Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: শরতের আকাশে নীল-সাদা মেঘ, বাতাসে কাশফুলের দোলা আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের বাদ্যি সব মিলিয়ে বাঙালির মনে শুরু হয় দুর্গাপুজোর প্রতীক্ষা। কিন্তু প্রচলিত ‘তপ্তকাঞ্চনবর্ণা’ দুর্গাপ্রতিমার বাইরেও বাংলার বনেদি পরিবারগুলির পুজোয় রয়েছে নানা বৈচিত্র্য। কলকাতার বেলেঘাটার ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গাপুজো তারই এক অনন্য উদাহরণ। এখানে দেবী দুর্গা পূজিত হন কৃষ্ণবর্ণা ‘ভদ্রকালী’ রূপে (Black Durga)।

কালো দুর্গা, গৌরবর্ণা সন্তান (Black Durga)
এই প্রতিমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য দেবীর গাত্রবর্ণ। ঘোর কৃষ্ণবর্ণা দেবীর চার সন্তান—লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের গাত্রবর্ণ আবার গৌর। শুধু তাই নয়, এই প্রতিমায় মহিষাসুরের রংও আলাদা—উদীয়মান পাতার মতো সবুজ। কালিকাপুরাণের বিধি অনুসরণ করে তৈরি এই প্রতিমা তাই সাধারণ দুর্গাপ্রতিমার থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র (Black Durga)।
স্বপ্নাদেশ থেকেই শুরু ঐতিহ্য (Black Durga)
প্রায় তিনশো বছর আগে অবিভক্ত বাংলার পাবনার স্থলবসন্তপুরে এই পুজোর সূচনা। নদিয়ার বাসিন্দা শ্রী হরিদেব ভট্টাচার্য নাটোরের রানি ভবানীর কাছ থেকে জমি পেয়ে সেখানে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। পরিবারে আগে কালীপুজোর প্রচলন থাকলেও একসময় হরিদেব ভট্টাচার্য স্বপ্নাদেশ পান। দেবীকে ভদ্রকালী রূপে কৃষ্ণবর্ণে প্রতিষ্ঠা করার সেই নির্দেশই হয়ে ওঠে পরিবারের দুর্গাপুজোর নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
প্রতিমার সাজেও ব্যতিক্রম (Black Durga)
ভট্টাচার্য পরিবারের প্রতিমার বিন্যাসেও রয়েছে বিশেষত্ব। প্রচলিত বিন্যাসের বদলে দেবীর ডান দিকে থাকেন লক্ষ্মী ও কার্তিক। বাম দিকে বিরাজ করেন সরস্বতী ও গণেশ। দেবীকে কেন্দ্র করে শক্তির এই ভিন্ন বিন্যাস পুজোটিকে বাংলার অন্যান্য বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসবের থেকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।

দেশভাগের ধাক্কা, পুজোর ঠিকানা বদল (Black Durga)
দেশভাগের কারণে এই প্রাচীন পুজোকেও একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। ১৯৩৫ সালে পরিবারের সদস্যরা কর্মসূত্রে আসানসোল ও কলকাতায় চলে আসেন। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত আসানসোলে পুজো হয়। এরপর সত্তরের দশকে দুর্গাপুরে চলে যায় পুজোর আয়োজন। শেষপর্যন্ত আশির দশক থেকে কলকাতার বেলেঘাটায় ধীরেন চারু স্মৃতি সংঘের কাছে স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পায় এই ঐতিহ্য।
ষষ্ঠী থেকেই মায়ের আমিষ ভোগ (Black Durga)
শাক্ত মতে এই পরিবারে ষষ্ঠী থেকেই প্রতিদিন দেবীকে আমিষ ভোগ দেওয়ার রীতি রয়েছে। আড়, বোয়াল, কাতলা ও পাবদা মাছ থাকে ভোগের আয়োজনে। নবমীতে বিশেষ আকর্ষণ ইলিশ। পাশাপাশি তিথি অনুযায়ী নিরামিষ ভোগেরও নিজস্ব রীতি রয়েছে। সপ্তমীতে খিচুড়ি, অষ্টমীতে সুবাসিত পোলাও এবং নবমীতে পাঁঠাবলির পর ফ্রায়েড রাইসের সঙ্গে দুই ধরনের মাছের পদ নিবেদন করা হয়।

পান্তা-ইলিশে শেষ ভোগ, চোখে বিদায়ের জল
বিজয়া দশমীর ভোগেও মিশে থাকে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির গভীর ছাপ। মায়ের শেষ ভোগে দেওয়া হয় পান্তা ভাত, ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে রান্না কচু শাক এবং টক দই। প্রাচীন রীতির এই নিবেদন যেন বাঙালির ঘরের খাবারেই দেবীকে আপন করে নেওয়ার এক আবেগঘন প্রকাশ। তারপরই আসে বিদায়ের পালা। অশ্রুসজল চোখে পরিবারের মানুষজন উমাকে জানান—আবার এসো মা, আগামী শরতে।



