Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার। তিস্তার ওপার থেকে ভেসে আসছে—‘জয় মা কালী’ ধ্বনি (North Bengal Kali Puja)। কিছুক্ষণ পরেই শোনা যাচ্ছে ‘হল্লা হো…হল্লা হো’। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের বুক কেঁপে উঠত। দূরে জঙ্গলের ভিতর থেকে সারি সারি মশালের আলো এগিয়ে আসছে। কারণ, কালীপুজো সেরে ডাকাত দল এবার ফিরছে গাঁয়ের পথে। বাড়ির কর্তা সঙ্গে সঙ্গে লাঠিয়ালদের সতর্ক করতেন। জলপাইগুড়ির বাসুসুবা এলাকার অশীতিপর সুপেনচন্দ্র রায়ের শৈশবের স্মৃতিতে এখনও জীবন্ত সেই গল্প। তাঁর দাদু নিত্যানন্দ রায় ছিলেন লাঠিয়াল। তাঁর মুখেই শুনেছিলেন ডাকাতদের কালী আরাধনার সেই কাহিনি।

‘কালীঠাকুরানী’ থেকে মহাশক্তির প্রতীক (North Bengal Kali Puja)
সুপেনবাবুর কথায়, সেই সময় কালী ছিলেন ডাকাত দলের আরাধ্য দেবী। গ্রামাঞ্চলে ‘কালীঠাকুরানী’ নামে তাঁর পুজোর প্রচলন ছিল। অনেক ক্ষেত্রে কোনও মূর্তিও থাকত না। ঘরের ভিতরে বিষহরির সঙ্গে দেবীর আরাধনা করা হত। ভাওয়াইয়া রত্ন কামেশ্বর রায়ের কথায়, উত্তরবঙ্গে ‘ঘরকালী’ নামে এক ধরনের পুজোর প্রচলন ছিল। রান্নাঘরেই সেই পুজোর আয়োজন হত এবং কোথাও কোথাও শূকর বলির রীতিও ছিল।
রাজবংশী সংস্কৃতিতে মাটির ঢিবিই দেবীর প্রতীক (North Bengal Kali Puja)
কামেশ্বরবাবুর মতে, কালীঠাকুরানীর মূর্তি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জোতদার সমাজেরও যোগ ছিল। পরে ধীরে ধীরে কালী সাধারণ মানুষের আরাধ্য দেবীতে পরিণত হন। তবে রাজবংশী সমাজে মাটির ঢিবিকে কালী রূপে পুজোর রীতি বহু প্রাচীন। অর্থাৎ মূর্তি বা মন্দিরের আগেও প্রকৃতি ও মাটির সঙ্গে মিশে থাকা দেবীভাবনার অস্তিত্ব ছিল উত্তরবঙ্গে।
বৈকুন্ঠপুরের জঙ্গল ও দেবী চৌধুরানীর কিংবদন্তি (North Bengal Kali Puja)
তিস্তাপাড়ের কালী আরাধনার ইতিহাসে বৈকুন্ঠপুর জঙ্গলের নাম বিশেষভাবে উঠে আসে। এই জঙ্গল ঘিরে ছড়িয়ে রয়েছে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর নানা কাহিনি। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে দেবী চৌধুরানী এক ভিন্ন চরিত্র হলেও উইলিয়াম উইলসন হান্টারের A Statistical Account of Bengal-এ ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর উল্লেখ পাওয়া যায় দস্যু-জগতের সঙ্গে যুক্ত চরিত্র হিসেবে। কথিত আছে, ডাকাত দল বৈকুন্ঠপুরের জঙ্গলে আত্মগোপন করে তিস্তাপাড় ও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অভিযান চালাত।
ইতিহাস আর লোককথার মাঝখানে কালীপুজো (North Bengal Kali Puja)
গবেষকদের একাংশের মতে, বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে হান্টারের বিবরণের পরিচয় থাকার সম্ভাবনাও ছিল। ফলে ইতিহাসের চরিত্র উপন্যাসে পেয়েছে নতুন রূপ। কিন্তু তিস্তাপাড়ের লোকস্মৃতিতে সেই পার্থক্য খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। স্থানীয় প্রবীণদের দাবি, নিশিরাতে অভিযানে বেরোনোর আগে ডাকাতরা জঙ্গলের বিভিন্ন স্থানে কালীপুজো করত। বোদাগঞ্জ থেকে বাকালী পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা বহু কালীর থান এবং দেবী চৌধুরানীকে ঘিরে প্রচলিত লোককথা আজও সেই স্মৃতির সাক্ষ্য বহন করছে।
আরও পড়ুন: Police Duty Allowance: পুজো থেকে বিসর্জন, ডিউটিরত পুলিশকর্মীদের খাবার ভাতা বাড়াল রাজ্য সরকার
দীপাবলি থেকে কালীপুজো—বদলেছে সময়
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন প্রধান আনন্দগোপাল ঘোষের মতে, সময়ের সঙ্গে দীপাবলি উৎসব কালীপুজোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন মাত্রা পেয়েছে। শুরু হয়েছে মূর্তি গড়ে পুজোর আয়োজন। আর লোকসংস্কৃতি গবেষক দিলীপ বর্মার মতে, তিস্তায় বজরা ভাসিয়ে ডাকাতি করার ঐতিহাসিক তথ্য থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেই ঘটনাগুলির সঙ্গে দেবী চৌধুরানীর মাহাত্ম্য জুড়ে লোককথা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।



