায় (Raiganj Municipality) তুলে ধরার যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, প্রশাসক বোর্ডে তার চরিত্র বদলে যায়। ফলে পরিষেবা একেবারে বন্ধ না হলেও নাগরিক অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি সামনে আসে।
আরও পড়ুন:Humayun Kabir: শক্তিপুর থানার সামনে রাতভর হুমায়ুন
এর পাশাপাশি পুরসভার কাজের মান ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। পুরনো বকেয়া, ঠিকাদারি কাজ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে মামলা-মোকদ্দমার ঘটনাও হয়েছে। অর্থাৎ রায়গঞ্জ পুরসভার সমস্যা শুধু নির্বাচন না হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রায়গঞ্জ পুরসভার (Raiganj Municipality) ইতিহাস বলছে, রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পুরসভার নেতৃত্বও বদলেছে। মোহিত সেনগুপ্তের কংগ্রেস পরিচালিত বোর্ড থেকে সন্দীপ বিশ্বাসের নেতৃত্বে তৃণমূল বোর্ড—প্রতিটি পর্বেই শহরের নাগরিক পরিকাঠামো এবং পরিষেবা নিয়ে নানা উদ্যোগ ও বিতর্ক সামনে এসেছে। কিন্তু ২০২২-এর পর দীর্ঘ সময় নির্বাচিত পুরবোর্ড না থাকায় এখন মূল প্রশ্ন একটাই—কবে আবার ভোট হবে এবং কবে রায়গঞ্জের নাগরিকরা নিজেদের ওয়ার্ডের জন্য সরাসরি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি পাবেন?
কারণ প্রশাসক বোর্ড নাগরিক পরিষেবা সচল রাখতে পারে, উন্নয়নের কাজও করতে পারে; কিন্তু নির্বাচিত পুরবোর্ডের বিকল্প হিসেবে তার ভূমিকা দীর্ঘমেয়াদে কতটা গ্রহণযোগ্য, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। রায়গঞ্জ শহরের মানুষ তাই শুধু পরিষেবা চান না, চান পরিষেবার পাশাপাশি নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব, জবাবদিহি এবং তাঁদের ভোটে গঠিত পুর প্রশাসন।


